নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর: ভোরের ঘন কুয়াশা কাটতে না কাটতেই একের পর এক নৌকা ভিড়ছে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে। নৌকার পেটে বোঝাই দেশি আলু, টমেটো, শিম, মিষ্টিকুমড়া, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মুলা। নদীর শান্ত জল ছুঁয়ে বরমী বাজার ঘাটে পৌঁছাতেই শুরু হয় ব্যস্ততা-নৌকা থেকে নামানো হচ্ছে টাটকা শাকসবজি, আর পাইকারেরা দরদাম করতে করতে ভিড় জমাচ্ছেন আড়তের সামনে। বুধবার (৭ জানুয়ারি) সকালে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী বাজারে গিয়ে চোখে পড়ে এই চিরচেনা কিন্তু প্রাণবন্ত দৃশ্য।
প্রায় ৪৫০ বছরের পুরোনো বরমী বাজারে সপ্তাহের প্রতি বুধবার বসে বিশাল শাকসবজির হাট। শীতলক্ষ্যা নদীঘেঁষা এই বাজার শুধু স্থানীয়দের নয়, আশপাশের উপজেলা ও জেলার কৃষকদেরও ভরসার জায়গা। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকেরা নৌকা কিংবা অন্য উপায়ে তাঁদের উৎপাদিত শাকসবজি নিয়ে হাজির হন হাটে। সকাল ৭টা থেকে ৯টার মধ্যেই মূল বেচাকেনা শেষ হয়ে যায়।
আড়তদারেরা জানান, প্রতি হাটের দিনে এখানে কয়েক লাখ টাকার শাকসবজি কেনাবেচা হয়। শুধু বুধবারই নয়, সপ্তাহের অন্যান্য দিনেও নদীর তীরে চলে শাকসবজির লেনদেন।
এই বাজারের বড় একটি বৈশিষ্ট্য হলো-এখানে শাকসবজি বিক্রি করতে কৃষকদের কোনো ধরনের খাজনা বা অতিরিক্ত টাকা দিতে হয় না। এতে সরাসরি লাভবান হচ্ছেন উৎপাদক কৃষকেরা।
পার্শ্ববর্তী গফরগাঁও উপজেলার কৃষক ইয়াসিন বলেন, নিজের জমির আলু আর টমেটো নিয়ে প্রতি বছরই এখানে আসি। এবার শাকসবজির দাম ভালো পাচ্ছি। তবে ঘন কুয়াশা আর তীব্র শীতের কারণে ফলন কিছুটা কম। এই মৌসুমে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ টাকার শাকসবজি বিক্রি করেছি।
একই কথা বলেন কৃষক মোফাজ্জল হোসেন। তিনি জানান, শীতলক্ষ্যার তীরে বাজার বসায় আমাদের অনেক সুবিধা। বাড়ির কাছের ঘাট থেকেই নৌকায় করে শাকসবজি নিয়ে আসি। কোনো খাজনা নেই, ঝামেলাও কম। পাইকারেরা নিজেরাই এসে দামদর করে নিয়ে যায়।
বরমীর শাকসবজির আরেকটি বড় পরিচয়—টাটকাভাব ও নিরাপদ চাষ। কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন, আমাদের জমিতে ক্ষতিকারক কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না। আমরা জৈব সার ব্যবহার করি। তাই শাকসবজি টাটকা ও নিরাপদ।
শীতলক্ষ্যার তীরে আড়ত বসিয়েছেন আব্দুল কাদির। তিনি বলেন, বুধবার সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হয়। সকাল দুই ঘণ্টার মধ্যেই কয়েক লাখ টাকার শাকসবজি বিক্রি হয়ে যায়। নদীর তীরে বাজার হওয়ায় মাল ওঠানামা সহজ। এখানকার শাকসবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে।

বাজারের ইজারাদার আব্দুল মতিন জানান, বিশেষ করে শীত মৌসুমে প্রায় দুই মাস নদীর তীরে বিনা খাজনায় শাকসবজি বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়। এতে কৃষকেরা সরাসরি লাভবান হন। এবারও সেই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বরমীর খ্যাতি শুধু কৃষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার পাইকারেরা নিয়মিত এখানে আসেন। জৈনা বাজার থেকে আসা এক পাইকার বলেন, টাটকা শাকসবজি কিনতে প্রতি বুধবার বরমী বাজারে আসি। এখানের আলু, টমেটো, শিম খুব ভালো মানের। দাম তুলনামূলক কম, স্বাদও ভালো। তাই এখান থেকে কিনে ঢাকায় বিক্রি করি।
কুয়াশা, নদী আর নৌকার এই সম্মিলনেই বরমী বাজারের আলাদা সৌন্দর্য। শতাব্দীপ্রাচীন এই হাট আজও প্রমাণ করে-নদীকে ঘিরে কৃষক, পাইকার আর ভোক্তার সম্পর্ক কতটা জীবন্ত ও অর্থবহ হতে পারে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


