রমজান মাস রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এক অপূর্ব ঋতু। এ মাসে দিনের রোজা যেমন ফরজ ইবাদত, তেমনি রাতের নফল ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তারাবিহ নামাজ। মসজিদভিত্তিক সম্মিলিত তারাবিহ মুসলিম সমাজে এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি করে—কুরআনের সুর, কিয়ামের দীর্ঘ সময়, দোয়া ও অশ্রুসিক্ত মন—সব মিলিয়ে এটি ঈমান জাগ্রত করার এক বিশেষ সুযোগ। এ মাসের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত হলো তারাবিহ নামাজ। রমজান মাসে বিভিন্ন মসজিদে মহল্লায় তারাবিহ নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

পরিলক্ষিত হয় যে, যে মসজিদে তারাবিহ নামাজ তাড়াতাড়ি হয়, অনেক মুসল্লি সে মসজিদ খুঁজে বের করে সেখানে গিয়েই নামাজ আদায় করে। অথচ তারাবিহ নামাজ ধীরস্থিরভাবে আদায় করাই নিয়ম। প্রতিযোগিতা করে তারাবিহ নামাজ আদায় করা সুন্নাতি নিয়মের পরিপন্থি। তাই আসুন, তারাবিহ নামাজ তাড়াতাড়ি না ধীরস্থির হবে—তা জেনে নিই।
তারাবিহ
‘তারাবিহ’ শব্দের অর্থ বিশ্রাম করা। প্রতি চার রাকাআত নামাজ শেষ করে সামান্য বিশ্রাম গ্রহণ করা হয় বলেই এ নামকরণ। অর্থাৎ নামাজের মধ্যেই ধীরতা ও প্রশান্তির শিক্ষা নিহিত রয়েছে। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর তারাবিহ ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ। তাঁর কিয়াম, রুকু ও সিজদা ছিল দীর্ঘ ও ধীরস্থির। এ মর্মে হজরত সাঈব (বা সাঈর) ইবনে ইয়াযিদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসটি নিম্নরূপ—
كَانُوا يَقْرَءُونَ فِي زَمَانِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فِي رَمَضَانَ بِالْمِائَتَيْنِ، وَكَانُوا يَعْتَمِدُونَ عَلَى عِصِيِّهِمْ مِنْ طُولِ الْقِيَامِ
‘হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর যুগে (ইমামেরা) রমজানে দুইশত আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করতেন। দীর্ঘ সময় কিয়াম করার কারণে আমরা লাঠির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম।’ (মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ, মুয়াত্তা ইমাম মালিক)
রোজা ফরজ হওয়ার ঘোষণাসহ যা পড়া হবে প্রথম তারাবিহতে
এই বর্ণনায় সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তারাবিহের কথা নয়; বরং খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে সাহাবায়ে কেরামের আমলের বিবরণ এসেছে। তবে এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, তারাবিহ নামাজ ছিল দীর্ঘ কিয়াম ও অধিক তিলাওয়াতসমৃদ্ধ এবং তা ধীরস্থিরভাবে আদায় করা হতো।
তারাবিহ নামাজ পড়ার নিয়ম
রমজানে প্রতিদিন এশার ফরজ নামাজ পড়ার পরে বিতিরের আগে তারাবিহ নামাজ পড়তে হয়। তারাবি নামাজ দুই দুই রাকাত করে পড়তে হয়। প্রত্যেক দুই রাকাতের পর সালাম ফেরানো হয়। এভাবে চার রাকাত পড়ার পরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম ও দোয়া ইসতেগফার পড়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন তাসবিহও পড়া উত্তম।
তারাবিহ নামাজে তাড়াহুড়া নয়
তারাবিহ নামাজে ইমাম হোক বা মুসল্লি— প্রতিযোগিতামূলক দ্রুততার প্রবণতা পরিহার করা উচিত। কারণ যত দ্রুতই নামাজ পড়ার চেষ্টা করা হোক না কেন, বাস্তবে সময়ের ব্যবধান খুব বেশি কমে না। বরং তাড়াহুড়া করলে খুশু-খুজু, তিলাওয়াতের সৌন্দর্য ও ইবাদতের গভীরতা নষ্ট হয়।
সুতরাং সামান্য সময় বাঁচানোর জন্য তারাবিহ নামাজের সৌন্দর্য বিনষ্ট না করে অধিক সওয়াবের আশায় ধীর ও স্থিরভাবে তারাবিহ আদায় করাই উত্তম।
তারাবিহ নামাজ রমজানের রাতগুলোকে আলোকিত করে। এটি কুরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং অন্তরকে নরম করে। তাড়াহুড়া নয়, বরং ধৈর্য, মনোযোগ ও আন্তরিকতার সঙ্গে তারাবিহ আদায় করাই সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। আসুন, আমরা তারাবিহকে শুধু রাকাআতের সংখ্যা দিয়ে নয়—খুশু, তিলাওয়াতের গভীরতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মানদণ্ডে পরিমাপ করি। তখনই রমজানের রাতগুলো আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ রাত হয়ে উঠবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


