বাংলাদেশে দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুলকাঙ্খিত নতুন বেতনকাঠামো বা নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে স্কেল কার্যকর হবে এবং সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতনে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। এই ঘোষণার মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইছে। তবে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্পষ্টতা আসেনি। বিশেষ করে পে-স্কেলের গেজেট কবে প্রকাশ হবে এবং বর্ধিত বেতন কবে থেকে হাতে পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে সরকার এখনো কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা দেয়নি।

এছাড়া নতুন বেতনকাঠামোর আওতায় নির্ধারিত বেতন বৃদ্ধির কত শতাংশ আগামী অর্থবছর থেকেই কার্যকর হবে, সে বিষয়েও সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে নবম পে-স্কেল বাস্তবে কীভাবে, কত ধাপে এবং কোন কাঠামোতে কার্যকর হবে, তা নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছর থেকে পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হলেও এটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে সে সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ কোনো কৌশল এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। ফলে চাকরিজীবীদের মধ্যে এক প্রকার অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নবম পে-স্কেলের যাবতীয় বিষয় চূড়ান্ত করতে সভা ডেকেছে পে-স্কেলের সুপারিশ পুনর্মূল্যায়নে গঠিত সচিব কমিটি। আগামীকাল বুধবার এ সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় বেসিক, গেজেটসহ অন্যান্য বিষয় চূড়ান্ত করা হতে পারে।
এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, আজ বুধবার সচিব কমিটির সভা রয়েছে। সভায় নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর হবে। জুলাই থেকে পে-স্কেল কার্যকর হলেও টাকা পেতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে। আগামীকাল সচিব কমিটির সভায় অনেক কিছুই চূড়ান্ত হতে পারে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।’
বেসিক বৃদ্ধি নিয়ে ধোঁয়াশা
নবম জাতীয় পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেসিকের কত শতাংশ আগামী অর্থবছর থেকে বৃদ্ধি পাবে সেটি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে। যদিও পে-স্কেল নিয়ে গঠিত সচিব কমিটির প্রস্তাবনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির কথা রয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে খবর চাউর হয়েছে প্রথম ধাপে শতভাগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত বেসিকের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির কথা রয়েছে। বিকল্প হিসেবে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ এবং ১০ম-২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি করা হতে পারে। তবে প্রথম ধাপে বেসিকের শতভাগ বৃদ্ধির বিয়য়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানা গেছে।
নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা এখন চরমে। কিন্তু ৫০% নাকি ১০০% বাস্তবায়ন হবে এবং কবে গেজেট প্রকাশ হবে এ বিষয়ে এখনও স্পষ্ট ঘোষণা না আসায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। ২৪ জুন আবার সচিব কমিটির সভা হওয়ার খবরে অনেকের মনে নতুন আশা জাগলেও, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান কবে হবে সেই প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে।— আশিকুল ইসলাম, সদস্য সচিব, বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নবম পে-স্কেলে প্রথম ধাপে বেসিকের কত শতাংশ বৃদ্ধি পাবে সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখে কাজ করছে সরকার। শতভাগ বেসিক বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। ফেসবুকে এ তথ্য যারা ছড়িয়েছেন, এ বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবেন।’
নতুন পে-স্কেল কার্যকর জুলাইয়ে, টাকা কবে থেকে তা নিয়েও অনিশ্চয়তা
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বাজেটে সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে প্রজ্ঞাপন জারি, বিধি সংশোধন, হিসাব পুনর্নির্ধারণ এবং সফটওয়্যার সমন্বয়সহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। এর ফলে জুলাই থেকে পে-স্কেল কার্যকর হলেও বেতন কবে থেকে কার্যকর হবে সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছে না।
যদিও মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির দাবি, জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া পে-স্কেলের বেতন আগামী সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবর মাসে পাওয়া যেতে পারে। তবে সরকারি চাকরিজীবীরা বলছেন গেজেট জারি না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছুই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
পে-স্কেলের গেজট কবে, জানে না কেউ
নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট চলতি জুন মাসের শেষ দিকে জারির ইঙ্গিত দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে এখনো পে-স্কেলের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো চূড়ান্ত না হওয়ায় গেজেট কবে জারি করা হতে পারে সে বিষয়ে কিছুই জানাতে পারছেন না কর্মকর্তারা। বুধবার (২৪ জুন) সচিব কমিটির সভায় পে-স্কেলের যাবতীয় বিষয় চূড়ান্ত হলে গেজেট জারির সম্ভাব্য সময় জানা যেতে পারে বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পে-স্কেলের গেজেট, বেসিক বৃদ্ধিসহ যাবতীয় বিষয় নির্ভর করছে সচিব কমিটির সভার ওপর। সচিব কমিটি সবকিছু চূড়ান্ত করলে গেজেট জারির দিকে অগ্রসর হবে মন্ত্রণালয়।’
বাদ যাচ্ছে ১০-১৫ শতাংশ সুবিধা
বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা গ্রেড ভেদে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন। নবম জাতীয় পে-স্কেল আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হলে এই বিশেষ সুবিধা বাতিল হয়ে যাবে বলে জানা গেছে। ফলে বেসিকের ৫০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পেলেও পে-স্কেল বাস্তবায় হলে সরকারি চাকরিজীবীদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা বাতিল হয়ে যাবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে যারা ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে কর্মরতরা ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডে কর্মরত চাকরিজীবীরা ১০ শতাংশ বিশেষ সুবিধা পান। ফলে ১ জুলাই বেসিকের ৫০ শতাংশ হিসেব ধরে পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে ১০ম ২০তম গ্রেডের চাকরিজীবীদের বেতন বাড়বে ৩৫ শতাংশ। আর ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের চাকরিজীবীদের বেতন বাড়বে মূল বেতনের ৪০ শতাংশ।
হতাশ কর্মকর্তা-কর্মচারী নেতারাও
নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট জারি না হওয়া, বেসিকের কত শতাংশ বাড়ছে সেটি চূড়ান্ত না করাসহ কোনো বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা না আসায় হতাশা প্রকাশ করেছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সংগঠনের নেতারা।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সদস্য সচিব আশিকুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা এখন চরমে। কিন্তু ৫০% নাকি ১০০% বাস্তবায়ন হবে এবং কবে গেজেট প্রকাশ হবে—এ বিষয়ে এখনও স্পষ্ট ঘোষণা না আসায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। ২৪ জুন আবার সচিব কমিটির সভা হওয়ার খবরে অনেকের মনে নতুন আশা জাগলেও, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান কবে হবে সেই প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে কর্মচারীরা আর গুঞ্জন নয়, একটি স্পষ্ট ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেখতে চান।’
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি, আসন্ন সভায় পে-স্কেল বিষয়ে সকল জটিলতার অবসান ঘটবে এবং দ্রুত প্রজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমে লাখো কর্মকর্তা-কর্মচারীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে।’
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



