Advertisement
এটিএম মোসলেহ উদ্দিন জাবেদ: ত্রিপুরা ভারতের ছোট একটি রাজ্য। ত্রিপুরার রাজধানী শহর আগরতলা বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছে অবস্থিত ভারতের ছোট্ট একটি শহর। মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধের আগে পরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার কারণে বাংলাদেশের মানুষের কাছে খুবই পরিচিত নাম আগরতলা। ট্রেনে আখাউড়া হয়ে খুব সহজে ও কম খরচে পৌঁছানো যায় সেখানে।

গত ৪ নভেম্বর দুদিনের ভ্রমণে আগরতলা ভ্রমণে গিয়েছি পরিবার নিয়ে। ত্রিপুরার ভাষা সংস্কৃতি বাংলাদেশের কুমিল্লা ও ব্রাক্ষণবাড়িয়া অঞ্চলের সাথে পুরোপুরি মিল। ঢাকা থেকে মহানগর প্রভাতী ট্রেনে করে সকাল সোয়া দশটায় আখাউড়া পৌঁছে যাই। আখাউড়া রেলস্টেশন থেকে আশি টাকায় একটা অটোরিক্সা ভাড়া করে বিশ মিনিটে পৌঁছে গেলাম আখাউড়া সীমান্ত চেকপোস্ট।

ট্রাভেল ট্যাক্স, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও দুই পাশের ইমিগ্রেশন শেষ করে আগরতলা বর্ডার থেকে একশ রূপীতে (দূরত্বের তুলনায় ভাড়াটা বেশি মনে হলো) একটা অটোরিক্সা ভাড়া করে দুপুর সাড়ে বারোটার মধ্যেই পৌঁছে যাই হোটেলে। হোটেলে চেক-ইন করে ফ্রেশ হয়ে বের হয়েছি লাঞ্চ করার জন্য। আগরতলা শহরের মোটর স্ট্যান্ড নামক জায়গায় ‘দিল্লিকা মসুর চিকেন বিরিয়ানি রেস্টুরেন্ট ‘ হায়দারাবাদী বিরিয়ানি ও মুরাদাবাদী বিরিয়ানি খেলাম। বাসমতী চাউল আর চিকেন দিয়ে রান্না করা বিরিয়ানি খুবই সুস্বাদু ছিলো।

লাঞ্চ সেরে হোটেলে ফিরে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম উজ্জয়ন্ত প্যালেস দেখতে। ১৯০১ সালে এই রাজপ্রাসাদটি নির্মিত হয়। এটি ত্রিপুরার তৎকালীন মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্যের রাজপ্রাসাদ। বর্তমানে এখন এটি জাদুঘর। এটি ইন্দো, ইউরোপীয় ও মোঘল স্থাপত্য শৈলীর মিশ্রনে নির্মিত হয়েছিলো। রাতে রাজপ্রাসাদটি রঙিন আলোয় আলোকিত হয়।

রাজপ্রাসাদে ভারতীয়দের জন্য জনপ্রতি প্রবেশ ফি ২০ রূপী আর ভিনদেশীদের জন্য ২৫০ রূপী। রাজকীয় প্রধান ফটক ধরে প্রবেশ করতেই দুই পাশে দুটি বিশাল চতুষ্কোনী পুকুরের দেখা মেলে। পুকুর পাড় জুড়ে রয়েছে গাছ গাছালি আর বাগান। রাজপ্রাাসদের নিচতলা দিয়ে প্রবেশ করতে হয় আর বের হতে হয় দোতলা দিয়ে। রাজপ্রাসাদে ঢোকার পথের ঠিক মাঝখানে রয়েছে ফোয়ারা আর ভস্কর্যসমৃদ্ধ চমৎকার বাগান। প্রাসাদের ভিতরে অনেকগুলো কক্ষ রয়েছে। এগুলোর প্রতিটির আলাদা আলাদা নাম রয়েছে যেমন- শ্বেতমহল, লালমহল, সদরবাড়ি, তহবিল খানা, আরাম ঘর, পান্থশালা প্রভৃতি। এই নামকরণ করেছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ত্রিপুরা রাজ্যের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহ্যের বাহারে সাজানো হয়েছে জাদুঘরটি। সেই সাথে রয়েছে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সেভেন সিস্টার্স তথা সাত রাজ্যের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্তি¡ক ও ঐতিহ্যের সমাহার। রাজপ্রাসাদ তথা জাদুঘরের একটা অংশ জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাবলী, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক নিদর্শনের প্রদর্শনী।

রাজপ্রাসাদ দর্শন শেষ করে বেরিয়ে এসে সন্ধ্যায় রাজপ্রাসাদের সামনে বিভিন্ন স্ট্রিটফুডের স্বাদ নিলাম। পানিপুরি, মোমো, চাট ইত্যাদি মুখোরোচক খাবারের স্বাদ চেখে দেখলাম। তারপর চলে গেলাম স্মার্টবাজার (পুরানো নাম বিগবাজার) ও ম্যাক্স ফ্যাশন মলে। দুই সুপারশপ থেকে শপিং করে হোটেলে ফিরলাম। যাবতীয় বাজার সদাই হোটেল রুমে রেখে রাতের খাবারের জন্য বের হলাম। রাতে কেএফসিতে বসে রাইস-চিকেন মিলবক্স খেয়ে হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে হোটেলের কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট সেরে একটা অটো নিয়ে চলে আসলাম বটতলা টেক্সি স্ট্যান্ড। আজ আমাদের গন্তব্য ত্রিপুরার অন্যতম প্রধান পর্যটন স্পট নীরমহল। এটিও একটি রাজপ্রাসাদ। আগরতলা থেকে প্রায় ৫৩ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। এটি ত্রিপুরার সীপাইজলা জেলার মেলাঘর নাম স্থানে রুদ্রসাগর নামক লেকের মাঝখানে অবস্থিত। চারপাশে পানি বেস্টিত মোঘল ও ইউরোপীয় ধাচে নীরমহল নির্মিত হয় ১৯৩৮ সালে। ত্রিপুরার মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপনের জন্য এটি নির্মাণ করেছিলেন ইংল্যান্ডের প্রকৌশলী সংস্থা মার্টিন এন্ড বার্ন কোম্পানীর দ্বারা।

বটতলা টেক্সি স্ট্যান্ড থেকে নীরমহলে যাওয়া-আসা ও নীরমহলে বেড়ানোর সময় সহ বারশ রূপীতে একটি এসি ট্যাক্সি রিজার্ভ করে রওনা হলাম নীরমহল দেখার উদ্দেশ্যে। প্রায় দেড়ঘন্টা জার্নি শেষে আমরা পৌঁছালাম অভ্যর্থনা কেন্দ্রে। অভ্যর্থনা কেন্দ্রে থেকে বড় ইঞ্জিন চালিত নৌকায় চড়ে রুদ্রসাগর লেক পাড়ি দিয়ে যেতে হয় নীরমহলে। নৌকার জন প্রতি টিকিট ৫০ রূপী। নীরমহল পর্যটন কেন্দ্রটি স্থানীয় উদ্বাস্তু মৎসজীবি সমবায় সমিতি কর্তৃক পরিচালিত। স্বল্পদূরের অভ্যর্থনা কেন্দ্রে থেকে রুদ্রসাগরের নীল জলরাশির মাঝে অবস্থিত নীরমহলটি দেখতে খুবই চমৎকার লাগছিল। নীরমহল প্রাসাদটির বাইরের নিচের অংশটি মেরুন রংএর এবং উপরিভাগ শ্বেতশুভ্র রং এর।

কিছুসময় অপেক্ষার পর টিকিট কাউন্টার থেকে ডাক আসলো। আমরা নৌকার টিকিট করে আমাদের জন্য নির্ধারিত নৌকায় উঠে বসলাম। বড় নৌকায় প্রায় ৪০ জন পর্যটক, যদিও ধারণ ক্ষমতা আরো বেশি। এরমধ্যে আরো কয়েকজন বাংলাদেশী পর্যটক পেয়ে গেলাম। ইঞ্জিনচালিত নৌকা এগিয়ে চললো নীরমহলের দিকে। যতই কাছাকাছি যাচ্ছি ততই নীরমহলের সৌন্দর্য্য দারুণ ভাবে ফুটে উঠছে। মনে হচ্ছে রূপকথার কোন প্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে পানির মাঝখানে, যার দর্শনে এগিয়ে চলেছি আমরা। নীরমহলের ঘাটে নৌকা ভিড়তেই নৌকার সুপারভাইজার জানালো নীরমহল দেখার সময় চল্লিশ মিনিট। নীরমহলে প্রবেশ ফি জনপ্রতি ত্রিশ রূপী। যথাসময়ে সবাইকে নৌকায় ফিরতে হবে। যদি নৌকা মিস হয়ে যায় তাহলে অতিরিক্ত প্রতি ঘন্টার জন্য দেড়শ রূপী করে দিতে হবে।

নৌকা থেকে নেমে আমরা নীরমহল টিকিট কাউন্টার থেকে জনপ্রতি ৩০ রূপী দিয়ে টিকিট করে প্রবেশ করলাম নীরমহলে। শ্বেতশুভ্র নীরমহলের যেদিকেই চোখ যায় অসাধারণ লাগছিল। সুনিপুণ কারুকার্যে নির্মিত নীরমহল আমাদের মন ভুলিয়ে দিচ্ছিলো। নীর অর্থ পানি অর্থাৎ পানির মধ্যে প্রাসাদটির অবস্থান বলেই এর নাম নীরমহাল। ত্রিপুরার মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য নিজেই এই নামকরণ করেন।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে ত্রিপুরার মহারাজার অনেক সখ্যতা ছিলো। জানা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নাকি এই প্রাসাদে এসেছিলেন একবার। নীরমহলের বিভিন্ন কক্ষ ও পুরো মহলটি ঘুরে দেখলাম। সেখানে স্থানীয়দের হস্তশিল্পের তৈরী বিভিন্ন জিনিসপত্রের একটি প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। চাইলেই পছন্দের যেকোন জিনিস কিনতে পারা যায়, তবে আমার কাছে দাম তুলনামূলক বেশি মনে হয়েছে। সে যাই হোক, নীরমহলের সৌন্দর্য্য কখনোই ভোলার নয়।

