in ,

ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের বিক্ষোভে ফাঁকা গুলি, পুলিশসহ আহত ১৫

জুমবাংলা ডেস্ক : রেশন প্রদানে নতুন ও পুরাতন রোহিঙ্গাদের সমান মূল্যায়নে মর্যাদাহানির দাবি তুলে বিক্ষোভের চেষ্টা চালিয়েছে কক্সবাজারের টেকনাফের নয়াপাড়া রেজিস্টার্ড (নিবন্ধিত) ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা। রোববার সকালে তাদের বিক্ষোভের চেষ্টাটি ঠেকিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালায় এপিবিএন সদস্যরা।

এ সময় বিক্ষোভ চেষ্টাকারী রোহিঙ্গাদের বিক্ষিপ্তভাবে ছোড়া ইটপাটকেলে এপিবিএনের ১০-১২ সদস্য আহত হয়েছেন। নিজেদের সম্পদ রক্ষায় ফাঁকা গুলি চালিয়েছে এপিবিএন সদস্যরা। আহত হয়েছেন কয়েক রোহিঙ্গাও। তবে তাদের নাম-পরিচয় বিস্তারিত জানা যায়নি।

২০১৭ সালে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য ইস্যু করা ফুড কার্ড ও পুরনো রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি ফুড কার্ডের ধরন হুবহু হওয়ায় একে মর্যাদাহানি বলে দাবি করে পুরাতন রোহিঙ্গারা রেশন নেয়া বন্ধ রেখেছে। সঙ্গে বিক্ষোভ দেখাতেও চেষ্টা চালায় তারা। ক্যাম্পে দায়িত্বরত ১৬ এপিবিএন অধিনায়ক (এসপি) তারেকুল ইসলাম তারিক এ তথ্য জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, ১৯৯১-৯২ সালে আসা রোহিঙ্গাদের মাঝে কয়েক লাখ প্রত্যাবাসন হয়। কিন্তু হঠাৎ স্থগিত হওয়া প্রত্যাবাসনে প্রায় ৩৪ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আটকা পড়ে। পরে নিবন্ধিত এসব রোহিঙ্গাদের মাঝে ২২ হাজার জনকে টেকনাফের নয়াপাড়া ও বাকি ১২ হাজার জনকে কুতুপালং ক্যাম্প করে রাখা হয়। এরা তখন থেকে ইউএনএইচসিআর-এর তত্ত্বাবধানে জীবন রক্ষাকারী সব সুযোগ সুবিধা পেয়ে আসছে।

কিন্তু ২০১৭ সালে জাতিগত সহিংসতায় নিপীড়নের শিকার হয়ে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিচ্ছিন্নভাবে আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে উখিয়া-টেকনাফ এবং পুরো জেলায় অবস্থান নেয়। সবাইকে নিবন্ধনের আওতায় এনে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে উখিয়া-টেকনাফে ৩৩টি ক্যাম্প করে রাখা হয়েছে। তাদের জীবিকায়নে ইউএনএইচসিআর-এর ফুড কার্ড তৈরি করে। এ কার্ডের বিপরীতে জনপ্রতি ৯শ টাকা ও অন্যান্য আহার্য পণ্য পেয়ে থাকেন।

কিন্তু সম্প্রতি পুরনো নিবন্ধিত রোহিঙ্গারা আবিষ্কার করেন তাদের ও নতুন রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি ফুড কার্ডের রং ও ধরন একই। এটাকে তারা তাদের মর্যাদাহানি বলে মনে করে হুবহু কার্ড নিয়ে জুলাই মাসের রেশন উত্তোলন করেনি নয়াপাড়া রেজিঃ ক্যাম্পে ১৯৯১-৯২ সালে আসা পুরাতন রোহিঙ্গারা।

তাদের মতে, পুরাতন রোহিঙ্গাদের ফুড কার্ড নতুন রোহিঙ্গাদের ফুড কার্ডের চেয়ে রেশনিং ভিন্নতা ছিল। সব রোহিঙ্গাদের মাঝে সমপরিমাণ খাবার বিতরণের জন্য পুরাতন রোহিঙ্গাদের ফুড কার্ড ফেরত নিয়ে গত মাসে নতুন ফুড কার্ড ইস্যু করা হয়।

