in ,

অর্থনৈতিক উন্নয়নে স্থলবন্দরের ভূমিকা : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

মো. আলমগীর: বাংলাদেশের স্থলসীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৩৬৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকার দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সঙ্গে আরো ২৭০ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ স্থলসীমান্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে অপরিসীম ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশের স্থল বাণিজ্যের সিংহভাগই সম্পন্ন হয়ে থাকে ভারতের সঙ্গে। কারণ, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে রয়েছে পৃথিবীর পঞ্চম দীঘর্তম সীমান্ত এলাকা।

তবে ভুটান ও নেপাল ভারতীয় স্থলভাগ ব্যবহার করে বাংলাদেশের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম শুরু করেছে। এতে অংশগ্রহণকারী সব দেশই স্থলপথে বিদ্যমান বাণিজ্যসুবিধা গ্রহণ করে লাভবান হয়ে থাকে। তাই, স্থলপথে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি সুগম, সহজ ও অধিকতর উন্নত করার জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০০১ সালে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০১-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে। একজন চেয়ারম্যান, তিন জন সদস্য এবং ৪৯০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দ্বারা এর জনবল গঠিত। সরকার কর্তৃক গঠিত একটি বোর্ডের সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করে। তা ছাড়া, মাননীয়মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাপতিত্বে আরেকটি উপদেষ্টা কমিটি রয়েছে। কমিটি চালুকৃত স্থলবন্দরসমূহের কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়ন ও সার্বিক উন্নয়নে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করে থাকে।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। স্থলবন্দর কর্তৃক ব্যবহার উপযোগী, অবকাঠামো উন্নয়ন, পণ্য লোডিং-আনলোডিং, পণ্য সংরক্ষণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ঘোষিত ১৮১টি শুল্ক স্টেশনের মধ্যে ২৪টি স্থল শুল্ক স্টেশনকে স্থলবন্দর হিসেবে ঘোষণা করে, যার মধ্যে ১২টি চালু রয়েছে এবং বাকি ১২টি চালু অপেক্ষায় রয়েছে। ১২টি চালু বন্দরের মধ্যে বেনাপোল, বুড়িমারী, আখাউরা, ভোমরা, নাকুগাঁও, তামাবিল, সোনাহাটসহ এ সাতটি বন্দর সরাসরি স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। বাকি পাঁচটি যথাক্রমে সোনামসজিদ, হিলি, বাংলাবান্ধা, টেকনাফ ও বিবিরবাজার বেসরকারি অপারেটর এর মাধ্যমে বিওটি ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। আরো ১২টি নতুন স্থলবন্দর নির্মাণাধীন রয়েছে।

বাংলাদেশের স্থলবন্দরসমূহের মধ্যে বেনাপোল স্থলবন্দর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের স্থলপথে সম্পাদিত মোট আমাদনি রপ্তানি বাণিজ্যের ৯০ ভাগই বেনাপোল স্থলবন্দরের মাধ্যমে সম্পদ হয়ে থাকে। এ স্থলবন্দরের ওপর চাপ কমাতে এবং ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে স্থলপথে মালামাল আমাদানি-রপ্তানির সুবিধার্থে সরকার ১৯৮৮ সালে বুড়িমারী স্থলবন্দরটি চালু করে।

২০১০ সালে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে। থিম্পু সম্মেলনে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং ট্রানজিট বিষয়টি প্রাধান্য পায়। সম্মেলনে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতির নিমিত্তে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরই ধারাবাহিকতা আর বিশ্বায়নও আন্তরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যে বিভিন্ন শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর হওয়ায় ভারত ও মিয়ানমারসহ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রয়োজন দেখা দেয়। তা ছাড়া, বিমসটেক (BIMSTEC) এবং বিআইবিএন (BIBN) আঞ্চলিক জোটের বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা আর প্রয়োজন, স্থলপথে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়ন, সেবা সহজীকরণ ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের বিকাশসহ কর্মসৃজনে বাংলাদেশে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ বিগত ২০ বছর যাবত্ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