নীরমহলের সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য চল্লিশ মিনিট খুবই অল্প সময়। তারপরও নিয়ম মেনে সবার সাথে সেই নৌকায় করে ফিরে চললাম। আগরতলায় ফিরার পথে আমরা হরিশনগর চা বাগানে নেমে কিছুক্ষণ বেড়ালাম। চা বাগানের প্রতি সবসময়ই আমার একটা আলাদা আকর্ষণ কাজ করে। সেখানে দুজন চা শ্রমিকের সাথে কিছুক্ষণ কথা বললাম। তারা জানালো তারা মূলত উড়িয়া (উড়িষ্যা) থেকে আগত, এখন ত্রিপুরার স্থানীয় হয়ে গেছে। তাদের পূর্বপূরুষরা প্রায় দেড়-দুশো বছর পূর্বে উড়িয়া থেকে এখানে এসেছে চা শ্রমিক হিসেবে। বংশপরম্পরায় তারা এখনো চা
শ্রমিক।

তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এগিয়ে চললাম আগরতলা রেলওয়ে স্টেশন দেখবো বলে। আগরতলা রেলওয়ে স্টেশন খুবই সুন্দর একটি স্থাপনা। ত্রিপুরার বিখ্যাত উজ্জয়ন্ত প্যালেসের অনুকরণে নির্মিত রেলওয়ে স্টেশন। খুবই সুন্দর পরিপাটি রেলওয়ে স্টেশন। স্টেশনের সামনের অংশে পরিচ্ছন্ন ও বিশাল গাড়ি পার্কিং এরিয়া। এখান থেকে দিল্লী, কলকাতা, আসাম ও আঞ্চলিক বিভিন্ন গন্তব্যে ট্রেন ছেড়ে যায়। বাংলাদেশের সাথেও ট্রেন যোগাযোগ স্থাপনের জন্য রেললাইন নির্মিত হচ্ছে।

ঘোরাঘুরি শেষে বেলা তিনটার সময় আমরা হোটেলে ফিরে লাঞ্চ সারলাম। লাঞ্চ শেষে আমরা চলে আসলাম ত্রিপুরা রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের (টিআরটিসি) বাস টার্মিনালে, পরদিন ঢাকায় ফেরার বাসের টিকেট করার জন্য। আগরতলার সাথে ঢাকার সরাসরি এসিবাস সার্ভিস রয়েছে প্রতিদিন, ভাড়া মাত্র জনপ্রতি পাঁচশ রূপী, আর ঢাকা থেকে ভাড়া সাতশ টাকা। বাস ছাড়বে পরদিন দুপুর এগারটায়, পনের মিনিট আগে অবশ্যই বাস টার্মিনালে উপস্থিত হতে হবে।

সেখান থেকে হোটেলে ফিরে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে সন্ধ্যায় শপিংএর জন্য সিটি সেন্টারে গেলাম, সেখানে ডোমিনোসে পিৎজা খেয়ে কিছু টুকটাক শপিং সারলাম। রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরে লাগেজ গোছানোর কর্ম সম্পাদন করে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে হোটেলের কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট সেরে হোটেলের যাবতীয় বিল পে করে সাড়ে দশটার দিকে বেরিয়ে পড়লাম টিআরটিসি বাস টার্মিনালের উদ্দেশ্যে। হোটেলের সামনে থেকে একটা অটোরিক্সায় করে কাছের দূরত্বের টিআরটিসি বাস টার্মিনালে পাঁচ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম। আগরতলা শহরটি খুবই ছোট সবকিছু কাছাকাছি দূরত্বে। যথাসময়ে টিআরটিসি বাস টার্মিনাল থেকে দেশে ফেরার বাস ছেড়ে দিলো। এই ছিলো আমাদের দুদিনের ত্রিপুরা ভ্রমণের গল্প।

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স এসোসিয়েশন

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Md. Mahamudul Hasan, widely known as Hasan Major, is a career journalist with over two decades of professional experience across print, broadcast and digital media. He is the founding Editor of Zoombangla.com. He has previously worked for national English daily New Age, The Independent, The Bangladesh Observer, leading Bangla daily Prothom Alo and state-owned Bangladesh Betar. Hasan Major holds both graduate and postgraduate degrees in Communication and Journalism from the University of Chittagong.