in

ইভানার বার্তায় আত্মোপলব্ধি ও নারী স্বনির্ভরতার গল্প

এডভোকেট তাসরিফা জলি

তাসরিফা জলি: গত ১৫ সেপ্টেম্বর শাহবাগের পাশে পরীবাগের দুটি নয়তলা ভবনের মাঝ থেকে ইভানার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ৩২ বছর বয়সী ইভানা ছিলেন রাজধানীর স্কলাসটিকা স্কুলের ক্যারিয়ার গাইডেন্স কাউন্সেলর। তার স্বামী আব্দুল্লাহ হাসান মাহমুদ ওরফে রুম্মান একজন আইনজীবী।

ইভানার শ্বশুরবাড়ি থেকে পুলিশকে জানানো হয়েছে, ইভানা ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে তাদের ধারণা।

ইভানার বোন প্রকৌশলী ফারহানা চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভিডিও কল করে খুব কান্নাকাটি করেছিলেন ইভানা। তখন তিনি বলছিলেন যে তার স্বামীর অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। ইভানা ডিভোর্স নিয়ে খুবই আতঙ্কগ্রস্ত ছিল। কারণ আমাদের পরিবারটা একটু পুরনো ধ্যান-ধারণার। আমার মা আমাদের শিখিয়েছেন বিয়ে সবচেয়ে বড় জিনিস, এটা আমরা টিকিয়ে রাখব। তবুও আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। বললাম আমরা দুই বোন আছি, বাবা-মা আছে। সবার সঙ্গে থাকবে ও। কিন্তু ও বারবারই বলছিল কেন ওর সঙ্গেই এরকম হবে?’

শুক্রবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ইভানার মৃত্যুর ঘটনায় স্বামী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ মাহমুদ হাসান রুম্মানসহ তিনজনকে আসামি করে শাহবাগ থানায় মামলা করেছেন তার বাবা এএসএম আমান উল্লাহ চৌধুরী।

ইভানার মৃত্যু ঘরে ঘরে বিপর্যস্ত অন্য ইভানাদের জন্য কিছু বার্তা রেখে গেছে। ইভানার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে আমি নন-জাজমেন্টাল, তবে তার মৃত্যুপূর্ব বিভৎসতা আমাকে তাড়া করছে। তাই চেষ্টা করছি ইভানার ক্ষুদে বার্তা বিশ্লেষণের মাধ্যমে অন্য কোনও ইভানাকে সাহস যোগাতে।

নমনীয় ও লক্ষ্মী মেয়েরা মা-বাবা থেকে শুরু করে আমাদের এই সমাজের প্রত্যেকের খুবই পছন্দ। তাই বলে লক্ষ্মী মেয়ে, লক্ষ্মী বউ ও লক্ষ্মী মা হওয়ার জন্য ইভানার মতো আমরাও জীবন দিয়ে দিবো! অবশ্যই না। লক্ষ্মী হবো ঠিকই তবে লক্ষ্মীর সংজ্ঞাটা পারিপার্শ্বিকতার বিচারে সজ্ঞায়িত করতে হবে। আগে দেখতে হবে- আমরা যাদের জন্য লক্ষ্মী হচ্ছি, তারা আমাদেরকে মেরুদন্ড সোজা করে, মাথা উঁচু করে ভদ্রভাবে কথা বলতে দিচ্ছে কিনা?

অলীক অন্ধ প্রতিযোগিতায় গা না ভাসিয়ে, নিজেদের স্বকীয়তাকে আবিস্কার করে এর উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে এই বৈরী সমাজে টিকে থাকার লড়াইয়ের জন্য আগে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। আমি বলছি না, এজন্য উগ্র বা বেপরোয়া হতে হবে, তবে পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায় তথা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অদম্য হতে হলে তবে তাই হওয়া উচিত। কারণ ভালো কিছু মরিয়া হয়ে আদায় করে টিকে থাকলে একটা সময় যারা বিরুদ্ধাচারণ করেছিল তারাই আবার আমাদের সাফল্যে বাহবা দিয়ে প্রয়োজনে সাহায্য নিতে আসবে। সেদিন সাফল্যের হাসি হেসে তাদের সাহায্য করে আত্মতৃপ্তির জন্য সংগ্রাম করে হলেও বেঁচে থাকতে হবে।