স্থলবন্দরের এই কাজে বন্দরের বিভিন্ন অংশীজন (স্টেকহোল্ডার) যেমন—কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, কোয়ারেন্টাইন, বিজিবি, ব্যাংক, আমদানি-রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করছে। Ease of Doing Business-এর আওতায় সেবা সহজীকরণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে স্থলবন্দরসমূহে একই ছাদের নিচে সমন্বিতভাবে (Integrated System) যাত্রীসাধারণ এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের সেবা প্রদানের লক্ষ্যে স্থলবন্দরে বরাদ্দকৃত স্থানে সকল অংশীজনের কার্যক্রম পরিচালনার সরকারি সিদ্ধান্ত রয়েছে। ইতিমধ্যে বেনাপোল, বুড়িমারী, বাংলাবান্ধা ও টেকনাফ স্থলবন্দরে One Stop Service System-এ যাত্রী সেবা প্রদান করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সকল স্থলবন্দরেই One Stop Service System-এ সেবা প্রদানের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে।

পণ্য পরিবহন, হ্যান্ডলিং, সংরক্ষণ ও স্থলবন্দর আধুনিকায় ছাড়াও বর্তমানে সোনাহাট স্থলবন্দর ব্যতীত বাকি ১১টি বন্দর দিয়ে যাত্রীদের আসা-যাওয়ার সুবিধা সৃষ্টি করা হয়েছে। বেনাপোল স্থলবন্দরে একটি আধুনিক আন্তর্জাতিক মানের প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল তৈরি করা হয়েছে। বেনাপোলসহ অন্যান্য স্থলবন্দর ব্যবহার করে এ পর্যন্ত প্রায় ৩১ লক্ষ যাত্রী ভারতে গমন এবং ভারত থেকে বাংলাদেশে আগমন করেছে। এর ফলে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষসহ অনান্য রাজস্ব আদায়কারী সংস্থার আয় বিগত বছরসমূহের তুলনায় অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে একটি ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, আধুনিক, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, আধুনিক উন্নত জাতি হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের বর্তমান সরকারের অভীষ্ট লক্ষ্য। সেজন্য বর্তমান সরকার ৮ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, ডিজিটাল বাংলাদেশে, ভিশন-২০২১, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০, ভিশন-২০৪১, ডেলটা প্ল্যান-২১০০ গ্রহণ করেছে। এসব পরিকল্পনা, রূপকল্প, লক্ষ্য ও অভিলক্ষ্যের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছেই সকল বাংলাদেশের জনগণের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি, খাদ্য ও বাসস্থানের সংস্থান, শিক্ষা ও চিকিত্সার ব্যবস্থা করা। সরকারের এ মহতী উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ নিন্মোক্ত কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। আর এ সুবিধাভোগী হচ্ছে নিম্নরূপ :

ক) বেনাপোল, সোনামসজিদ, ভোমরা, হিলি টেকনাফ, তামাবিল, বুড়িমারী এবং সোনাহাট স্থলবন্দরে বেসরকারিভাবে নিয়োজিত ঠিকাদার কোম্পানির মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক পণ্য ওঠানামার কাজে নিয়োজিত আছেন। এর মাধ্যমে এলাকার হতদরিদ্র ও দরিদ্র এক বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

খ) বেনাপোল, আখাউরা, বুড়িমারী, ভোমরা, তামাবিল ও সোনাহাট স্থলবন্দরের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে বেসরকারি ঠিকাদারের মাধ্যমে এলাকার অনেক দরিদ্র বেকার ছেলেমেয়ের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

গ) দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থলবন্দরসমূহ স্থাপিত হওয়ায় এসব দূরবর্তী এলাকায় আগে যেখানে কোনো জনবসতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ ছিল না। এখন সেখানে অনেক দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস আবাসিক হোটেল, মোটেল ও কম্পিউটার কম্পোজের, ছবি তোলার প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। মালামাল খালাস, ড্রাইভার, হেলপার, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ব্যাংক, বিমা ছাড়াও অনেক ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ ঘটেছে।

