পে-স্কেল

Advertisement
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে কমিশনের প্রস্তাব মতো পে-স্কেল বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি কর্মচারীদের জন্য পে-স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়নের বিষয় নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। এক গ্রুপ সরকারের এই সিদ্ধান্তে সায় দিলেও আরেকটি গ্রুপ বলছে ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, পে স্কেল পুরোটাই এক ধাপে বাস্তবায়নের গেজেট প্রকাশ করতে হবে। এটি করা না হলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে সুবিধার চেয়ে সরকারি চাকুরেদের অসুবিধাই বেশি হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিসভা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সরকার আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেল (নবম পে স্কেল) বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়াটি তিন ধাপে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রথম ধাপে (২০২৬-২৭ অর্থবছর) নতুন বেতন কাঠামোর অধীন বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে (২০২৭-২৮ অর্থবছর) মূল বেতনের বাকি ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে। তৃতীয় ধাপ—সব শেষে মূল বেতনের সঙ্গে বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পুরোপুরি সমন্বয় করা হবে।

প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে—বর্তমানে বিদ্যমান ২০ গ্রেডের কাঠামোটিই বহাল থাকছে। প্রস্তাবিত কাঠামোতে সর্বনিম্ন মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এর ফলে সার্বিকভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ধারাবাহিক বৈঠকের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী পে স্কেল নিয়ে বাস্তবায়নে ইতিবাচক এমন সিদ্ধান্তের কথা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। এদিকে আসন্ন বাজেটে এর প্রতিফলন নিশ্চিত করতে বাজেট ঘোষণার আগেই ‘জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫’-এর চূড়ান্ত সুপারিশ প্রকাশের জোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতির নেতা আব্দুল মালেক বলেছেন, ‘নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। বর্তমান সরকারও নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে যেসব আলোচনা আমরা শুনছি তাতে আমাদের আপত্তি রয়েছে। শুনেছি প্রধানমন্ত্রী তিন অর্থবছরজুড়ে (২০২৬-২৭, ২০২৭-২৮ ও ২০২৮-২৯) নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এখানেই আমাদের আপত্তি রয়েছে। আমরা মনে করি, কয়েক ধাপে পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত পরিহার করা উচিত। এটি এক ধাপে বাস্তবায়ন জরুরি। পে স্কেল এক ধাপে বাস্তবায়ন করলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।’

বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের মহাসচিব নিজাম উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ‘তিন অর্থবছরজুড়ে একটি পে-স্কেল বাস্তবায়ন বিরল ঘটনা। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার এমন সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবে না। গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এর বেশি কিছু বলা ঠিক হবে না। কারণ আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এটির বিষয়ে একটি সুসস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকবে। সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের বিষয়ে এখনো সময় আছে।’

অন্যদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্য একটি অংশ মনে করে, নতুন সরকারের জন্য নবম পে কমিশনের সুপারিশ শতভাগ বাস্তবায়ন করার মতো অর্থিক সক্ষমতা এই মুহূর্তে সরকারের নেই। যে কারণে সরকার বিলাসী এবং বাড়তি ব্যয়বহুল কর্মসূচি এড়িয়ে চলার কৌশল গ্রহণ করেছে। এই মুহূর্তে সরকারকে এ বিষয়ে চাপ দেওয়া ঠিক হবে না বলেও মনে করেন তারা। একই সঙ্গে তারা পে স্কেলের দাবিতে যেকোনো আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণেরও বিপক্ষে।

এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা সরকারি চাকরি করি। সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত মেনে প্রজাতন্ত্রের সেবা দেওয়াটাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব। এখানে আন্দোলন বিক্ষোভের কিছু নেই। সরকারি নিয়ম-নীতি মেনেই চাকরি করি। তবে বর্তমান সরকারের প্রতি আমাদের বিশ্বাস, যেহেতু বর্তমান সরকার একটি নির্বাচিত সরকার, সেহেতু সাধারণ জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা রয়েছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাধারণ জনসাধারণের বাইরের কেউ না।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের পে স্কেল অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন ও ভাতা পাচ্ছেন। সামরিক বাহিনী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসহ মোট উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ। ৯ লাখ পেনশনভোগীও রয়েছেন এর মধ্যে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও প্রশাসনিক পুনর্মূল্যায়নের কারণে চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে নবম পে কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও, তারা তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তমান সরকারের ওপর দেয়। বর্তমান সরকার দেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বিবেচনা করে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথন দিন ১ জুলাই থেকে এটি আংশিক বাস্তবায়নের একটি প্রাথমিক প্রস্তুতি নিলেও চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়নি। সরকারি মহল জানিয়েছে, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় রেখে একযোগে নয়, এই পে স্কেল মাঠ পর্যায়ে তিন ধাপে বাস্তবায়নের একটি নীতিগত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উচ্চ পর্যায়ের সূত্র মতে, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১ জুলাই থেকে এই নতুন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে বলে একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সচিবালয় সূত্রে আরো জানা গেছে, সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২১ সদস্যের বেতন কমিশনের প্রস্তাবিত মূল কাঠামোটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একসঙ্গে এত বড় অঙ্কের জোগান দেওয়া সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের ধারাবাহিক বৈঠকে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের একটি কৌশলগত খসড়া তৈরি করা হয়েছে।

নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, সবকিছু চূড়ান্ত হলে প্রথম ধাপে নতুন বেসিকের ৫০ শতাংশ কার্যকর হতে পারে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে বাকি ৫০ শতাংশ বেসিক এবং তৃতীয় ধাপে বিভিন্ন ভাতা ও সুবিধা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোতে সর্বনিম্ন বেতন ধরা হয়েছে ২০ হাজার টাকা, যা বর্তমানে আছে আট হাজার ২৫০ টাকা। আর বিদ্যমান সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৮ করার পরিকল্পনা করেছে কমিশন। অনলাইন জরিপের মাধ্যমে দুই লাখ ৩৬ হাজার মানুষের মতামত নিয়ে তৈরি করা এই প্রতিবেদনে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক সুপারিশ করা হয়েছে। নতুন কাঠামোতে বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা এবং যাতায়াত ভাতা দশম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বাড়িভাড়ার ক্ষেত্রে ১১তম থেকে ২০তম ধাপে তুলনামূলক বেশি হারে সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে। পেনশন ও ভাতার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। যেখানে ২০ হাজার টাকার কম পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বয়সভিত্তিক চিকিৎসা ভাতা পাঁচ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা করার সুপারিশ রয়েছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের নন-ক্যাডার কর্মচারী সিকান্দার আলী জানিয়েছেন, ‘বেতন কমিশনের সুপারিশ কয়েক ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়ে আমাদের আপত্তি আছে। আমরা চাই কমিমশনের সুপারিশ এক ধাপে বাস্তবায়ন করা হোক। কয়েক ধাপে বাস্তবায়নের খবরে বারবার বাজারে প্রভাব পড়বে। মুল্যস্ফীতি বাড়বে, এতে সুবিধাভোগীরা ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।’

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক জাতীয় বেতন কমিশনের সদস্য ড. এ কে এনামুল হক জানিয়েছেন, পে কমিশনের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করতে গিয়ে কমিশনের লক্ষ্য ছিল সরকারি কোনো পর্যায়ের কর্মচারী যাতে দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থান না করে। কোনো কর্মচারী যদি দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন তাহলে তার কাছ থেকে কী সেবা আপনি আশা করবেন? এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আমরা সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতন অন্য গ্রেডের তুলনায় কিছুটা বেশি বাড়ানোর সুপারিশ করেছি।’

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Arif Arman is a journalist associated with Zoom Bangla News, contributing to news editing and content development. With a strong understanding of digital journalism and editorial standards, he works to ensure accuracy, clarity, and reader engagement across published content.