ইভানা তার খুদে বার্তায় লিখেছিলেন, ‘সম্ভাব্য তালাকের চিন্তায় আমার ভেতরটা চুরমার হয়ে যাচ্ছে। আমার খুব খারাপ লাগছে। আমার মা-বাবা সহ্য করতে পারবে না। তাদের বয়স হয়েছে।’

জেনে রাখা ভালো-সমাজে এ রকম অনেক কিছুই আমাদের স্বপ্নকে চুরমার করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তাই নিজের মানসিকতাকে এমনভাবে গড়তে হবে যেন তালাকের মতো অন্য কোনও কিছু আমাদের স্বপ্নকে চুরমার করতে না পারে।

এখন প্রশ্ন হলো- মা-বাবা, আত্মীয় স্বজনেরা বিষয়টাকে কিভাবে নিবে? তারা আমাদের চুরমার হওয়াকে সাময়িকভাবে নেতিবাচক হিসেবে নিলেও নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন। যখন এই আঘাতের ক্ষত শুকিয়ে আমরা ঘুরে দাঁড়াবো, তখন আত্মীয় স্বজনরাই গর্বের হাসি হাসবে। তবে সেদিন পর্যন্ত লড়ে যেতে হবে।

স্বামীর সাথে ইভানা

আরেকটা খুদে বার্তায় ইভানা নাকি বলেছিলেন, ‘স্বামী তার উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে তাকে তালাকের কথা বলেছেন, কিন্তু এতে তার পরিবার ছোট হয়ে যাবে। তার দুটো সন্তান আছে, সে যে টাকা রোজগার করে, তাতে দুটো সন্তান নিয়ে চলতে পারবে না।’

এক্ষেত্রে মিলিয়ে নেওয়া বা মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা একপক্ষ থেকে কখনও সম্ভব নয়। তাই অপর পক্ষ না চাইলে, একা একা মানিয়ে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা না করে ডিভোর্স নিয়ে নিজের জীবন রক্ষা করাই শ্রেয়। এতে পরিবারের ছোট হওয়ার কিছু নেই। এসব ক্ষেত্রে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি অন্যথায় ইভানার মতো হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সবার আগে চিন্তা করতে হবে আর্থিক স্বনির্ভরতার কথা। স্বনির্ভরতার প্রাথমিক পর্যায়ে প্রত্যাশা কিছুটা কমিয়ে দৃঢ় মনোবল নিয়ে যে কোনও কাজে নিবেদিত থাকলে, জয় সুনিশ্চিত। এক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা বড় কোনও বাঁধা নয়।

এ প্রসঙ্গে ক্লাস ফাইভ পাস আমার এক আত্মীয়ের বাস্তব গল্প বলি-পরিবারে ভাই বোনদের মধ্যে আপা ছিলেন ডানপিটে স্বভাবের। তার এই স্বভাবের জন্য তাকে কোনও মতে পাত্রস্থ করার জন্য পরিবার অশিক্ষিত কর্মঠ এক ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক করেন। শুনেছিলাম আপা নাকি বিয়ের আগে মুখোশ পরে তার হবু শ্বশুর বাড়ি গিয়ে বিয়ে ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিয়ে ঠেকাতে পারেননি। বিয়ে হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে তিনি কিছুটা অস্বাভাবিক হয়ে যান। তার ঐ সময়কার উম্মাদ সংলাপগুলো এখনও আমার চোখে ভাসছে। গল্পটার শেষ তখনই হতে পারতো যদি আপা হেরে যেতেন। তার পরিবারের যত্নে আপা সুস্থ হয়ে উঠেন। তার অল্প শিক্ষিত জামাই একটা জাহাজে চাকুরি নেয়। সংসার শুরু করে তিনটা বাচ্চা হওয়ার পরে স্বামী তাদের খোঁজ-খবর নেওয়া বন্ধ করে দেয়। কয়েক মাস গ্রামে কষ্টে কাটানোর পর তিন সন্তান নিয়ে স্বামীর সন্ধানে নারায়নগঞ্জ বন্দরে এসে অনেক খোঁজ করার পর স্বামীর সাক্ষাত পান। মাস্টারের মেয়ে নারায়নগঞ্জে বস্তির মতো এক রুমে আবার সংসার শুরু করে। ভাবছেন নাটকের এখানেই শেষ? না, তার জামাই তাদের নারায়নগঞ্জে এক রুমে রেখে অন্য বন্দরে পুনরায় গা ঢাকা দেয়। ঐ দৃঢ়চেতা আপা তিন সন্তানকে এক রুমের ভাড়া বাসায় তালাবদ্ধ রেখে, জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার জন্য নারায়নগঞ্জে গার্মেন্টসে কাজ শুরু করেন।

