স্পোর্টস ডেস্ক : প্রথম ব্রিটিশ অ্যাথলেট হিসেবে অলিম্পিকে স্বর্ণ জয়ের রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। তাও একটি-দুটি নয়, মোট চারটি। যে কারণে ব্রিটেনের রানী তাকে ভূষিত করেছিলেন সম্মানসূচক নাইটহুড উপাধিতে। মো. ফারাহও পরিণত হয়েছিলেন ব্রিটিশদের রাজকীয় বীরে। যে কারণে তার নাম হয়ে যায় ‘স্যার মো. ফারাহ’।

Advertisement

কিন্তু দীর্ঘ সময় পর এসে মো ফারাহর আসল পরিচয় জেনে অবাক শুধু ব্রিটেনই নয়, পুরো বিশ্ব। ছোটবেলা থেকেই অতি যত্নে নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। ব্রিটিশ নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে এই পরিচয় লুকিয়ে রেখেছিলেন বলে বিবিসি’র এক ডকুমেন্টারিতে স্বীকার করেন স্বর্ণজয়ী এই অলিম্পিয়ান।

১৩ জুলাই (বুধবার) প্রকাশ করা হবে এই ডকুমেন্টারিটি। কিন্তু তার আগেই সারা বিশ্বে মো ফাহার প্রকৃত পরিচয় জেনে তোলপাড়। যদিও ইংল্যান্ডের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এ বিষয়ে তারা কোনো আইনী পদক্ষেপ নেবে না। এমনকি এ নিয়ে মো ফারাহকে অভিযুক্তও করবে না।

দীর্ঘদিন নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে রাখলেও শেষ পর্যন্ত বিবেকের দংশনে প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরলেন ডকুমেন্টারিটিতে। মো ফারাহ জানালেন, ছোট বেলায় সোমালিয়া থেকে পাচার হয়ে এসেছিলেন তিনি ব্রিটেনে।

মো ফারাহর তার প্রকৃত নাম নয়। তার প্রকৃত নাম হুসেইন আবদে কাহিন। তার বাবা সোমালিয়া গৃহযুদ্ধ নিহত হন। এরপরই পাচারকারীর খপ্পরে পড়ে চলে আসতে হয় ব্রিটেনে এবং এখানে এসে জোরপূর্বক শিশুশ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে হয় তাকে। তাকে গৃহস্থালির কাজ করতে হয়েছিল।

বিসিসির ডকুমেন্টারিতে মো ফারাহ বলেন, ‘এখানে আমার সম্পর্কে এমন কিছু রয়েছে, যা কেউ জানে না। আমার ছোটবেলা থেকেই এই বিষয়টি আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম। অধিকাংশ মানুষই জানে আমি মো ফারাহ। তবে এটা আমার আসল নাম নয় এবং এটা বাস্তবতাও নয়।’

বিবিসিকে তিনি জানান, জিবুতি থেকে যারা তাকে পাচার করে নিয়ে এসেছিল, তারা তার নাম দিয়েছিল মো ফারাহ। মাত্র ৯ বছর বয়সে একটি মহিলা তাকে পশ্চিম আফ্রিকান দেশটি থেকে নিয়ে আসে। ওই মহিলাকে তিনি এর আগে কখনো দেখেননি। যেখানে তাকে নিয়ে আসা হয়, সেখানে দেখেন আরও বেশ কিছু শিশুকে রাখা হয়েছে।

মো ফারাহ বলেন, ‘বছরের পর বছর আমি এই তথ্যটা লুকিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু এটাকে তো আর দীর্ঘ সময় ধরে লুকিয়ে রাখা যায় না! যখন আপনি জানবেন যে, যে কোনো সময় এর মুখোমুখি হতেই হবে। এমনকি আমার সন্তানরাও অনেক সময় জিজ্ঞাসা করে, বাবা এটা কিভাবে হলো? আপনি এর জন্য একটি উত্তর সব সময় দিয়ে এসেছেন। অথচ, এই উত্তরটা সঠিক নয়।’

‘এ কারণেই আমি আমার সঠিক ঘটনাটা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। কারণ, আমি নিজের মধ্যে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে চাই। আমি আর চাই না, আপনারা যে জায়গাটায় আমাকে তুলে রেখেছেন, সেখানে থাকি।’

দূর পাল্লার (৫ হাজার এবং ১০ হাজার মিটার) দৌড়ে চারটি (২০১২ সালে লন্ডনে ২টি এবং ২০১৬ রিওতে ২টি) অলিম্পিক স্বর্ণজয়ী এই অ্যাথলেট আগে প্রায়ই বলতেন, তার বাবার নাম মুক্তার। তিনি একজন আইটি কনসালট্যান্ট। যিনি জন্মেছিলেন এবং বেড়ে ওঠেন লন্ডনে। বড় হওয়ার পর তার বাবা সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু চলে যান, সেখানে তার মায়ের সাথে দেখা হয় এবং তাকে বিয়ে করে ফিরে আসেন লন্ডনে।