নতুন ফুড কার্ড অন্যান্য ক্যাম্পের সমসাময়িক (২০১৭ সালে) আগত নতুন রোহিঙ্গাদের ফুড কার্ডের অনুরূপ হওয়ায় নয়াপাড়া রেজিস্টার্ড ক্যাম্পের পুরাতন রোহিঙ্গারা এখনো নতুন ফুড কার্ড গ্রহণ করেনি। এর ফলে গত জুলাই মাসের রেশন উত্তোলন করেনি তারা।

ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ ইসলাম বলেন, নতুন রোহিঙ্গাদের ফুড কার্ড এবং পুরাতন রোহিঙ্গাদের ফুড কার্ড একইরকম হওয়াতে রেজি. ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের সমান মর্যাদাহানি হয়েছে। এটি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

কিন্তু শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন (আরআরআরসি) এবং জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা কর্তৃপক্ষ ফুড কার্ড ইস্যুতে গৃহীত সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে।

একটি সূত্রমতে, ২০১৭ সালে আসা রোহিঙ্গাদের পুরাতনদের সঙ্গে রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে পুরাতন রোহিঙ্গাদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। পুরাতন রোহিঙ্গারা নিজেরা শরণার্থী মর্যাদায় বাংলাদেশে বসবাস করছে মনে করে। তাদের ধারণা ছিল সংখ্যা কম ও দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করায় বাংলাদেশ এদের নাগরিকত্ব দিয়ে রাখতে পারে অথবা তৃতীয় দেশেও পাঠিয়ে দিতে পারে। কেউ কেউ কৌশলে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন তৈরি করেছে। অনেকে বাংলাদেশি পাসপোর্টে বিদেশেও গেছে। এমন সময়ে ২০১৭ সালে নতুন রোহিঙ্গার ঢল নামায় তাদের সেই স্বপ্ন তছনছ হয়ে যায়।

টেকনাফ নয়াপাড়া রেজিস্টার্ড (ক্যাম্প-২৫) ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) উপসচিব মো. আবদুল হান্নান জানান, হয়তো ভুল ধারণা থেকে এমনটি করছে তারা। আমরা এদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি তারা রেশন নেওয়া শুরু করবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।

কক্সবাজার ১৬ এপিবিএন অধিনায়ক (এসপি) তারিকুল ইসলাম তারিক জানান, ফুড কার্ডকে কেন্দ্র করে রোববার ভোর ৫টার দিকে নয়াপাড়া ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে রোহিঙ্গা নারী জড়ো হতে থাকে। এপিবিএন সদস্যরা সর্বোচ্চ ধৈর্যসহ উচ্ছৃঙ্খল রোহিঙ্গা নারীদের শান্ত করার চেষ্টা করে। রোহিঙ্গা নারীরা দফায় দফায় বিভিন্ন স্পটে ইট-পাটকেল মেরে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে।

তিনি জানান, এভাবে দুপুর পর্যন্ত রোহিঙ্গা নারীরা উচ্ছ্বঙ্খলতা করতে থাকে। রোহিঙ্গা নারীরা সংঘবদ্ধ হয়ে অতর্কিতে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল মেরে ধস্তাধস্তি শুরু করে পুলিশের অস্ত্র টানাহেঁচড়া শুরু করলে পুলিশ জানমাল রক্ষায় ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। এতে রোহিঙ্গা নারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। ইট পাটকেলের আঘাতে এপিবিএনের ১০-১২ সদস্য আহত হন।

চলমান পরিস্থিতি নিয়ে সোমবার আরআরআরসি, ইউএনএইচসিআর ও রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা। ক্যাম্প এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নয়াপাড়া এপিবিএন তৎপর রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আয়াছুর রহমান বলেন, পুরাতন রোহিঙ্গারা অনেকে বাংলাদেশ জাতীয় পরিচয় কার্ড তৈরি করেছে। বিভাগের বিভিন্ন জায়গা হতে ভোটার তালিকায় নাম তুলেছে তারা। এখন নতুন ফুড কার্ডগুলো ডিজিটাল হওয়ায় তাদের আঙুলের ছাপ সার্ভারে কোনো কারণে মিলে গেলে বেকায়দায় পড়তে পারে। এমন আশঙ্কা থেকে হয়তো নতুন ফুড কার্ড সংগ্রহে অনীহা প্রকাশ করছে তারা। এ বিষয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ ও তদারকি দরকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।