আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ‘সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, এটা একটা লাভ স্টোরি।’ এভাবেই বলছিলেন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কাজ করা আব্দুল্লাহ সাদান। তিনি তার দেশ আফগানিস্তানে একসময় অভিনয় করতেন এবং প্রায় ৫০ বছর আগে তিনি একটা চলচ্চিত্রে কাজ করেন যেটার গল্প ছিল প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে।

Advertisement

চলচ্চিত্রের গল্পটা মধ্যযুগের এক রাজকুমারীকে নিয়ে, যার নাম রাবিয়া বালখি, যিনি একটা সাধারণ মানুষের প্রেমে পড়েন এবং যার জন্য রাবিয়াকে তার ভাইয়ের হাতে খুন হতে হয়। চলচ্চিত্রে রাবিয়ার প্রেমিকের চরিত্রে অভিনয় করেন সাদান। ‘তারা ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ভালোবাসার জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন। আর সেটাই মানুষদের তাদের ব্যাপারে আকৃষ্ট করেছিল,’ পিএইচডি শিক্ষার্থী শামীম হুমায়ুন বলছিলেন।

তিনি খানিকটা মজা করেই জানান, রাবিয়াকে মানুষ দুইভাবে দেখে থাকে। কারো কারো কাছে তিনি মুসলিম বিশেষ দূত, যার ভালোবাসা একেবারে পবিত্র, আবার কারো কারো কাছে তিনি একজন নারীবাদী যার ভালোবাসা অনেক সর্বনাশা, আর এটা নির্ভর করে কে কীভাবে তাকে ও তার প্রেমকে নিচ্ছে। এর বাইরে রাবিয়াকে ধরা হয় ইসলামের স্বর্ণযুগের বিখ্যাত কবিদের একজন হিসেবে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএচইডি করা মুনাজ্জা এবতেকার বলেন, আফগানদের কল্পনার জগতে রাবিয়া ভীষণ সম্মানিত একটি চরিত্র।

রাবিয়া উঠে আসেন বালখ এলাকা থেকে যা এখনকার আফগানিস্তানের একটি অংশ। নবম শতকে বালখ শহরটা গণিত ও জ্যোতিবিজ্ঞানের উন্নতিতে ব্যাপক অবদান রাখে। দশম শতকের বিখ্যাত দার্শনিক ও বিজ্ঞানী ইবনে সিনাও এই শহরেরই ছিলেন। রাবিয়ার জন্মের সঠিক কোনো তারিখ জানা যায় না, তবে ধারণা করা হয় তিনি ৯৪০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব সম্পর্কেও খুব বেশি কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

তবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তার গল্প বলা হয়ে এসেছে। আর যারাই তাকে নিয়ে বলেছেন, তারা তখন নিজের মতো করে রাবিয়ার চরিত্রের যে দিকটা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে সেদিকেই জোর দিয়েছেন। আর এভাবেই ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায় তার সম্পর্কে। কিন্তু মুনাজ্জা আমাদের যে গল্পটা বলেন সেটিই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত।

যখন বালখের আমিরের ঘরে তার কন্যা রাবিয়ার জন্ম হয়, তাকে গোলাপের পানিতে গোসল করানো হয়, সিল্কের কাপড়ে মোড়ানো হয় এবং সোনায় মোড়ানো রথে নেয়া হয় তাকে। পুরো বালখের মানুষ রাবিয়ার জন্ম উৎসবে মেতে ওঠে। রাবিয়া প্রাসাদেই বড় হয়ে ওঠেন এবং সেখানে তিনি শিল্পকলা, সাহিত্য, শিকার এবং তীর-ধনুক চালানো শেখেন।

ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল এবং আফ্রিকান স্টাডিজের নারগিস ফারজাদ বিবিসিকে বলেন সে সময় ঐ অঞ্চলে নারী শিক্ষা খুব অস্বাভাবিক ছিল না। তিনি বলেন, সেসময় ইসলামপূর্ব বিভিন্ন রীতি নীতি ও প্রথা ইসলামিক যুগেও চলে আসে। ফলে তখনকার উচ্চবিত্ত ও মানী লোকেরা তাদের ছেলেদের যেভাবে শিক্ষাদান করতো মেয়েদেরও একইভাবে শিক্ষার সুযোগ দিত।

বলা হয় সেসময়ের বিখ্যাত ফার্সি কবি রুদাকিও রাবিয়ার বাকপটুতা, ভাষার দক্ষতা ও কাব্য প্রতিভায় প্রভাবিত হয়েছিলেন। আর প্রচলিত আছে, রাবিয়া যে শুধু দেখতে সুন্দরী ছিলেন তাই নয়, তার কথাও ছিল খুবই আকর্ষণীয়। তিনি নিজের কবিতা দিয়ে সেসময়ের সব লেখক ও কবিকে চমকে দিয়েছিলেন। তার বাবা-মা যেমন মেয়েতে মুগ্ধ ছিল তেমনি পুরো বালখের মানুষ তার ভক্ত ছিল।

