চলতি বছর পবিত্র রমজান মাস বুধবার নাকি বৃহস্পতিবার শুরু হবে—এ নিয়ে জ্যোতির্বিদরা তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তাদের মতে, আগামী বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) থেকেই রমজান শুরু হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

আজ রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিদ্যা কেন্দ্র (আইএসি) জানিয়েছে, মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রমজানের চাঁদ দেখার চেষ্টা করা হলেও আরব ও ইসলামী বিশ্বের কোথাও তা জ্যোতির্বিদ্যাগতভাবে সম্ভব হবে না। খালি চোখে তো নয়ই, এমনকি দূরবীন বা আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যাগত ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেও চাঁদ দেখা যাবে না।
সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সব চাঁদ-দর্শন মানদণ্ড—ইবন তারিক, ফাদারিংহ্যাম, মন্ডার, ব্রুইন, মোহাম্মদ ইলিয়াস, দক্ষিণ আফ্রিকা জ্যোতির্বিদ্যা মানমন্দির (এসএএও), ইয়ালোপ ও ওদেহ পদ্ধতি—সবগুলোতেই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চাঁদ দেখার সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে নাকচ করা হয়েছে।
এর ফলে যেসব দেশ নিশ্চিত চাঁদ দেখা সাপেক্ষেই চান্দ্র মাস শুরু করে, তারা বুধবার শাবান মাসের ৩০ দিন পূর্ণ করবে এবং বৃহস্পতিবার রমজান শুরু করবে। তবে কিছু দেশ বিকল্প মানদণ্ড অনুসরণ করে এক দিন আগে, অর্থাৎ বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রমজান শুরু ঘোষণা করতে পারে। যদিও এমন দেশের সংখ্যা খুবই সীমিত।
কেন মঙ্গলবার চাঁদ দেখা যাবে না
জ্যোতির্বিদদের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সূর্যাস্তের সময় চাঁদের অবস্থান এমন হবে যে অধিকাংশ অঞ্চলে চাঁদ সূর্যের আগেই অথবা প্রায় একই সময়ে অস্ত যাবে। কোথাও কোথাও সূর্যাস্তের কয়েক মিনিট পর চাঁদ অস্ত গেলেও তা হিলাল বা চাঁদের ক্ষীণ বাঁক গঠনের জন্য যথেষ্ট নয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, জাকার্তায় চাঁদ সূর্যাস্তের ৬ মিনিট আগেই অস্ত যাবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে সূর্যাস্তের ১ মিনিট আগে, রিয়াদে চাঁদের নিচের অংশ সূর্যাস্তের ৪২ সেকেন্ড আগে মিলিয়ে যাবে এবং কায়রোতে সূর্যাস্তের মাত্র ২ মিনিট পর চাঁদ অস্ত যাবে।
এই অবস্থায় সূর্য ও চাঁদের মধ্যকার কৌণিক দূরত্ব থাকবে মাত্র ১ থেকে ২ ডিগ্রি, যা ড্যাঞ্জন সীমা অনুযায়ী চাঁদ দেখার জন্য সম্পূর্ণ অপর্যাপ্ত। ড্যাঞ্জন সীমা অনুসারে, সূর্য ও চাঁদের দূরত্ব ৭ ডিগ্রির কম হলে কোনোভাবেই চাঁদ দেখা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, উন্নত জ্যোতির্বিদ্যাগত ক্যামেরা ও রিয়েল-টাইম ইমেজ প্রসেসিং ব্যবহার করেও মঙ্গলবার চাঁদ শনাক্ত করা যাবে না। ইতিহাসেও ৭ দশমিক ৬ ডিগ্রির কম দূরত্বে খালি চোখে কিংবা ৬ ডিগ্রির কম দূরত্বে দূরবীনে চাঁদ দেখার কোনো প্রমাণ নেই।
এ ছাড়া মঙ্গলবার বিকেলে দক্ষিণ আফ্রিকা ও অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলে বলয়াকার সূর্যগ্রহণ ঘটবে, যা সূর্য ও চাঁদের সংযোগকে দৃশ্যমানভাবে প্রমাণ করে এবং ওই সময়ে চাঁদ দেখার অসম্ভবতাকে আরও জোরালো করে।
জ্যোতির্বিদরা সতর্ক করে বলেন, মঙ্গলবার পশ্চিম আকাশে শুক্র গ্রহ (ভেনাস) দৃশ্যমান থাকায় সেটিকে ভুল করে চাঁদ মনে করার ঝুঁকি রয়েছে। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে।
বুধবার অনুকূল পরিস্থিতি
প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় চাঁদ দেখার পরিস্থিতি অনেক বেশি অনুকূলে থাকবে। এদিন আবুধাবিতে সূর্যাস্তের পর চাঁদ থাকবে ৫৮ মিনিট, মক্কায় ৫৯ মিনিট, আম্মান ও জেরুজালেমে ৬৫ মিনিট, কায়রোতে ৬৪ মিনিট এবং মরোক্কোর রাজধানী রাবাতে ৭৩ মিনিট।
এ সময় চাঁদের বয়স হবে ২৪ থেকে ৩০ ঘণ্টার মধ্যে, যা খালি চোখে চাঁদ দেখার জন্য যথেষ্ট অনুকূল। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে আরব বিশ্বের বড় অংশেই চাঁদ দেখা সম্ভব হবে।
জ্যোতির্বিদ ও ইসলামি আইনবিদরা বলেন, যেসব স্থানে হিসাব অনুযায়ী সূর্যাস্তের আগেই চাঁদ অস্ত যায়, সেখানে চাঁদ দেখার চেষ্টা করার কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই। এ মতামত দ্বিতীয় আমিরাত জ্যোতির্বিদ সম্মেলনেও অনুমোদিত হয়েছে।
সৌদি আরবের শীর্ষ আলেম পরিষদের সদস্য শেখ আবদুল্লাহ বিন মানি’সহ বহু বিশিষ্ট আলেম দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, এ ধরনের ক্ষেত্রে নিশ্চিত জ্যোতির্বিদ্যাগত জ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সব দিক বিবেচনায় জ্যোতির্বিদদের মতে, বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) থেকেই পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার সম্ভাবনাই সর্বাধিক।
সূত্র: গালফ নিউজ


