Advertisement
অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল: সম্প্রতি বিশাল একটা হৃদয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। অমন বিশাল হৃদয়ের মানুষটির নামটাও হৃদয় মণ্ডল। মফস্বলের স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক বিশাল হৃদয়ের হৃদয় মণ্ডলের নামটা সম্প্রতি দেশের মানুষের মুখে মুখে ঘুরেছে এমন একটি কারণে, যা নিয়ে লজ্জায় অবনত হয়েছে বাংলাদেশ। ক্লাসের বিজ্ঞান বিষয়ক পাঠদানকে সাম্প্রদায়িক কালিমায় কলংকিত করে শিক্ষাগুরুকে জেলের ভাত খাইয়ে ছেড়েছে একদল ধর্মান্ধ ছাত্র আর তাদের পেছনে ক্রিয়াশীল নেপথ্যের অপশক্তিগুলো। প্রায় দু’সপ্তাহের বেশি কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়েছেন হৃদয় মণ্ডল, মুক্তি পেয়েছে বাংলাদেশের হৃদয়!

হৃদয় মণ্ডলের সাথে আমার পূর্ব পরিচয় ছিল না। পরিচিত হয়ে প্রশান্তি অনুভব করেছি ঠিকই, কিন্তু একই সাথে মনে হয়েছে পরিচয়পর্বটা এমনটা না হলেই বরং ভালো ছিল। জামিনে মুক্তি পেয়েও সঙ্গত কারণেই এলাকায় ফিরে যাওয়াটা ঝুলে গিয়েছিল হৃদয় মণ্ডলের। শুক্রবারের সেই সকালে তাকে সাথে নিয়ে আমাদের মুন্সিগঞ্জ যাত্রা। আমরা মানে দেশের সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিত্বশীল পনেরজন মানুষ। ছিলেন শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসির মামুন, নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, মাননীয় সাংসদ এ্যারোমা দত্ত, সমাজকর্মী কাজি মুকুল, অধ্যাপক অহিদুজ্জামান চান, অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা প্রমুখ। উদ্দেশ্য মুন্সিগঞ্জে একটি প্রেস কনফারেন্স আর পাশাপাশি স্থানীয় সুশীল সমাজের সাথে মতবিনিময় করা। সাথে থাকবেন হৃদয় মণ্ডলও। তার বক্তব্য রাখার পালা যখন এলো, বুঝলাম এহেন হৃদয় মণ্ডলের হৃদয়টি কতখানি প্রশস্ত। কারো প্রতি তার কোন অভিযোগ নেই, বরং পাশে দাড়ানোয় সবার প্রতি তার সরব কৃতজ্ঞতা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুন্সিগঞ্জের স্বাধীনতার স্বপক্ষের প্রত্যেক স্টলওয়ার্থই। ছিলেন যেমন জনপ্রতিনিধি, তেমনি ছিলেন রাজনৈতিক ও পেশাজীবি নেতৃবৃন্দ, ছিলেন সংবাদকর্মীরা আর সাথে ছিলেন সমাজে যারা সুশীল। উপস্থিত হয়েছিলেন স্থানীয় জনপ্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাও। মঞ্চে বসে একের পর এক বক্তার বক্তব্য যখন শুনছিলাম তখন হঠাৎই ভাবনাটা মাথায় এলো। বাংলাদেশের হৃদয়ে আজকে যে রক্তক্ষরন তার কারণটা বোধকরি, মুন্সিগঞ্জের একজন হৃদয় মণ্ডলের কল্যানেই বুঝতে পারলাম। আগেই বলে রাখি, কারো প্রতি কোন ইঙ্গিত বা কাউকে কোনভাবেই হেয়প্রতিপন্ন করাটা আমার উদ্দেশ্য নয়।

