জামালপুর সদর উপজেলার তিতপল্লা ইউনিয়নের চরশী খলিফাপাড়া এলাকায় অবস্থিত চরশী হাবিরুন্নেসা হাফিজিয়া মাদরাসা। ১৯৭৫ সালে মাওলানা আব্দুল্লাহ ইবনে ফজল ওরফে ফজল মুন্সীর প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাটি একসময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। কারণ তার দুই ছেলে জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আব্দুর রহমান ও সংগঠনটির নেতা আতাউর রহমান সানি। ২০০৫ সালে জেএমবির তৎপরতা প্রকাশ্যে আসার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক বন্ধ থাকার পর আবারও নতুন আঙ্গিকে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

জেএমবির শায়খ আব্দুর রহমান ও আতাউর রহমান সানি। যাদের নাম শুনলেই মনে পড়ে ২০০৫ সালের ভয়াবহ ১৭ আগস্টের কথা। দেশের ৬৩টি জেলায় (মুন্সীগঞ্জ বাদে) একযোগে বোমা হামলা চালিয়েছিল জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)। গত শতকের শেষ দশকে গঠিত এই দলটিই রাজশাহীর বাগমারায় উগ্র বামপন্থিদের দমনের নামে ঘটিয়েছিল অনেকগুলো নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ঝালকাঠির দুই বিচারককে হত্যার দায়ে সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আব্দুর রহমান, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, খালেদ সাইফুল্লাহ ও সালাহউদ্দিনকে ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। ২০০৭ সালের মার্চ মাসে কার্যকর করা হয় সেই রায়। ফাঁসি দেওয়া হয় আসামিদের।
তবে ২০০৫ সালে যখন সারাদেশে জেএমবির তৎপরতা বৃদ্ধি পায়, প্রশাসন যখন নড়ে বসে, তখন বন্ধ হয়ে যায় চরশী হাবিরুন্নেসা হাফিজিয়া মাদরাসা। ২০ বছর পর ২০২৫ সালের শুরুতে মাদরাসাটির প্রাতিষ্ঠানিক ও পাঠদান কার্যক্রম শুরু করেন শায়খ আব্দুর রহমান ও আতাউর রহমান সানির আরেক ভাই মাওলানা ওবায়দুর রহমান। এক সময় অভিযোগ ছিল- এই মাদরাসাতেই জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাতেন শায়খ আব্দুর রহমান। তবে খোঁজ নিয়ে এবং মাদরাসাটি ঘুরে এখন এমন কিছু পাওয়া যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদরাসাটির পরিচালক পদে আছেন মাওলানা ওবায়দুর রহমান, প্রধান শিক্ষক হিসেবে রয়েছেন মো. জাকারিয়া হোসেন। আর ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে আছেন টাঙ্গাইল জেলার একটি মাদরাসার ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা মো. আমিনুল ইসলাম।
জামালপুর শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে চরশী পূর্বপাড়ায় (খলিফাপাড়া) সরেজমিনে গেলে খোলা পাওয়া যায় মাদরাসাটি। প্রায় এক একর জমির ওপর নির্মিত মাদরাসাটির প্রবেশ পথে দেখতে পাওয়া যায় একটি পুরাতন মসজিদ। যেটির নাম চরশী খলিফাপাড়া মাওলানা বাড়ি জামে মসজিদ। এরপরই তিনটি নতুন আধাপাকা ভবন দেখা যায়। একটি ভবনে অফিস কক্ষ, বাকি দুইটির কয়েকটি কক্ষে চলছিল পাঠদান। সেখানে দেখা মেলে কয়েকজন শিক্ষার্থীর।
অফিস কক্ষে মাদরাসাটির প্রধান শিক্ষক, একজন সহকারী শিক্ষিকা ও তিন জন সহকারী শিক্ষকের সঙ্গে আধা ঘণ্টার মতো কথা হয় এ প্রতিবেদকের।
এসময় সহকারী শিক্ষক হাফেজ মো. রাকিব বলেন, ‘এই মাদরাসাতে প্লে, নার্সারি, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির পাঠদান চলে। সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে প্লে-তে ৪২ জন। এছাড়াও নার্সারিতে ৮ জন, প্রথম শ্রেণিতে ১৫ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১৩ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ৯ জন, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ৫ জন করে শিক্ষার্থী রয়েছে। মোট শতাধিক শিক্ষার্থীকে বাংলা ও নূরানী পদ্ধতিতে পাঠদান করা হয়। প্রতিজন শিক্ষার্থীর মাসিক বেতন শ্রেণিভেদে ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত।
