বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান গতকাল বুধবার দুপুরে বরিশালের ঐতিহাসিক বেলপার্ক ময়দানে স্মরণকালের বৃহৎ জনসভায় বলেছেন, ‘দেশে নতুন জালিমের আবির্ভাব হয়েছে। এরা দেশের নারী সমাজের ইজ্জত দিতে জানে না। তাদের নেতা মা-বোনদের সম্পর্কে অৎযন্ত কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে এখন বলছেন এটা তার বক্তব্য না, হ্যাক হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞগণ যাচাই করে দেখেছেন, কোনো হ্যাক হয়নি।’ জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও আহতদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘এ লক্ষ্যে ১২ তারিখে আমাদের সকাল-সন্ধ্যা সতর্ক থাকতে হবে। আমরা বিভিন্ন জায়গায় খবর পাচ্ছি জাল ব্যালট পেপার ছাপা হচ্ছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিকাশ নম্বর চাওয়া হচ্ছে।’ একটি দলের কর্মী-সমর্থকগণ জাল ব্যালট পেপার পকেটে করে নিয়ে তা বাক্সে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে তারেক রহমান এসব ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকারও পরামর্শ দেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের নবিজির (স.) স্ৎরী বিবি খাদিজা (রা.) কর্মজীবী নারী ছিলেন। সেই নারীদের ঘরবন্দি করে রাখার কথা বলছেন একদল। কিন্তু মা-বোনদের ঘরবন্দি করে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, কুমিল্লায় তাদের আরেক নেতা দলীয় কর্মীদের বলেছেন, ‘১২ তারিখ পর্যন্ত জনগণের পা ধরবেন, ১২ তারিখের পরে জনগণ আপনাদের পা ধরবে।’ জনতার সামনে তারেক রহমান প্রশ্ন করেন, এরা কীভাবে দেশ চালাবে? এদের থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আমার দলের সবাইকে বলছি, আগামী ১৩ তারিখ থেকে আপনারা জনগণের পা ধরবেন। কারণ আমরা মনে করি জনগণই সব ক্ষমতার উৎস।’
তারেক রহমান বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে স্বৈরাচারী যেভাবে দেশের মানুষকে অপমান করত, সে ধারা বন্ধ হয়নি। আমরা দুঃখের সঙ্গে খেয়াল করলাম—একটি দল, যাদের জনগণ ভিন্ন নামে চেনে। সেই গুপ্ত সংগঠন নতুন জালিম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।’ তিনি বলেন, যে দলের নেতা দেশের মা-বোনদের অপমান করে, তাদের কষ্ট দেয়, তারা দেশ চালাবে কীভাবে।
দীর্ঘ দুই দশক পরে বরিশাল সফরকালে এ জনসভায় তারেক রহমান আরো বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবে শহিদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা দেশ গড়তে চাই। আমাদের সেই দেশ গড়তে হবে, যে দেশে নারী-পুরুষ মিলে একসঙ্গে কাজ করবে। আমরা ফ্যামেলি কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের আর্থসামাজিক নিরাপৎতা নিশ্চিত করব। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সমুদয় কৃষিঋণ মওকুফ করব। কৃষিকার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের জীবনমানের নিশ্চয়তা দেব। তারা সঠিক দামে সার পাবে, বীজ পাবে। তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে আমরা বিভিন্ন এলাকায় হিমাগার করব।’
‘ভোলা-বরিশাল সেতু করা হবে’: বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘নির্বাচিত হলে আমাদের ভোলাকে বরিশালের সঙ্গে সংযুক্ত করতে সেতু করতে হবে, ভোলার গ্যাস দিয়ে সেখানে শিল্পকারখানা স্থাপনসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পকারখানা স্থাপন করতে হবে।’ ভোলায় মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনসহ বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের উন্নয়ন করার কথাও বলেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, নদী ভাঙনে এ অঞ্চলের বহু ফসলি জমিসহ বিশাল জনপদ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তা রোধ করার কথাও জানান তিনি। এছাড়া ‘হেলথ কেয়ারার’ নিযুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। বক্তব্য শেষে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ আসনের নিজদলসহ জোটের সব প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেন তারেক রহমান।
বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মুনিরুজ্জামান ফারুকের সভাপতিৎবে জনসভায় আরো বক্তৃতা করেন ভোলা-৩ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, পটুয়াখালী-১ আসনের প্রার্থী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বরিশাল-৫ (সদর) আসনের প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার, বরিশাল-১ আসনের প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপন, বিজেপি চেয়ারম্যান ভোলা-১ আসনের গরুর গাড়ি প্রতীকের প্রার্থী ব্যারিস্ট্রার আন্দালিব রহমান পার্থ, পটুয়াখালী-৩ আসনের ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী নুরুল হক নুর, ঝালকাঠী-২ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী ইসরাত জাহান ইলেন ভুট্টো, বরিশাল-৪ আসনের প্রার্থী রাজিব আহসান, বরিশাল-৬ আসনের প্রার্থী আবুল হোসেন খান, বরগুনা-২ আসনের প্রার্থী নূরুল ইসলাম মনি, পিরোজপুর-২ আসনের প্রার্থী আহমেদ সোহেল মঞ্জুর, বরিশাল-৩ আসনের প্রার্থী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, পটুয়াখালী-১ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন প্রমুখ।
‘ফরিদপুর বিভাগ করার দাবি পূরণ করা হবে’: বরিশালের পর ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে বিএনপির ফরিদপুর সাংগঠনিক বিভাগ আয়োজিত নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণের সমর্থন পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে ফরিদপুর বিভাগ করার দাবি পূরণ করা হবে। আপনাদের দায়িৎব ধানের শীষে ভোট দেবেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আমাদের দায়িৎব জনগণের জন্য কাজ করা।’ তিনি বলেন, ‘এই বৃহৎতর ফরিদপুরের অন্যতম সমস্যা নদীভাঙন। আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি স্থায়ীভাবে নদীভাঙন প্রতিরোধ করা হবে। এই এলাকায় বহু শিক্ষিত যুবক রয়েছে কিন্তু কর্মসংস্থান নেই। মানুষের কথা চিন্তা করে এখানে প্রয়োজনীয় শিল্পকারখানা করা হবে, যাতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়।’
‘পদ্মা নদী ঘিরে ব্যারেজ করতে চাই’: তারেক রহমান বলেন, পদ্ম নদী ঘিরে ব্যারেজ করতে চাই। যাতে এই অঞ্চলের কৃষকদের চাষাবাদে কোনো পানির সমস্যা না থাকে। জনগণের সমর্থন ছাড়া কোনো বড় কাজ করা সম্ভব না। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে দেশকে স্বাধীন করেছেন। ২৪ সালের ৫ আগষ্ট ছাৎর-জনতা রাজপথে আন্দোলন করে ৭১-এর সেই স্বাধীনতা রক্ষা করেছে। এই যে মানুষের ভোটের অধিকার, কথা বলার অধিকার—আমাদের সমুন্নত রাখতে হবে।’ বিএনপি প্রধান বলেন, ‘এই যে জনগণের স্বাধীনতা, ভোটের অধিকার, কথা বলার অধিকার, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ৎর শুরু হয়ে গেছে। সেই ষড়যন্ৎরকারীদের জনগণ গুপ্ত নামে ডাকে। তারা বিভিন্ন সময় রূপের পরিবর্তন করে। তারা জনগণকে অপমান করে। এই গুপ্তের দলের প্রধান অৎযন্ত আপৎতিকর কথা বলেছেন বাংলাদেশের খেটে খাওয়া মা-বোনদের নিয়ে। অবশ্য তাদের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না। এই গুপ্তরা মা-বোনদের কাছ থেকে বিকাশ নাম্বার ও এনআইডি কার্ড চাইছে। তাদের কাজ শুরু করছেন অনৈতিকভাবে। তাহলে কীভাবে তারা সৎ মানুষের শাসন দেবেন বলেন।’
ফরিদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদারেরছ আলী ইছার সভাপতিৎবে জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলাম, কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল, বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিম, মহিলা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদ প্রমুখ। সভার শুরুতে তারেক রহমান মঞ্চে উঠে বৃহৎতর ফরিদপুরের ১৫টি সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। বক্তব্য প্রদান শেষে ফরিদপুর স্টেডিয়াম থেকে তিনি হেলিকপটারে করে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