কিন্তু বিবিসি এবং রেড বুলস স্টুডিওর ডকুমেন্টারি, যেটা বিবিসি নিউজে প্রচার হবে আগামী বুধবার, সেখানে তিনি স্বীকার করেন- তার মা-বাবার কেউই কখনো ব্রিটেনে আসেননি। তার মা এবং দুই ভাই বসবাস করেন সোমালিল্যান্ডের বিচ্ছিন্ন একটি রাজ্যে।

যখন মো ফারাহর বয়স ৪ বছর, তখন তার বাবা সোমালিয়া গৃহযুদ্ধের সময় এক বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। ১৯৯১ সালে সোমালিল্যান্ড স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু কোনো বিদেশী রাষ্ট্র তাদের এই স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়নি।

কিভাবে সোমালিল্যান্ড থেকে ব্রিটেনে চলে আসেন মো ফারাহ?

স্যার মো ফারাহ জানান, তার বয়স যখন ৮ কিংবা ৯ তখন গ্রামের বাড়ি থেকে জিবুতিতে নিয়ে আসা হয় তাদের পরিবারকে। সেখান থেকে অচেনা এক মহিলার কাছে পাচারের শিকার হন এবং তাকে উড়িয়ে আনা হয় নতুন এক দেশে। যেটাকে পরে তিনি জেনেছিলেন, এই দেশটার নাম গ্রেট ব্রিটেন।

ওই নারীর সঙ্গে যেতেও আগ্রহী ছিলেন ৮/৯ বছর বয়সী মো ফারাহ। ওই নারী তাকে বলেছিলেন, তিনি ইউরোপে যাবেন তার আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে। তাকেও নিয়ে যাবেন সাথে। মো ফারাহ খুব উত্তেজিত ছিলেন, কারণ এর আগে কখনো তিনি প্লেনে ওঠেননি।

সেই নারীটিই তাকে বলেছিলেন, কেউ জিজ্ঞাসা করলে তিনি যেন বলেন তার নাম মোহাম্মদ। নারীটি তার জন্য ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে এবং তার যে ছবি সেখানে সংযুক্ত করা হয়, সেখানে লিখে দেয়া হয় তার নাম মোহাম্মদ ফারাহ।

ব্রিটেনে এসে পশ্চিম লন্ডনের একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। এরপর ওই নারীটি একটি কাগজ তুলে নেন ফারাহর সামনে। যেটাতে তার আত্মীনের নাম ঠিকানা লেখা ছিল। নারীটি সেই কাগজ ছিঁড়ে ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দেন। মো ফারাহ বলেন, ‘ওই সময়ই আমি বুঝতে পারি যে, এবার সত্যি সত্যি বিপদে পড়ে গেছি।’

মো ফারাহ বলেন, ‘নিজের খাবার জোগানোর জন্য আমাকে ঘরের কাজ করতে হয়েছিল, বাচ্চার যত্ন নিতে হয়েছিল।’ সেই নারীটি তাকে বলেছিল, যদি পরিবারের কারো সঙ্গে দেখা করতে মন চায়, তবুও যেন তার কাছে কোনো কিছু না বলা হয়। অথ্যাৎ, পরিবারের কারো সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছার কথাও জানাতে পারতেন না তিনি।

মো ফারাহ বলেন, ‘প্রায়ই আমার কান্না পেতো এবং বাথরুমের ছিটকিনি লাগিয়ে কান্না করতাম।’

স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর পাল্টে যেতে থাকে ফারাহর জীবন

প্রথম কয়েক বছর সেই পরিবারটি তাকে স্কুলে যেতে দেয়নি। তবে মো ফারাহর বয়স যখন ১২, তখন তাকে ফেলথাম কম্যুনিটি কলেজে ভর্তি করে দেয়া হয়। স্কুলের কর্মকর্তারা প্রায়ই বলতেন, মো হচ্ছে সোমালিয়ান উদ্বাস্তু।

সেই স্কুলের শিক্ষক সারাহ রেনি বিবিসিকে বলেন, ‘মো খুব উস্কু-খুস্কু চেহারা নিয়ে স্কুলে আসতো। এমনকি ইংলিশও খুব ভালোভাবে বলতে পারতো না। দু-একটি ভাঙা ভাঙা শব্দ উচ্চারণ করতো। তাকে দেখে মনে হতো মানসিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে বিচ্ছিন্ন একটি শিশু।’ সেই শিক্ষিকা আরো জানান, ছেলেটার কোনো বাবা-মা কখনোই প্যারেন্টস ইভেনিংয়ে যোগ দেননি।

তার শারীরিক শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক অ্যালান উইটকিনসন জানান, মো’র ভাষাজ্ঞান বলতে সে শুধু শারীরিক শিক্ষা এবং স্পোর্টসের টার্মগুলোই বুঝতো এবং সেভাবেই সে অংশ নিতো।