স্বামীর পিছনে ছোটা বন্ধ করে জীবন সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েন। মাস্টারের মেয়ে গার্মেন্টসে চাকুরি করে বলে গ্রামীণ সমাজের মানুষ অনেক কথা শুনাতো। আপা গ্রামে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। কিন্তু দূর্ভাগ্য তার পিছু ছাড়ে না। ছোট ছেলেটা অসুখে মারা গেলেও তিনি দমে যাননি। একমাত্র মেয়েটি ছোট একটা চাকরি নেয় আর ছেলেটা পড়াশুনা শুরু করে। মা-মেয়ে যখন পারিবারিক স্বচ্ছলতার মুখ দেখে তখন ঐ স্বামী আবার ফেরত আসে। স্বামীকে গ্রহণ করলেও পরিবারে তার আর্থিক কন্ট্রিবিউশন নিশ্চিত করেন। এ ছাড়া ঐ সংগ্রামী আপার এক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ভাইয়ের দায়ভার যখন এই সমাজ তথা সরকার নিতে ব্যর্থ হয়, তখন তিনি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ভাইকে নারায়নগঞ্জে চাকুরিসহ বিয়ের ব্যবস্থা করে সুন্দর জীবন দান করেন।

আপার সংগ্রামের বাস্তব গল্প এখানে শেষ হলেও নিজের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি একমাত্র মেয়েকে অনেক ভেবে চিন্তে তার সহকর্মীর ভাইয়ের সাথে বিয়ে দেন। এবার ঘটল অন্যরকম দূর্ঘটনা। বিয়ের কয়েক দিনের মধ্যেই মেয়ে বন্ধুসুলভ মাকে নতুন বরের শারীরিক অক্ষমতার কথা জানালে বাস্তববাদী আপা দ্রুত তাকে ডিভোর্স করিয়ে বুঝাতে সক্ষম হন-এটা জীবনের একটা ঘটনা মাত্র। কয়েক বছরের মধ্যেই মেয়েকে আবার ভালো পরিবারে পাত্রস্থ করেন। মেয়ের কাছাকাছি বাসা ভাড়া নিয়ে চাকরি অব্যাহত রেখে মেয়েকে ভরসা দেওয়াসহ ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ায় মনোনিবেশ করেন।

কয়েক বছর আগে নারায়ণগঞ্জে আপার নামে জমির দলিল রেজিস্ট্রেশন করিয়ে দেওয়ার জন্য আমার কাছে এসেছিলেন। তার নামে জমি কিনতে দেখে আমি অবাক হয়নি কিন্তু আশ্চর্য হয়েছি যখন উনি বললেন, ‘এই জমির দলিলে আমি জীবিত থাকা অবস্থায় আমার মেয়ের নামে এমন একটা অংশ নির্ধারণ করে দাও, যেন আমার মৃত্যুর পরে তার প্রাপ্য অংশের সাথে এই অংশ যোগ হলে মেয়েটি অর্ধেক সম্পত্তির মালিক হতে পারে।’ দলিলটি তৈরি করে, তাদের সম্মান জানিয়ে উৎসাহিত করতে প্রথমবারের মতো আমি জমি রেজিষ্ট্রেশনের কাজে নারায়ণগঞ্জ গিয়েছিলাম। এমন এক সংগ্রামী নারীর কাজিন হয়ে আমি ধন্য।

গল্পের স্বশিক্ষিত আপা প্রমাণ করলেন-দৃঢ় মনোবল আর আত্মমর্যাদা নিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার তীব্র ইচ্ছা থাকলে পৃথিবীর সব বাধা-বিপত্তি অবলীলায় অতিক্রম করে সফল হওয়া সম্ভব। নারীদের এই সংগ্রামী যাত্রায় অভিভাবক হিসেবে শক্তি ও সাহসের উৎস হতে না পারলেও ভরসাস্থল হওয়া আবশ্যক। তবেই আমরা কখনও পৃথিবী ছেড়ে যাবো না বরং পৃথিবীকে ছাড়িয়ে যাবো।

তাসরিফা জলি: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট