তারাবির নামাজ হলো এক বিশেষ নফল ইবাদত যা শুধুমাত্র রমজান মাসে আদায় করা হয়। এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, অর্থাৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত, যা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজে পালন করেছেন এবং সাহাবাদেরও তা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। এই নামাজের মাধ্যমে মুসলমানরা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করতে পারেন এবং অতীতের গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
তারাবির নামাজের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
বিষয় | বিস্তারিত |
---|---|
শ্রেণী | নফল (কিন্তু সুন্নতে মুয়াক্কাদা) |
পঠিত হয় | শুধুমাত্র রমজান মাসে |
সময় | এশার ফরজ ও সুন্নত নামাজের পর থেকে ফজরের আগ পর্যন্ত |
রাকাত সংখ্যা | ২০ রাকাত (কিছু ক্ষেত্রে ৮ রাকাতও পড়া হয়) |
পদ্ধতি | ২ রাকাত করে সালাম ফিরিয়ে পড়া হয় |
ফজিলত | অতীতের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়, আত্মিক শুদ্ধতা লাভ হয় |
বিশেষ আমল | অনেক মসজিদে তারাবিতে কুরআন খতম করা হয় |
তারাবির নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত
তারাবির নামাজ সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন:
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়াম (তারাবি) করে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০১৪)
এটি এক বিশেষ ইবাদত যা মুসলমানদের আত্মিক ও শারীরিক প্রশান্তি এনে দেয় এবং আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম।
তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা
তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে দুই ধরনের অভ্যাস দেখা যায়:
১. ২০ রাকাত (সর্বাধিক প্রচলিত)
- ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই অধিকাংশ মুসলমান ২০ রাকাত তারাবি আদায় করে আসছেন।
- হজরত ওমর (রা.) যখন খলিফা ছিলেন, তখন তিনি ২০ রাকাত তারাবির জামাত চালু করেন। (সুনানে বাইহাকি, হাদিস: ৪৩৯৪)
২. ৮ রাকাত (বিকল্প অভ্যাস)
- কিছু মুসলিম আলেমের মতে, মহানবী (সা.) নিজে ৮ রাকাত পড়েছেন, তাই ৮ রাকাত তারাবিও জায়েজ।
- তবে অধিকাংশ ফকিহ ও ইসলামী স্কলার ২০ রাকাত পড়ার পক্ষেই মত দিয়েছেন।
✦ যে কেউ তার সামর্থ্য অনুযায়ী ৮, ১২, বা ২০ রাকাত পড়তে পারেন। তবে বেশি রাকাত পড়লে বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে।
তারাবির নামাজের নিয়ম ও পদ্ধতি
১. নিয়ত (ইচ্ছা প্রকাশ করা)
তারাবির নামাজ শুরু করার আগে মনে মনে নিয়ত করতে হবে:
“আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ২ রাকাত তারাবির নামাজ আদায় করছি, মুখ তাকবির দিলাম, আল্লাহু আকবার।”
২. নামাজ আদায়ের পদ্ধতি
প্রথম ২ রাকাত নামাজ পড়া:
- তাকবির দিয়ে নামাজ শুরু করুন।
- সানা, তাউজ, তাসমিয়া, সূরা ফাতিহা এবং অন্য কোনো সূরা মিলিয়ে পড়ুন।
- রুকু, সিজদা সম্পন্ন করে ২ রাকাত শেষ করুন।
- সালাম ফিরিয়ে দিন।
এইভাবে প্রতি ২ রাকাত করে সালাম ফিরিয়ে তারাবির নামাজ সম্পন্ন করুন।
৪ রাকাত পর পর কিছু সময় বিরতি (বিশ্রাম) নেওয়া হয়, এটিকে তারাবাহ বলা হয়।
২০ রাকাত শেষ করার পর উত্তরাধিকারসূত্রে বিতর নামাজ আদায় করা হয়।
তারাবির নামাজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য
✔ তারাবির নামাজে কুরআন খতম:
- অনেক মসজিদে পুরো রমজান মাসে কুরআন ৩০ ভাগে ভাগ করে তিলাওয়াত করা হয়।
- প্রতিদিন ১ পারা করে পড়লে রমজান মাসে পুরো কুরআন খতম করা যায়।
✔ গুণাহ মাফের সুযোগ:
- যারা সত্যিকারের একাগ্রতা ও ঈমানের সাথে তারাবির নামাজ পড়েন, আল্লাহ তাদের অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেন।
✔ রাতে আল্লাহর ইবাদত:
- তারাবি এমন একটি বিশেষ ইবাদত যা রাতের গভীরে আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ দেয়।
✔ শারীরিক উপকারিতা:
- দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার ফলে শরীর সুস্থ থাকে এবং মানসিক প্রশান্তি আসে।
নারীদের জন্য তারাবির নামাজ
নারীরা চাইলে নিজ ঘরেই তারাবির নামাজ আদায় করতে পারেন। যদি মসজিদে গমন করতে চান, তবে তাদের জন্য পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।
✔ নারীরা তারাবির নামাজে ২০ রাকাত বা ৮ রাকাত আদায় করতে পারেন।
✔ তারা চাইলে কুরআন তিলাওয়াত করে তারাবির নামাজ পড়তে পারেন।
তারাবির নামাজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ও আদব
- একাগ্রচিত্তে নামাজ পড়া – খুশু ও খুযুর সাথে ইবাদত করা।
- দ্রুত নামাজ শেষ করার জন্য অতিরিক্ত সংক্ষিপ্ত সূরা না পড়া।
- কুরআন শ্রবণ করা এবং অনুধাবন করা।
- নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে দোয়া করা।
তারাবির নামাজের দোয়া (সাধারণত ৪ রাকাত পর বলা হয়)
سُبْحَانَ ذِى الْمُلْكِ وَالْمَلَكُوتِ، سُبْحَانَ ذِى الْعِزَّةِ وَالْجَبَرُوتِ، سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْحَىِّ الَّذِى لَا يَنَامُ وَلَا يَمُوتُ، سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ، رَبُّنَا وَرَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ
উচ্চারণ:
“সুবহানাজি’ল-মুলকি ওয়াল-মালাকুত, সুবহানাজি’ল-ইজ্জাতি ওয়াল-জাবারুত, সুবহানাল মালিকিল-হাইয়িল্লাযি লা ইয়ানামু ওয়ালা ইয়ামুত। সুব্বুহুন কুদ্দুসুন, রব্বুনা ওয়া রব্বুল মালাইকাতি ওয়ার-রূহ।”
বাংলা অর্থ:
“সকল গৌরব সেই সত্তার যিনি রাজত্ব ও শক্তির অধিকারী, যিনি পরাক্রমশালী এবং মহিমাময়। সকল পবিত্রতা সেই মহান বাদশাহর যিনি চিরঞ্জীব, যিনি ঘুমান না ও মৃত্যুবরণ করেন না। তিনি অতি পবিত্র, মহাপবিত্র, আমাদের প্রতিপালক, ফিরিশতাদের এবং রুহের প্রতিপালক।”
শেষ কথা
তারাবির নামাজ মুসলিমদের জন্য একটি মহা নেয়ামত। যারা এই নামাজ যথাযথভাবে আদায় করেন, তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেন এবং রমজানের বরকত থেকে উপকৃত হন। এটি আত্মশুদ্ধি, গুনাহ মাফ, ও দেহ-মন প্রশান্তির অন্যতম মাধ্যম।
🌙 আল্লাহ আমাদের সবাইকে তারাবির নামাজ পড়ার তৌফিক দান করুন! আমিন! 🤲
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।