আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হলো আজ বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে। এক্ষেত্রে ১ হাজার ৯৭৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী শুরু করবেন প্রচার যুদ্ধ, তবে মানতে হবে ইসির আরচণ বিধি।
ইসি জানায়, এবার নির্বাচনে স্বতন্ত্র ও রাজনৈতিক দলের প্রার্থী মিলে মোট প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী ১ হাজার ৯৭৩ জন। আদালত থেকে কিছু প্রার্থী বৈধতা পেলে এ সংখ্যা কিছু টা বৃদ্ধি পাবে। এসব নির্বাচনি প্রচারণায় এসকল প্রার্থীকে মেনে চলতে হবে ইসির জারি করা আচরণ বিধিমালা। যদি কোনো প্রার্থী আচরণ বিধি ভঙ্গ করে তাহলে তার প্রার্থীতা বাতিলসহ বিভিন্ন রকম শাস্তি প্রদান করতে পারবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
আচরণ বিধিমালা থেকে জানা যায়, ভোটের প্রচারে ড্রোন, পোস্টার ব্যবহার, বিদেশে প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ২০ টির বেশি বিলবোর্ডে মানা, একমঞ্চে ইশতেহার ঘোষণা ও আচরণবিধি মানতে প্রার্থী ও দলের অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।
সোশাল মিডিয়ায় ভোটের প্রচারে কড়াকড়ি আরোপ, অসৎ উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহারে মানা, পোস্টার ও ড্রোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞাসহ কি করা যাবে, কি করা যাবে না তা তুলে ধরা হয়েছে এ বিধিমালায়। আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ জরিমানা এবং দলের জন্য দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে তদন্ত সাপেক্ষে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে ইসির।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন অধ্যাদেশ জারি হয় গত বছরের ৪ নভেম্বর। এরপর আরপিও’র আলোকে গত বছরের ১১ নভেম্বর আচরণবিধি গেজেট আকারে জারি করেন নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য জেসমিন টুলী বলেন,প্রতীক বরাদ্দ হয়ে গেছে। এই পর্যায়ে নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রতিপালন নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচনের প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ এবং আচরণবিধিকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি যদি ঠিকভাবে মানা না হয়, তাহলে পুরো নির্বাচন নিয়ন্ত্রণে রাখা নির্বাচন কমিশনের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠবে।
জেসমিন তুলী আরও বলেন, এবার বিপুল সংখ্যক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ অবস্থায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন শুরুর মুহূর্ত থেকে শেষ পর্যন্ত আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করাই কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।
আচরণবিধি শুধু কাগজে থাকলে হবে না, রাজনৈতিক দলগুলোকে তা বাস্তবে মেনে চলতে হবে। কেন্দ্রভিত্তিক ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও নির্বাচনী মালামাল ব্যবস্থাপনার মতো প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি কমিশনকে প্রার্থীদের প্রতিটি আচরণ নিবিড়ভাবে মনিটর করতে হবে, তাহলেই নির্বাচন সুষ্ঠু রাখা সম্ভব হবে।
রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণ বিধি প্রতিপালনে সহযোগিতা চেয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দীন বলেছেন, ‘আচরণবিধি সঠিকভাবে পালন করা হলে নির্বাচন সুন্দরভাবে হবে। এজন্য আপনাদের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।নির্বাচন কমিশন একা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে পারে না। এর জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের সহযোগিতা অপরিহার্য।
যেসব নির্দেশনা মেনে করতে হবে ভোটের প্রচারণা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনি প্রচারণা: কোন প্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করিয়া নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা পরিচালনা করিতে পারিবেন। তবে এক্ষেত্রেপ্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট বা দল বা প্রার্থী সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নাম, একাউন্ট আইডি, ই-মেইল আইডিসহ অন্যান্য সনাক্তকরণ তথ্যাদি উক্তরূপে প্রচার-প্রচারণা শুরুর পূর্বে রিটার্নিং অফিসারের নিকট দাখিল করতে হবে;
