একটি সবুজস্বর্গের জন্য আকুতি

জয়দীপ দে শাপলু: চট্টগ্রাম শহর। আশি নব্বই শূন্য- তিনটা দশক, আমার শৈশব কৈশোর যৌবন, কেটেছে এ শহরে। স্বর্গের মতো একটা শহর দেখতে দেখতে ধূলি-ধূসর হয়ে গেল। শহরের প্রত্যেকটি মোড়ে একটি করে ফুলের বাগান ছিল। নিউ মার্কেট, টাইগারপাস, বাদামতলী, ষোলশহর, জিইসি…। কই গেল সেই বাগানগুলো। টিলার উপর অপরূপ সুন্দর একটা সার্কিট হাউস। এর নিচে কী সুন্দর পাহাড়ী ঢাল ছিল। হাতের উপর ভর করে হেলান দিয়ে সারাটা বিকেল এখানে বসে কাটানো যেত। হুহু করে বাতাস আসত সাগর থেকে। কই গেল সেই খোলা প্রান্তর?

আমাদের স্কুলের পেছনে সারি সারি পাহাড় ছিল। সেই পাহাড় ধরে হেঁটে হেঁটে সুন্দর চলে যেতাম ফয়েজ লেক। বাঁয়ে পড়ে থাকত একটা দারুণ ঝিল। সেই পাহাড় কই। টিভি সেন্টার, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়- সবকিছুর নিচে চাপা পড়ে গেছে একটা সবুজস্বর্গ। এখন একটু বর্ষা হলে কী নাকালই না হতে হয় এই শহরের লোকজনকে।

এতো হতাশার মাঝে চট্টগ্রামবাসীর গর্বের ধন হলো শহরের মধ্যে এক টুকরো পাহাড়ী সবুজ ভূমি- সিআরবি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এর ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছেন। ফলে নগরবাসীর বৈকালিক ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠে এই সিআরবি। হয়ত এই সরকার এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড না করলে ছিনতাইকারী অধ্যুষিত নিরিবিল এই জায়গাটির প্রতি জনগণের কোন আগ্রহ থাকত না।

বাবা রেলে চাকরি করতেন। আমাদের বাসাটা সম্ভবত ১৮৯৭ সালের। আমাদের স্কুলের পাশেই ছিল বীরকন্যা প্রীতিলতার স্মৃতিধন্য ইউরোপিয়ান ক্লাব। অল্প দূরেই যুব বিদ্রোহের অন্যতম লক্ষ্যস্থল অক্সিলিয়ারি ফোর্সের অস্ত্রাগার। ফলে শৈশব থেকে ইতিহাসের সমান্তরালে বড়ো হয়েছি। তাই এই বয়সেও ইতিহাসের নেশা কাটেনি। সিআরবি আমার কাছে কেবল একটা সবুজ ভূ-খণ্ড নয়, তারও অধিক।

উনবিংশ শতকের মাঝামাঝিতে ভারতবর্ষ থেকে ইংরেজরা কাঙ্খিত মুনফা নিয়ে যেতে পারছিল না। কাপড় মশলা কিংবা আফিমের বাজার ক্রমেই সংকোচিত হয়ে আসছিল। তখন ইউরোপ জুড়ে চীনের চায়ের রমরমা বাজার। সেই বাজার ধরতে এখানকার ব্রিটিশরা মরিয়া হয়ে উঠল। আসামের বন কেটে গড়ে তোলা হল বড়ো বড়ো চাবাগান। কিন্তু যোগযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে সেই চা কলকাতায় পাঠানো কষ্ট ও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠল। এই সমস্যার সমাধানে ১৮৯২ সালের ১৮ মার্চ টি-প্ল্যান্টাররা লন্ডনে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে। ১৯০৩ সাল নাগাদ এ কোম্পানি ৭৪০ মাইল রেললাইন তৈরির কাজ শেষ করে। ফলে আপার আসামের সঙ্গে চট্টগ্রাম ও চাঁদপুরের সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়। প্রথম এ অঞ্চলে আধুনিক শিল্পায়নের সূচনা হয়।

এই রেল কোম্পানির প্রধান দপ্তর হিসেবে ১৮৯৯ সালে চট্টগ্রামে এক বিশাল লাল দালান তৈরি করা হয়। একে ঘিরে ১৬০ একর জায়গায় বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পিত শহর গড়ে তুলে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়াররা। জায়গাটি আগে সেনাবাহিনির ছিল। ব্রিটিশ সরকার তা রেলওয়ে কোম্পানিকে দেয়। যেহেতু এটি কেন্দ্রীয় দপ্তর, তাই এর নাম দেওয়া হয় সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং। সংক্ষেপে সিআরবি।

