এখনও শুরু হয়নি বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর। কিন্তু মাগুরার একটি মাঠে যেন আগেভাগেই শুরু হয়ে গেছে বিশ্বকাপের উন্মাদনা। চারদিকে জার্মানির কালো, লাল ও হলুদ রঙের পতাকা। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে আনন্দ মিছিল। হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাস আর উৎসবমুখর পরিবেশ। এই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে একজন মানুষ। তিনি মাগুরা পৌর এলাকার তিন নং ওয়ার্ডের ঘোড়ামারা গ্রামের কৃষক আমজাদ হোসেন। বয়স ৭৪ পেরিয়েছে। কিন্তু জার্মানির প্রতি তার ভালোবাসা আজও তরুণদের মতোই উচ্ছ্বসিত।

বুধবার (১০ জুন) সকালে মাগুরা শহরতলীর নিশ্চিন্তপুর স্কুল মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদর্শন করা হয় তার তৈরি সাড়ে ৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের জার্মান পতাকা। ব্যতিক্রমী এই পতাকা দেখতে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, ঢাকা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ছুটে আসেন জার্মান ফুটবল দলের সমর্থকরা। স্থানীয় কয়েক হাজার নারী-পুরুষও মাঠজুড়ে ভিড় করেন।
দীর্ঘ এই পতাকা মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে সৃষ্টি হয় বিস্ময় ও উচ্ছ্বাস। অনেকে মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। কেউ কেউ পতাকার পাশে দাঁড়িয়ে স্মৃতি ধরে রাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে এই বিশাল পতাকার পেছনের গল্প শুধু ফুটবলপ্রেমের নয়। এটি এক কৃষকের কৃতজ্ঞতা, ত্যাগ ও অদম্য আবেগের গল্প।
কৃষক আমজাদ হোসেন জানান, ২০০৫ সালের দিকে তিনি একটি জটিল রোগে আক্রান্ত হন। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি। পরে জার্মানির তৈরি একটি ওষুধ সেবন করে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। সেই থেকে জার্মানির প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জন্ম নেয়।
আমজাদ হোসেন আরও জানান, আমি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। জার্মানির ওষুধ খেয়ে সুস্থ হওয়ার পর থেকেই দেশটার প্রতি অন্যরকম একটা ভালোবাসা তৈরি হয়। সেই ভালোবাসা থেকেই জার্মান ফুটবল দলের সমর্থক হয়ে যাই। এরপর সিদ্ধান্ত নিই, বিশ্বকাপ এলেই জার্মানির জন্য কিছু একটা করব।
সেই সিদ্ধান্তের বাস্তব রূপ দেখা যায় ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে। ওই সময় তিনি প্রথম দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মান পতাকা তৈরি করেন। এরপর প্রতি বিশ্বকাপেই পতাকার দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে। ২০১০ সালে আড়াই কিলোমিটার, ২০১৪ সালে সাড়ে তিন কিলোমিটার, ২০১৮ সালে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার এবং সর্বশেষ সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা তৈরি করে নিজের আগের সব রেকর্ড ভেঙেছেন তিনি।
তবে এই স্বপ্ন পূরণে তাকে দিতে হয়েছে বড় মূল্যও। আমজাদ জানান, সর্বশেষ পতাকাটি তৈরির জন্য তাকে নিজের ৩০ শতক কৃষি জমি বেচে দিতে হয়েছে। পতাকা তৈরি, সেলাই ও প্রদর্শনের পেছনে ব্যয় হয়েছে কয়েক লাখ টাকা। কিন্তু ভালোবাসার কাছে এসব হিসাব কখনো বড় হয়ে ওঠেনি। তিনি বলেন, অনেকে আমাকে পাগল বলে। আবার অনেকে বলে এত টাকা খরচ করার কী দরকার। কিন্তু এটা আমার ভালোবাসা। কেউ শখ করে বাড়ি বানায়, কেউ গাড়ি কেনে। আমি পতাকা বানাই। এই পতাকা আমার কাছে অনেক আবেগের।
স্থানীয়রা জানায়, বিশ্বকাপ এলেই আমজাদের বাড়ি যেন ফুটবলপ্রেমীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। জার্মানির খেলার দিনগুলোতে সেখানে উৎসবের পরিবেশ বিরাজ করে।
আমজাদের এ ব্যতিক্রমী উদ্যোগের খবর বহু আগেই পৌঁছে গেছে জার্মান দূতাবাসে। তার অসাধারণ ফুটবলপ্রেম ও জার্মানির প্রতি ভালোবাসার স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত তাকে ‘জার্মান ফ্যান ক্লাব’-এর অফিসিয়াল সদস্যপদ প্রদান করেন। এছাড়াও তিনি পেয়েছেন জার্সি, সম্মাননা ও বিভিন্ন স্বীকৃতি।
বিশাল পতাকার পাশে দাঁড়িয়ে আবেগঘন কণ্ঠে আমজাদ জানান, আমার একটা স্বপ্ন আছে। আমি মারা যাওয়ার পর এই পতাকাটা যদি জার্মানির কোনো জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে আমার কষ্ট সার্থক হবে। তখন মানুষ জানবে, বাংলাদেশের এক কৃষক জার্মানিকে কতটা ভালোবাসত।
মাগুরার ঘোড়ামারা গ্রামের এই সাধারণ কৃষকের গল্প আজ আর শুধু একটি গ্রামের গল্প নয়। এটি সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়া এক অসাধারণ ভালোবাসার গল্প। যে ভালোবাসার জন্য একজন মানুষ নিজের জমি বিক্রি করতেও দ্বিধা করেননি, কিন্তু ছাড়েননি নিজের স্বপ্ন।
বিশ্বকাপের উন্মাদনা যতবার ফিরে আসে, ততবারই নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে আমজাদ হোসেনের নাম। আর তার হাতে তৈরি বিশাল জার্মান পতাকা হয়ে ওঠে ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও আবেগের এক অনন্য প্রতীক।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