প্রচার-প্রচারণাসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কোন বিষয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করা যাবে না;
ঘৃণাত্নক বক্তব্য, ভুল তথ্য, কাহারো চেহারা বিকৃত করা ও নির্বাচন সংক্রান্ত বানোয়াট তথ্যসহ সকল প্রকার ক্ষতিকর কনটেন্ট বানানো ও প্রচার করা যাইবে না;
প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য কোন জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না; নির্বাচনি স্বার্থ হাসিল করিবার জন্য ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচন সংক্রান্ত সকল কনটেন্ট শেয়ার ও প্রকাশ করার পূর্বে সত্যতা যাচাই করতে হবে;
রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তি, ভোটারদের বিভ্রান্ত করার জন্য কিংবা নারী-পুরুষ নিবিশেষে কোন প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্র হনন কিংবা সুনাম নষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য কোন মাধ্যমে, সাধারণভাবে বা সম্পাদন (Edit) করে কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা Artificial Intelligence (AI) দ্বারা কোন মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ এবং মানহানিকর কোন আধেয় (content) তৈরি, প্রকাশ, প্রচার ও শেয়ার করতে পারবেন না।
গুজব ও এআই অপব্যবহার বন্ধে নির্বাচনী অপরাধ বিবেচনায় শাস্তির বিধান রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে এবার নতুন ধারা যুক্ত করা হয়।
আচরণবিধিতে আরও যা রয়েছে
>>কোনো দল বা প্রার্থী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশে জনসভা, পথ সভা, সভা-সমাবেশ বা কোেনো প্রচারণা করতে পারবে না।
>> ভোটের প্রচারে থাকছে না পোস্টারের ব্যবহার। একজন প্রার্থী তার সংসদীয় আসনে ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবে না; যার দৈর্ঘ্য হবে সর্বোচ্চ ১৬ ফুট আর প্রস্থ ৯ ফুট।
>> নির্বাচনের দিন ও প্রচারের সময় কোনো ধরনের ড্রোন, কোয়াডকপ্টার বা এ জাতীয় যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।
>> প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো প্রার্থী ও প্রতিষ্ঠান ভোটার স্লিপ বিতরণ করতে পারবে। তবে ভোটার স্লিপে প্রার্থীর নাম, ছবি, পদের নাম ও প্রতীক উল্লেখ করতে পারবে না।
>> বিলবোর্ডে শুধু যেগুলো ডিজিটাল বিলবোর্ড, সেগুলোতে আলোর ব্যবহার করা যাবে। বিদ্যুতের ব্যবহার করা যাবে। তাছাড়া আলোকসজ্জার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
>> ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেটে পলিথিনের আবরণ নয়, প্লাস্টিক (পিভিসি) ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না।
>>সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় অন্তবর্তীকালীন/তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদেরও যোগ করা হয়েছে। ফলে তারা প্রার্থীর হয়ে প্রচারে নামতে পারবেন না।
>>প্রচারে পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছে; প্রচার সামগ্রীতে পলিথিন, রেকসিনের ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
>> প্রচারের সময় শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলে রাখতে হবে।
>> আচরণবিধি মেনে চলার ব্যাপারে প্রার্থী ও দলের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামাও দিতে হবে।
>>আচরণবিধির ‘গুরুতর’ অপরাধের ক্ষেত্রে আরপিওতে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রয়েছে। আগে আচরণবিধিতে আরপিও অনুচ্ছেদটি ছিল না, এবার যুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচনি অপরাধে আরপিও ৯১ ধারা অনুযায়ী প্রার্থিতা বাতিল করে থাকে ইসি। এ বিষয়টি আচরণ বিধিমালায় স্পষ্ট করা হয়েছে।
>>গণমাধ্যমের সংলাপ ও সব প্রার্থীর এক মঞ্চে ইশতেহার ঘোষণার সুযোগ রাখা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট আসনে সব প্রার্থীকে নিয়ে একদিনে তাদের ইশতেহার বা ঘোষণাপত্রগুলো পাঠ করার ব্যবস্থা করবেন।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে প্রচারণা চালাতে পারবেন প্রার্থীরা। যা চলবে ১০ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৭ টা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