কিন্তু তার এত জনপ্রিয়তা সহ্য করতে পারেননি তার ভাই হারিস, তিনি বোনের প্রতি ঈর্ষা বোধ করতে থাকেন। তাদের বাবা যখন মৃত্যুশয্যায় সেসময় হারিস বাবাকে কথা দেয় যে বোনকে তিনি দেখে রাখবেন, কিন্তু তিনি যখন রাজা হন তখন তিনিই হয়ে উঠেন রাবিয়ার মৃত্যুর কারণ।

রক্তে লেখা চিঠি

কথিত আছে একদিন রাবিয়া ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বাগানের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, এসময় তার চোখে পড়ে এক সুদর্শন লোক তার ভাই হারিসের সাথে ওয়াইন পান করছে। মুনাজ্জার বর্ণনা অনুযায়ী, হারিসের এক তুর্কী দাস বাখতাশ, যিনি আবার কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বেও ছিলেন, তিনি রাবিয়ার হৃদয়ে জায়গা করে নেন। আর এখান থেকেই রাবিয়ার ‘লাভ স্টোরি’ ও কবিতার শুরু, যা শেষ হয় ট্রাজেডিতে।

রাবিয়া তার বিশ্বস্ত অনুচর রানার মাধ্যমে বাখতাশের কাছে প্রেমপত্র পাঠাতে শুরু করেন। ‘ও অদৃশ্য এবং বর্তমান! কোথায় তুমি? এসো এবং আমার চোখ ও হৃদয়কে জীবনের জন্য দেখতে দাও, অথবা এই তলোয়ার নিয়ে আমার জীবন শেষ করে দাও।’ আর তিনিও একই রকম প্রেমময় ও কাব্যিক ভাষায় চিঠির উত্তর পেতে থাকেন।

যখন কান্দাহারের শাসক বালখ আক্রমণের চেষ্টা করে, তখন হারিসকে তার উপদেষ্টারা বলেন বাখতাশের সাহায্য ছাড়া তিনি শত্রুকে পরাজিত করতে পারবেন না। হারিস ওয়াদা করেন যদি বাখতাশ তার শত্রুদের মারতে পারে, তাহলে বিনিময়ে তিনি যা চাইবেন তাই পুরস্কার দেবেন। বাখতাশ এতে সফল হন কিন্তু তার জীবন সংকটের মধ্যে পড়ে।

তিনি যখন যুদ্ধে প্রায় মারা যাচ্ছিলেন সেই সময় এক সৈন্য মুখ ঢেকে তাকে রক্ষায় এগিয়ে আসে। আর সেই সৈন্যটি ছিল রাবিয়া। কিন্তু যখন হারিস তাদের এই ভালোবাসার কথা জেনে যান, তিনি বাখতাশকে একটি কূপে নিক্ষেপের আদেশ দেন, আর রাবিয়াকে বন্দি করে রাখেন তুর্কী গোসলখানায়।

কারো কারো বর্ণনায় পাওয়া যায় যে হারিস তার বোন রাবিয়ার হাতের শিরা কাটার আদেশ দেন, কিন্তু আবার অনেকে বলে থাকেন রাবিয়া নিজেই তার কবজির শিরা কেটে ফেলেন। কিন্তু সবাই এ ব্যাপারে একমত যে রাবিয়া তার শেষ কবিতাটি নিজের রক্ত দিয়েই রাজকীয় এই গোসলখানার দেয়ালে লিখে যান।

‘আমি তোমার ভালোবাসার বন্দী, আর এ থেকে মুক্তি নেই কোনো

ভালোবাসা এক অনন্ত সাগর, যেখানে কোন বুদ্ধিমান লোক সাঁতার কাটার চিন্তাও করে না।

যদি তুমি শেষ পর্যন্ত ভালোবাসতে চাও, তাহলে যেটা অগ্রহণযোগ্য সেটাও গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকো।

হাসিমুখে প্রতিকূল অবস্থাকে স্বাগত জানাও, মধু মনে করে বিষ পান করে নাও।’

কিছুদিন পর, রানার সহায়তায়, বাখতাশ কূপ থেকে বের হয়ে আসতে সমর্থ হন এবং হারিসকে হত্যা করেন। কিন্তু তিনি দেখতে পান রাবিয়ার রক্তমাখা শরীর বাথরুমে পড়ে আছে এবং তার শেষ প্রেমের কবিতা দেয়ালে লেখা। সাথে সাথেই তিনি নিজেও মাটিতে পড়ে যান এবং প্রিয়জনের সঙ্গে তাৎক্ষণিক মৃত্যুবরণ করেন।

নারগিস ফারজাদ বলেন, রাবিয়া মারা যাওয়ার কয়েক শতাব্দী পরেও তার সৌন্দর্য ও মহত্ত্বের বিষয়টি কবিতায় উঠে এসেছে। তাদের একজন আবু সাইদ আবু আল খাইর, যিনি প্রথম সুফি কবি হিসেবে পরিচিত। তিনি দাবি করেন এই ভালোবাসার গল্পে প্রধান চরিত্র রাবিয়া।