তাছাড়া, পণ্য ওঠানো-নামানো, সংরক্ষণ, ট্রান্সশিপমেন্ট ও অন্যান্য সেবা প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ বিগত বছরসমূহে রাজস্ব বাবদ ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি আয় করেছে এবং প্রায় ২০০ কোটি টাকা ভ্যাট প্রদান করেছে।

এত কিছুর পরও এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের সামনে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশেষ করে যে হারে স্থলবন্দরের সেবাপ্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, সে হারে বা গতিতে সেবা অবকাঠামো গড়ে উঠছে না। কিন্তু প্রত্যাশিত হারে সেবাসুবিধা তাত্ক্ষণিক বাড়ানো যাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংক এবং সরকারি অর্থ মিলিয়ে এখন মোট ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ বিভিন্ন স্থলবন্দরে চলমান রয়েছে। এ সকল কাজের মধ্যে রয়েছে ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ ও সেবাসুবিধা সম্প্রসারণ।

সম্প্রতি বুড়িমারী স্থলবন্দরে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়নে যে ই-পোর্ট ম্যানেজম্যান্ট কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে, তা সফল হলে স্থলবন্দরের সকল কাজ ডিজিটালাইজেশনের আওতায় নিয়ে আসা হবে এবং এর ফলে সেবা গ্রহণকারীদের অনেক কম সময়ে, অনায়াসে দক্ষতার সঙ্গে সেবা প্রদান করা যাবে। এ কার্যক্রমটি স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সময়ে অন্যান্য স্থলবন্দরসমূহে চালু করবে। স্থলবন্দরে প্রায় ১৫টি সরকারি-বেসরকারি সংস্থা বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদান করে থাকে। সংস্থাসমূহ তাদের নিজস্ব নিয়মনীতি মেনে কাজ করে থাকে। অনেক সময় কোন, কোন কর্মকর্তা সংস্থার অন্তর্গত সংস্কৃতির কারণে একসঙ্গে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। তারা অনেকটা আলাদা সাইলোর (Silo) মতো কাজ করতে পছন্দ করেন। এর ফলে এক ছাদের নিচে ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রদানের মহত্ উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। তাছাড়া, অনেক সুবিধাভোগী স্থলবন্দরের এই অটোমেশন ভালোভাবে গ্রহণ করছেন না, কারণ তারা পুরোনো সিস্টেমের সুবিধাভোগী।

স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষকে সীমান্তে কাজ করতে হয়। এজন্য তাদেরকে অনেক জমি অধিগ্রহণ এবং অবকাঠামো নির্মাণকাজ হাতে নিতে হয়। জমি অধিগ্রহণে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয় এবং এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। পরিণতিতে বার্ষিক উন্নয়ন অগ্রগতি মন্থর হয়ে যায়—যা সামগ্রিক মূল্যায়নে প্রভাব ফেলে। তাছাড়া ত্রিদেশীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনেক সময় অন্য দেশের ভূরাজনৈতিক বিষয়াদি বন্দরের কার্যক্রমেও প্রভাব সৃষ্টি করে। অনেক সময় বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি প্রস্তুত থাকলেও অন্যদেশ যদি তার স্থলবন্দরের ভালোভাবে উন্নতি না করে, তাহলে বাংলাদেশে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ এর পুরো সুফল ঘরে তুলতে পারে না। এজন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত কার্যকর ব্যবস্থা, যা উভয় পক্ষ বা সকল পক্ষের জন্য রিহ-রিহ পরিবেশের সৃষ্টি করে।

আশা করা যায়, বাংলাদেশ স্থলবন্দরসমূহ আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ ব্যবসা-বাণিজ্য আর আন্তর্জাতিক যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষে মানুষে সদভাব, সংস্কৃতির আদান-প্রদান ও সৌহার্দ বৃদ্ধিতে অনন্য ভূমিকা পালন করবে—সেই প্রত্যাশায় ব্যক্ত করছি।

লেখক :সরকারের অতিরিক্ত সচিব ও চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ।

অনলাইনে খুব সহজে টাকা ইনকাম করার উপায়