মো ফারাহ জানান, স্পোর্টসই হচ্ছে তার লাইফলাইন। তিনি বলেন, ‘স্পোর্টস এমন একটি বিষয় ছিল, যেটা দিয়েই আমি মনে করেছি যে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ। এ কারণেই আমি অ্যাথলেটিক ট্র্যাকে সবচেয়ে বেশি দৌড়াতাম।’

মো বিশ্বাস করেন, তার শিক্ষক মিস্টার ওয়াটকিনসন তার পরিচয়, ব্যাকগ্রাউন্ড এবং পরিবার- সবকিছু সম্পর্কে জানতেন। কিন্তু কখনোই কাউকে এ নিয়ে কিছু বলেননি।

মো ফারাহর শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক যোগাযোগ করেন সোশ্যাল সার্ভিসের সঙ্গে এবং তাকে সেই পরিবার থেকে উদ্ধার করে এনে অন্য একটি সোমালি পরিবারের সঙ্গে রাখেন থাকার জন্য। ফারাহ বলেন, ‘আমি আমার পরিবারকে সব সময় মিস করি। তবে, ওই সময় থেকে আমার জীবন বদলে যেতে শুরু করে এবং সবকিছু সহজ হয়ে যায় আমার জন্য।’

যেভাবে পেলেন বৃটিশ নাগরিকত্ব

১৪ বছর বয়সেই ইংল্যান্ডের স্কুল অ্যাথলেট দলের হয়ে লাটভিয়ায় যাওয়ার সুযোগ পান মো ফারাহ। কিন্তু ট্রাভেল সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজ না থাকায় যেতে পারেননি। এরপরই মিস্টার ওয়াটকিনসন মো ফারাহ নামেই বৃটিশ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে তাকে পুরোপুরি সহযোগিতা করেন। যে আবেদন ২০০০ সালের জুলাই মাসে গ্রহণ করা হয়। মো ফারাহ হয়ে যান একজন বৃটিশ নাগরিক।

বিবিসির ডকুমেন্টারিতে ব্যারিস্টার অ্যালান ব্রিডক বলেন, মো ফারাহ যে নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তা ছিল টেকনিক্যালি প্রতারণামূলক কিংবা ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আইনত ব্রিটিশ সরকার কোনো নাগরিকের নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে পারেন, যদি তার সেই নাগরিকত্ব প্রতারণামূলক কিংবা ভুলভাবে গ্রহণ করা হয়ে থাকে।

দৌড়ই আমাকে বাঁচিয়েছে

মো ফারাহ জানান, তিনি চান তার এই অজানা গল্প মানুষকে জানাতে। যাতে করে দাসের মত করে শিশু পাচার রোধ করা যায়। তিনি বলেন, ‘আমার কোনো ধারণা নেই, আমার মত এ ধরনের আরও কত মানুষ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি। আমি হয়তো খুব ভাগ্যবানদের এজন যে, নিজের অবস্থা পরিবর্তন করতে পেরেছি। অন্যরা তো কখনোই পারে না।’

‘সত্যিকারার্থে কোন জিনিসটা আমাকে রক্ষা করেছে? কোন জিনিসটা আমাকে অন্যদের চেয়ে ভিন্নতর হিসেবে উপস্থাপন করেছে? সেটা এই যে, আমি দৌড়াতে পারতাম।’

যে মহিলাটি মো ফারাহকে সোমালিল্যান্ড থেকে লন্ডনে নিয়ে এসেছিল, সেই নারীর কাছ থেকে মন্তব্য নেয়ার জন্য যোগাযোগ করেছিল বিবিসি। কিন্তু বিবিসির ডাকে সাড়া দেননি তিনি। কমেন্টস করা থেকে বিরত থেকেছেন।

চ্যান্সেলর নাদিম জাহাবি, যিনি নিজেও ১১ বছর বয়সে ইরাক থেকে পরিবারের সঙ্গে ইংল্যান্ডে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন, বলেন- মো ফারাহর এই অজানা গল্প সত্যিই হৃদয়বিদারক এবং দুঃখে পরিপূর্ণ। তিনি বিসিসিকে বলেন, ‘আমি মো ফারাহকে স্যালুট জানাই। কী অসাধারণ এক মানবীয় ব্যক্তিত্ব। বাল্যকালেই বলতে গেলে ট্রমায় চলে গিয়েছিল সে। সেখান থেকে উঠে এসেছে একজন গ্রেট রোল মডেল হিসেবে। এটা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।’ সূত্র : বিবিসি বাংলা।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Saiful Islam is a journalist at Zoom Bangla News with seven years of experience in news writing and editorial work. He contributes to producing accurate, well-structured, and reader-focused content across digital platforms. His work reflects a strong commitment to editorial standards and responsible journalism.