আমাদের দেশে যোগ্য রাজনীতিবিদ আর দক্ষ প্রশাসকের কোন সংকট আছে বলে আমার মনে হয় না। একইভাবে আমি মনে করিনা যে এখানে সুশীল সমাজকেও ঘুনে ধরেছে। আমি যা বুঝি, তা হলো এই শক্তিগুলোর যে পারস্পরিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া তার চরিত্রটা এদেশে আমুলে বদলে গেছে। প্রশাসন আর রাজনীতি তাদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চরিত্র ঠিকই ধরে রেখেছে। কিন্তু চারিত্রিক বৈশিষ্ট হারিয়ে ফেলেছি আমরা যারা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্বের দাবিদার তারা। একটা সময় ছিল যখন সিভিল সোসাইটি এদেশে বড় যে কোন আন্দোলনে সামনে থেকে ভূমিকা রেখেছে এবং সেটা করেছে কোন ধরনের প্রাপ্তিযোগের প্রত্যাশা ছাড়াই। ৬১’তে যখন রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ হলেন, সেখান থেকে ৬৬’র ছয় দফা আন্দোলন পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীকার আন্দোলনের বাতিটুকু জ্বালিয়ে রাখায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল এদেশের সিভিল সোসাইটি। এ বিষয়টি সবচেয়ে ভালোভাবে অনুধাবন করতেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর এখন তা ধারন করে চলেছেন তার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ নামক সিভিল সোসাইটি মুভমেন্টটিকে নিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে মুভ করতে যেয়ে আমি প্রতিনিয়ত এই সত্যটুকু হাড়ে হাড়ে টের পাই। মুন্সিগঞ্জে হৃদয় মণ্ডলকে নিয়ে আমাদের যে মতবিনিময় সভা কাম প্রেস কনফারেন্স, তা আয়োজন করা হয়েছিল মুন্সিগঞ্জ সার্কিট হাউজে। অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন মুন্সিগঞ্জের প্রশাসনিক কর্তারা। আর হৃদয় মণ্ডল যে স্বসম্মানে আবারো তার কর্মস্থলে যোগদান করছেন, তা নিশ্চিত করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি। নিজ বাসভবনে তার বসবাসকে নিরাপদ করার দায়িত্বও কাধে তুলে নিয়ে নিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আর প্রশাসন। অর্থাৎ প্রশাসন আর জনপ্রতিনিধি তাদের কাজটুকু এখন ঠিকঠাক মতই করছেন। আর তাই হৃদয় মণ্ডলও আবারো একটা ঠিকঠাক জীবনে প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশা করতে পারছেন, যেমনটি পারছে পুরো মুন্সিগঞ্জ জেলাই।

অথচ সমাজের এই রসায়নগুলো যদি শুরুতেই ঠিকঠাকমত ক্রিয়া-বিক্রিয়া করতো, তাহলেতো মফস্বলের শিক্ষক হৃদয় মণ্ডল মফস্বলের গন্ডি ডিঙ্গিয়ে কোন দিনই সারা দেশের হৃদয়ে ছুয়ে যেতে পারতেন না। এমনটি হয়েছিল কারণ, আমার দৃষ্টিতে এই ক্রিয়া-বিক্রিয়াগুলোর যে মুল অনুঘটক, সেই সিভিল সোসাইটির নিস্ক্রিয়তা অথবা ব্যর্থতা। আর শুক্রবারের সেই সকালে পুরো সমাজের সব রসায়নগুলোর এই যে এত সুন্দর ক্রিয়া-বিক্রিয়া তার কারণও ঐ একটাই – পুরো রসায়নটাকেই বিনি সুতার মালায় অদ্ভুতভাবে সেদিন গেথে ছিলেন আমাদের সিভিল সোসাইটি।

বাংলাদেশের আজকের যে সংকট এর সূচনা সেদিন থেকে যেদিন প্রাপ্তি আর প্রত্যাশার অংক মেলাতে যেয়ে সিভিল সোসাইটির অনেকে সামনে না থেকে পেছন পেছন হাটতে শুরু করেছিলেন।  অংকগুলোর ঠিকঠাকমত আবারো মিলতে শুরু করবে যদি সিভিল সোসাইটি আবারো একসাথে একভাবে হাটতে শুরু করেন, যেমনটি তাদের করার কথা। বিশেষ করে দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যখন একজন শেখ হাসিনা, যিনি নিজে যতটুকু রাজনীতিবিদ ঠিক ততটুকুই একজন সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিও বটে, তখন এমন অংক না মেলার কোনও কারণ অন্তত আমার দৃষ্টিতে থাকতে পারে না। এখন আমাদের পালা। মুন্সিগঞ্জের একজন বিশাল হৃদয়ের হৃদয় মণ্ডল আমাকে এই কথাটাই সেদিন চোখে আঙ্গুল দিয়ে শিখিয়ে দিয়েছেন।

(লেখক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশনের প্রধান ও সম্প্রীতি বাংলাদেশের সদস্য সচিব)

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Md. Mahamudul Hasan, widely known as Hasan Major, is a career journalist with over two decades of professional experience across print, broadcast and digital media. He is the founding Editor of Zoombangla.com. He has previously worked for national English daily New Age, The Independent, The Bangladesh Observer, leading Bangla daily Prothom Alo and state-owned Bangladesh Betar. Hasan Major holds both graduate and postgraduate degrees in Communication and Journalism from the University of Chittagong.