সহকারী পরিচালক মো. শাহজামাল জানান, মাদরাসাটিতে মোট ১১ জন স্টাফ আছেন। এর মধ্যে সহকারী শিক্ষিকা ৩ জন, প্রধান শিক্ষকসহ পুরুষ শিক্ষক ৪ জন এবং বাকিরা স্টাফ। প্রত্যেকেই এই এলাকা বা আশপাশের এলাকার বাসিন্দা। কম বেতন হলেও বাড়ির পাশে থাকার সুবিধায় এখানে চাকরি করছেন তারা।
প্রধান শিক্ষক মো. জাকারিয়া হোসেনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘মাদরাসাটি অনেক পুরোনো। ২০০০ সালের দিকে বেশ সরগরম ছিল। তবে সেসময় এই মাদরাসার শিক্ষক বা শিক্ষার্থী কেউই এই এলাকার বাসিন্দা ছিলেন না। তারা বাহিরের লোকজন ছিলেন। আর তখন এই মাদরাসায় কেউ প্রবেশ করতে পারতো না। এর জন্য কেউ কখনো দেখতে বা বুঝতে পারতো না যে ভেতরে কী হচ্ছে। আমরা যতটুকু শুনেছি, তখন এখানে ক্যাডেট সেকশন হিসেবে পড়ানো হতো।’
জাকারিয়া হোসেন আরও বলেন, ‘বর্তমানের চিত্র ও প্রেক্ষাপট পুরোটাই উল্টো। এখন মাদরাসার দরজা সবসময় খোলা থাকে। যে কেউ, যখন খুশি তখন প্রবেশ করতে পারে, পরিদর্শন করতে পারে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সবাই এই এলাকার। আগেতো মাদরাসা খোলা যেত না বা এখানে কেউ বসতেও পারত না। বসলে বা খুললে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ চলে আসতো। এখন সিচুয়েশন এমন না। দেড় বছর ধরে মাদরাসাটি চলছে। আলহামদুলিল্লাহ এখন আমরা ভালো আছি।’
কথা বলার জন্য মাদরাসার পরিচালক মাওলানা ওবায়দুর রহমানকে কল দেওয়া হলে তার স্ত্রী মোছা. সাবিনা খাতুন ফোনটি রিসিভ করেন। এসময় সাবিনা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী দীর্ঘ ১৩ বছর কারাগারে ছিলেন। এখন তিনি এই মাদরাসাটি আবারো প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাজ করছেন। এটি তার বাবার প্রতিষ্ঠা করা মাদরাসা। বর্তমানে আমাদের সঙ্গে এক ব্যক্তির জমি নিয়ে কিছু বিরোধ চলছে। তাই তিনি এই মাদরাসাকে কেন্দ্র করে অতীত ইতিহাস টেনে অনেক কিছু রটানোর চেষ্টা করছেন। আমি বিষয়টি এলাকার ও জেলার সরকারি দলের নেতৃবৃন্দকে জানিয়েছি। তারা আমাদের অভয় দিয়েছেন। আর আপনারাও মাদরাসাতে গিয়েছিলেন। তেমন কিছু কি পেয়েছেন? মাদরাসাটিতে এলাকার শিশুরা লেখাপড়া করছে। এটাই আমাদের চাওয়া। এর চেয়ে আর বেশি চাওয়া নেই।’
এর ঘণ্টা খানেক পর মোবাইল ফোনে কথা হয় ওবায়দুর রহমানের সঙ্গে। এসময় তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আমি মাদরাসাটি আবার চালু করি। সংস্কার কাজ করা হয়। ২০২৫ সালে মাদরাসাটি চালু হয়। এরপর এই মাদরাসায় আমরা বড় আয়োজন করে একটি মাহফিল করেছিলাম। সেখানে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনের নীতি নির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন।’
মাদরাসা পরিচালনার ব্যয়ের উৎসের কথা জিজ্ঞেস করলে ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘শুধু মাত্র শিক্ষার্থীদের বেতনে মাদরাসা পরিচালনা করা খুবই কষ্টসাধ্য। এখানে এলাকার লোকজন দান করে। এছাড়াও আমরা কিছু সরকারি সহায়তা পেয়েছি। যেটি দিয়ে মাদরাসার উন্নয়ন কাজ করা হয়েছে। মাদরাসার বেশির ভাগ অর্থ দান-সদগা থেকে আসে।’
কার অনুমতিতে মাদরাসাটি পুনরায় চালু হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘২০০৫ সালের দিকে আমাদের পরিবারের সদস্যরা যখন মাদরাসাটিতে সময় দিতে পারেনি। তখন পরিচালক না থাকায় মাদরাসাটি বন্ধ হয়ে যায়। মাদরাসাটি কেউ বা কোনো কর্তৃপক্ষ বন্ধ করেনি। তাই চালুর সময়ও কারো অনুমতি নেওয়া হয়নি।’
জামালপুর সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত নই। তাছাড়া এটি একটি হাফিজিয়া মাদরাসা, যা আমাদের অধিক্ষেত্রের আওতাভুক্ত নয়।’
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
জামালপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। পুলিশ সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চলাফেরা ও কর্মকাণ্ডের ওপরও নজরদারি রাখা হচ্ছে।’
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