আজকের সিআরবি থেকে একসময় পুরো আসাম এবং বাংলার একটি বড়ো অংশের রেলযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করা হত। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের স্থলভাগের কাজ তদারকি করত। এ কোম্পানির হাতেই চট্টগ্রাম বন্দরের বিকাশ।

১৯৪২ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে, ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের সঙ্গে এক হয়ে বেঙ্গল এন্ড আসাম রেলওয়েতে রূপান্তরিত হয়। সেই কোম্পানির সদর দপ্তর আর চট্টগ্রামে থাকেনি। চলে যায় কলকাতায়। ১৯৪৭ সালে সিআরবি আবার তার হৃত গৌরব ফিরে পায়। এ অঞ্চলের রেলওয়ের সদর দপ্তর হয় সিআরবি। ১৯৬২তে পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে বোর্ড গঠিত হলে এর সদরদপ্তর হয় সিআরবি। (তথ্যসূত্র: রেলকে ঘিরে- জয়দীপ দে)

সিআরবি তাই শুধু একটি সবুজেঘেরা লোকালয়ই নয়, চট্টগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল অতীতের সাক্ষী। এই জায়গাটুকু আধুনিক ইমারতের তলায় চাপা পড়ে গেলে অনেক কিছুই বিস্মৃত হয়ে যাবে।

চট্টগ্রাম শহরে এর আগেও রেলওয়ের ভূমিতে অনেক হাসপাতাল হয়েছে। ইউএসটিসি, হলিক্রিসেন্ট, কিডনি ফাউন্ডেশন, চক্ষু হাসপাতাল, ইম্পিরিয়াল হাসপাতাল, ডায়বেটিস হাসপাতাল ইত্যাদি। দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া বাকিগুলো থেকে রেলওয়ে কিংবা নগরবাসী কী উপকার পেয়েছেন একটু বিবেচনার দাবি রাখে। এর প্রধান কারণ রেলওয়ে বড়ো মনে তার জমি জনকল্যাণে দান করেছে। চিকিৎসাও যে ব্যবসা হতে পারে সে ধারণা তাদের ছিল না। অপরপক্ষ অল্প দামে জমি পেয়ে ব্যবসা করেছে রমরমা।

রেলওয়ের অব্যবহৃত বিপুল ভূমি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে রেলওয়ে লাভের মুখ দেখুক, সে দাবি রেলপ্রেমী হিসেবে বহুদিন ধরে আমি করে এসেছি। সরকারের এই মহতী ও দূরদর্শী উদ্যোগের প্রশংসা করি। সরকারি বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে দেশ এগিয়ে যাক।

কিন্তু জনগণ ও পরিবেশবাদীরা যে উৎকণ্ঠা দেখাচ্ছেন সেটাও অগ্রাহ্যের উপায় নেই। আমি নিশ্চিত সরকার এটি সক্রিয় বিবেচনায় রেখেছেন। পরিবেশ বান্ধব সরকার সবকিছু ভেবে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

চট্টগ্রামে ৬ একর ভূমি বের করা খুব একটা কঠিন কাজ হবে না ‘চট্টগ্রামের জমিদার’ বলে পরিচিত রেলওয়ের জন্য। কিন্তু সিআরবির সৌন্দর্য যদি ক্ষুণ্ন হয় চট্টলাবাসী তো ক্ষতিগ্রস্ত হবে, প্রতিদিনের ভোগান্তির শিকার হবে রেল কর্তৃপক্ষ। রেলওয়ে তা গৌরব হারিয়ে ফেলবে।

ষোলশহর, হালিশহরে, ফৌজদারহাট, জালানিহাট, কুমিরায় রেলওয়ের প্রচুর পরিত্যক্ত ভূমি আছে। কর্ণফূলি শাসন করলে হাজার হাজার একর ভূমি উদ্ধার করা সম্ভব। এসবকে বিকল্প হিসেবে ভাবা যায়।

অনেক হয়েছে, সবুজস্বর্গে আর কংক্রিটের জঞ্জাল তুলবেন না প্লিজ।


জুমবাংলানিউজ/এইচএম