বিশেষ প্রতিনিধি: যে নিকুঞ্জ ও টানপাড়ার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথের ‘মহাদানব’খ্যাত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিষিদ্ধ করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, সেই এলাকা এখন মাদকের বিষবাষ্পে আচ্ছন্ন। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে এলাকাকে সুশৃঙ্খল করার যে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস গত বছর রচিত হয়েছিল, তা আজ মাদক সিন্ডিকেটের অন্ধকার হাতছানিতে ম্লান হতে বসেছে। এলাকার সচেতন নাগরিকদের মতে, অটোরিকশার বিরুদ্ধে যে জয় অর্জিত হয়েছে, মাদকের বিরুদ্ধেও এখন সেই একই রকম ‘দ্বিতীয় সামাজিক বিপ্লব’ বা গেরিলা প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় এসেছে।

সাফল্যের স্মৃতি বনাম অস্তিত্বের লড়াই
উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের ৩০শে এপ্রিল নিকুঞ্জ ও খিলক্ষেত টানপাড়া এলাকার বাসিন্দারা সম্মিলিত শক্তির মাধ্যমে অটোরিকশা উচ্ছেদ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার সেই অর্জিত শান্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এলাকার আলোচিত সমাজকর্মী ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা ক্ষোভের সাথে বলছেন, “যদি আমরা রাস্তা থেকে অবৈধ অটোরিকশা সরাতে পারি, তবে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্টকারী এই মাদক কেন সরাতে পারব না? এটি এখন আমাদের অস্তিত্বের লড়াই।”
১৩টি স্পটে মাদকের ‘মৃত্যুকূপ’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিকুঞ্জ ও টানপাড়ার অন্তত ১৩টি পয়েন্টে প্রশাসনের চোখের সামনেই চলছে মাদকের রমরমা কারবার:
টানপাড়া পশ্চিমপাড়া: নজরুলের মেস ও রোডের শেষ মাথা।
জামতলা এলাকা: লইরা বাবুলের বাড়ির পাশের খালি জায়গা, আলীজানের টেক এবং আমিন মঞ্জিলের আশপাশ।
পিলার খায়েরের বাড়ির পূর্ব পাশ: যা এখন মাদকের ‘ওপেন স্পট’।
বস্তিকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট: আইজ্জার বস্তি এবং এটিএন অফিসের চারপাশের খালি জায়গা।
বাণিজ্যিক ও শিক্ষা এলাকা: জানে আলম স্কুলের পশ্চিম পাশের রাস্তা, বিআরটিসি কাউন্টার এবং
পেট্রোবাংলা সংলগ্ন পরিত্যক্ত এলাকা।
১৮ নম্বর রোড: পশ্চিম পাশে গভীর রাত পর্যন্ত চলে মাদকসেবীদের আনাগোনা।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাদক সম্রাটরা
অভিযোগ উঠেছে, ৫ আগস্টের পরবর্তী অস্থিরতাকে পুঁজি করে একদল সুবিধাবাদী রাজনৈতিক পরিচয়কে ‘লাইসেন্স’ হিসেবে ব্যবহার করছে। স্থানীয়দের দাবি, যুবদলের নাম ভাঙিয়ে নূর হোসেন লাল ও তার ভাই বাবুল এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের পরিচয় দিয়ে চিহ্নিত আসামি মোফাবাবু ও তার ভাই জিসান মাদকের সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রণ করছে। তালিকায় আরও এসেছে অটোরিকশা সিন্ডিকেটের সাবেক গডফাদার তোফাজ্জল হোসেন বাবুর্চির ছেলে দেলোয়ার, রবিন, মিঠু, নবী হোসেন, সবুজ, রিপন এবং জামতলার মানিকের নাম।
প্রশাসনের ভূমিকা ও পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ
খিলক্ষেত থানা পুলিশের নিস্পৃহতা নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানের আগেই খবর অপরাধীদের কানে পৌঁছে যায়। রাতে পুলিশের টহল কমে যাওয়ায় রাস্তাগুলো এখন মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের অবাধ বিচরণস্থলে পরিণত হয়েছে।
তবে খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল আলিম দাবি করেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অটল।
অন্যদিকে, সোমবার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আগামী ৩০ এপ্রিলের পর সারা দেশে মাদকের বিরুদ্ধে সমন্বিত সাঁড়াশি অভিযান শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন।
নাগরিক প্রতিরোধের ডাক
নিকুঞ্জ ও টানপাড়া এলাকায় শীতবস্ত্র বিতরণ, অটোরিকশা উচ্ছেদ এবং বিনামূল্যে টিকাদান কর্মসূচির যে সামাজিক ঐতিহ্য রয়েছে, তাকেই এখন মাদকের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। এলাকাবাসী মনে করছেন, প্রতিটি পাড়ায় ‘মাদক প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করে এই বিষ নির্মূল করতে হবে।
আরও পড়ুনঃ
শেষ কথা:
মাদকের সাথে অপরাধের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। আজ যে তরুণটি মাদক কিনছে, কাল সে-ই ছিনতাই বা খুনের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। তাই রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কেবল ‘বাহক’ ধরলেই হবে না, ধরতে হবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক ও রাঘববোয়ালদের। অটোরিকশা হঠিয়ে যে বিজয় অর্জিত হয়েছিল, মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার মাধ্যমে সেই বিজয়ের পূর্ণতা দেখতে চায় নিকুঞ্জবাসী।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