হুমায়ুনের ভাষায়, আবু আল খাইর রাবিয়ার এই প্রেম নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং তিনি ধরেই নেন এরকম তীব্র ভালোবাসা ঐশ্বরিক। হুমায়ুন বলেন, এখন যদিও আবু আল খাইরের লেখা আর পাওয়া যায় না, কিন্তু রাবিয়ার গল্প এখনও মানুষ জানে ১৩ শতকের ফার্সি কবি ফরিদ আল দিন আত্তারের লেখায়। তিনি বলেন এই দুই কবির উপর রাবিয়ার প্রভাব বলে দেয় তিনি ছিলেন সত্যিকারের সুফি।

তিনি বর্ণনা করেন, বাখতাশের প্রতি রাবিয়ার ভালোবাসা কোনো জাগতিক বা শারীরিক বিষয় নয়; বরং তার ভালোবাসা ছিল ঐশ্বরিক। তবে অনেকের কাছে রাবিয়া নারীদের জন্য সাহসের একটা উদাহরণ এবং তার ভালোবাসাকে তারা দেখেন প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে।

২০১৮ সালে কাবুলে উল্লেখযোগ্য নারীদের নিয়ে একটা প্রদর্শনী হয়, সেখানে আফগান শিল্পী ও ফটোগ্রাফার রিদা আকবর রাবিয়াকে বর্ণনা করেন, পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের একটা প্রতীক হিসেবে এবং আফগান নারীরা যে সেই প্রাচীন আমল থেকে কী পরিমাণ মূল্য দিয়ে আসছে সেটিই যেন মনে করিয়ে দেন তিনি।

মুনাজ্জা এবতেকার বলেন, তাকে স্বাধীন মতপ্রকাশ ও ভালোবাসার মূল্য দিতে হয়েছে। কয়েক দশক আগে যখন আফগানিস্তানের প্রথম স্বাধীন চলচ্চিত্র রাবিয়াস বালখি মুক্তি পায়, সেই সময় জনপ্রিয় ম্যাগাজিন জায়ুন রাবিয়ার গল্পকে একটা আর্টিকেলে প্রকাশ করেন আফগান সমাজে নারীদের জয়ধ্বনি হিসেবে।

এখনকার দিনে এটা করা যেত না

আব্দুল্লাহ সাদান যিনি বাখতাশের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি ঐ চলচ্চিত্রের নায়িকা সীমার প্রেমে সত্যি সত্যি পড়ে যান এবং তারা বিয়ে করেন, যেই বিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। “এটা আফগানিস্তানের বিখ্যাত চলচ্চিত্রের একটা, কিন্তু তালিবানদের সময়ে এরকম কিছু করাটা অসম্ভব। প্রায় ৪০ জন মেয়ে এই সিনেমায় কাজ করেছিল,” বলেন সাদান।

শুধু তাই নয়, চলচ্চিত্রের রাবিয়া একজন স্বাধীন, শক্তিশালী ও কঠোর চরিত্রের রানী। সিনেমায় তিনি ও অন্যান্য নারী চরিত্রগুলোকে ১৯৭০ এর দশকের কেতাদুরস্ত ফ্যাশনে ও মনোমুগ্ধকর টাইট পোশাক পরতে দেখা যায়।

এই চলচ্চিত্রটা ১৯৯৬ সালে তালিবান নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মধ্যেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়, ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভের কর্মীরা তড়িঘড়ি করে তৈরি করা একটি নকল দেয়ালের ভেতরে এটি সহ ৬ হাজার দুর্মূল্য চলচ্চিত্র লুকিয়ে রাখে।

তবে রাবিয়ার কবর এখন বন্ধ করে রাখা হয়েছে সামাজিক পাপ হিসেবে। আগে পরে অসংখ্য নারী ও নারীদের নিয়ে সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান, স্কুল, হাসপাতাল ইত্যাদির নামকরণ করা হয়েছে তার নামে, যদিও এখন আবার মেয়েদের জন্য পড়াশোনা ও কাজ করা কঠিন হয়ে গিয়েছে।

তবে আফগান তরুণী মানাজা এবতেকার বলেন, “রাবিয়ার গল্প ও আদর্শ আরও অসংখ্য আফগান মেয়েদের উদ্বুদ্ধ তরে সমাজ মেয়েদের যে অন্যায় সীমানা বেঁধে দিয়েছে সেটাকে চ্যালেঞ্জ করার ও পেরিয়ে যাবার জন্য।”

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Saiful Islam is a journalist at Zoom Bangla News with seven years of experience in news writing and editorial work. He contributes to producing accurate, well-structured, and reader-focused content across digital platforms. His work reflects a strong commitment to editorial standards and responsible journalism.