in , ,

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বাথুলী স্কেলে রমরমা চাঁদাবাজি


সাইফুল ইসলাম, মানিকগঞ্জ : দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১জেলা থেকে রাজধানীর প্রবেশপথ ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক। দেশের পঞ্চম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কটির সংস্কারে প্রতিবছর ব্যয় করা হয় কোটি কোটি টাকা। সংস্কারের কিছুদিন যেতে না যেতেই মহাসড়কে সৃষ্টি হয় খানাখন্দ। মাত্রাতিরিক্ত ভারী যান চলাচলের কারণেও টেকসই হচ্ছে না মহাসড়ক। মহাসড়ক রক্ষায় মাত্রাতিরিক্ত ওজন নিয়ে যানবাহন চলাচল রোধে ধামরাইয়ের বাথুুলী এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে ওজন স্কেল। তবে এতে মহাসড়ক রক্ষা না হলেও ওজন স্কেলে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের চাঁদাবাজির মাধ্যমে ভারী হচ্ছে দুর্নীতিবাজদের পকেট। শুধু পরীক্ষামূলকভাবে ওজন মেপে অতিরিক্ত ওজন বহনকারী গাড়ি চালকদের সতর্ক করার কথা থাকলেও তাদের সতর্ক না করে কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজির মহোৎসব।

জানা গেছে, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজারের বেশি গাড়ি চলাচল করে। এর মধ্যে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করে প্রায় এক হাজার। পণ্যবাহী ট্রাকের বড় একটি অংশ নির্ধারিত ওজনের চেয়ে অতিরিক্ত পণ্য নিয়ে এই মহাসড়কে চলাচল করে। এসব গাড়ি পাটুরিয়া ও আরিচা ফেরিঘাট দিয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলায় বিভিন্ন পণ্য আনা নেওয়া করে। এসব যানবাহনে অতিরিক্ত পণ্য আনা নেওয়া নিয়ন্ত্রণে সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর ধামরাইয়ের বাথুলী এলাকায় ওজন পরিমাপক যন্ত্র বসিয়েছে। মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপদ বিভাগ এই স্কেলের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। সড়ক ও জনপদের বেঁধে দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ৬ চাকার যান ২২ টন, ১০ চাকার যান ৩০ টন, ১৪ চাকার যান ৪০ টন, ১৮ চাকার যান ৪৭ টন, ২২ চাকার যান ৪৯ টন ও ২৬ চাকার যান ৫২ টন ওজন বহন করতে পারবে। নির্ধারিত ওজন সীমার অতিরিক্ত ওজন বহনকরী যানবাহনকে ১ টন বা ভগ্নাংশের জন্য ৫ হাজার এবং পরবর্তী প্রতি টন বা এর ভগ্নাংশের জন্য ১০ হাজার টাকা হারে জরিমানা প্রদান করতে হবে। ওজন স্কেলের সামনে জরিমানার হার সম্বলিত সাইনবোর্ড বড় করে টানানো থাকলেও কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে জরিমানা আদায় বন্ধ রয়েছে। তবে জরিমানা আদায় বন্ধের নির্দেশনা সংক্রান্ত কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেনি সড়ক ও জনপদ বা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান রেঘনা রিসোর্স। স্কেল দিয়ে পার হওয়া পণ্যবাহী গাড়ির ড্রাইভাররা জানান, যদি মালামালের পরিমাণ একটু বেশি থাকে তাহলে গুনতে হয় টাকা। টাকা না দিলেই সারারাত রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখে স্কেলের লোকজন। স্কেলের লোকজন গাড়ি চালকদের কাছ থেকে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা চাঁদাবাজি করে। ট্রাক চালকরা আরো জানান, কিছু কিছু গাড়ির মালিকরা মাসিক চুক্তিতে স্কেলের লোকজনকে টাকা দিয়ে থাকেন। তাদের জন্য অতি নিরাপদ এই স্কেল।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ওজন স্কেলকে কাজে লাগিয়ে মহাসড়ককে চাঁদাবাজির মাধ্যমে পকেট ভারি করছে শক্তিশালী একটি চক্র। ভারী যানবাহন দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের লোকজন। মূলত স্কেল পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান রেঘনা রিসোর্সের পরিচালক কামরুল হাসানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠান কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সরকারদলীয় স্থানীয় কিছু নেতাকর্মীরা এই চক্রের সদস্য। মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের কিছু কর্মকর্তার পকেটেও যায় এ টাকার ভাগ।

রাজবাড়ী পাংশা থেকে ঢাকাগামী পণ্যবাহী ৬ চাকার ট্রাক ড্রাইভার অমর আলী বলেন, আমার গাড়িতে ৫৬০ কেজি মাল বেশি হয়েছিল। স্কেলের লোক আমার কাছে ১ হাজার টাকা দাবি করেন। আমার ছেলের দুটি কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। আমার টাকার খুব প্রয়োজন। তাই তাদের হাতে পায়ে ধরে পাঁচশত টাকা দিয়ে এসেছি, টাকা না দিলে সারারাত এখানেই থাকতে হবে।

সাতক্ষীরা থেকে রাজধানীগামী ছয় চাকার ট্রাক ড্রাইভার রফি বলেন, আমাদের গাড়ির মালিকের সাথে মাস হিসেবে মিটানো আছে। তাই আমাদের গাড়ি দেখলেই ছেড়ে দেয়, আটকায় না।

ফরিদপুর থেকে আসা কামাল হোসেন নামের আরেক ট্রাক চালক বলেন, নির্ধারিত ওজনের চেয়ে অতিরিক্ত ওজন এক টনের মধ্যে হলে এক হাজার টাকা আর এর বেশি হলে ২০০০ টাকা দিতে হয়। না দিলে স্কেল কর্তৃপক্ষ গাড়ির কাগজ নিয়ে যায়। এরপর সারারাত এখানেই থাকতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে চলে যাই। তবে অনেক গাড়ির সাথে মাসিক হিসেবে চুক্তি করা থাকে। এখানে টাকা ছাড়া কোন কথা হয়না।

এ ব্যাপারে স্কেলের ঠিকাদীর প্রতিষ্ঠান রেঘনা রিসোর্সের স্টেশন ম্যানেজার কামরুল হাসান বলেন, অনেকে তো অনেক কথাই বলে। আমরা কোন টাকা নেইনা। কর্তৃপক্ষের দেওয়া নীতিমালা মেনেই এখানে কাজ করা হয়। আপনারা সরেজমিনে অনুসন্ধান করে দেখেন। আপনারা মনগড়া বললেই তো আর হবেনা।

এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ গাউস-উল হাসান মারুফ বলেন, স্কেলে এখন ট্রায়াল অপারেশন চলছে। বর্তমানে জরিমানা আদায় বন্ধ রয়েছে। তবে কেউ যদি নির্দেশনা অমান্য করে টাকা আদায় করে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।