অপরাধ-দুর্নীতি জাতীয় রাজনীতি স্লাইডার

নূর হোসেনকে ‘ইয়াবাখোর ও ফেন্সিডিলখোর’ বলার পর রাঙ্গার ক্ষমা প্রার্থনা

হারুন উর রশীদ স্বপন, ডয়চে ভেলে: জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গার বিচার দাবি করেছেন স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শহিদ নূর হোসেনের পরিবার৷ রাঙ্গা অবশ্য তাঁকে অ্যাডিক্টেড, ইয়াবাখোর ও ফেন্সিডিলখোর বলে দেয়া বক্তব্য প্রত্যাহার করেছেন৷

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘নূর হোসেন ইয়াবা বা ফেনসিডিল আসক্ত নয়, মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলো৷ আমি ওই শব্দ দু’টি প্রত্যাহার করে নিচ্ছি৷ তার পরিবারের কাছে দুঃখ এবং ক্ষমা প্রার্থনা করছি৷’’

তিনি বলেন, ‘‘রোববার আমি বলেছি নূর হোসেন ফেনসিডিলখোর, ইয়াবাখোর অথবা অ্যাডিক্টেড ছিলেন৷ কিন্তু তখন ইয়াবা, ফেনসিডিল ছিলো কিনা তা আমার জানা নেই৷ আমি তার পাশেও ছিলাম না৷ মুখ ফসকে বলে ফেলেছি৷ তাই আমি শব্দ দু’টি প্রত্যাহার করে নিচ্ছি এবং তার পরিবারের কাছে দুঃখ ও ক্ষমা প্রার্থনা করছি৷’’

তিনি দাবি করেন, ‘‘ময়না তদন্ত রিপোর্টে আছে যে নূর হোসেনের পিঠে গুলি লেগেছে৷ বুক থেকে গুলি বের হয়ে গেছে৷ সে ভারসাম্যহীন ছিলো তাকে কেউ সামনে এগিয়ে দিয়েছে৷ আমার প্রশ্ন পিছন থেকে কে বা কারা গুলি করল? আমি এর তদন্ত চাই৷ তদন্তেই প্রকৃত তথ্য বের হয়ে আসবে৷ এরশাদকে অযথা দায়ী করা হচ্ছে৷ নূর হোসেন হত্যার বিচার খালেদা জিয়া বা শেখ হাসিনা করলেন না কেন? আমি বিচার চাই৷’’

তিনি আরো দাবি করেন, ‘‘এরশাদ সাহেব যতদিন বেঁচে ছিলেন নূর হোসেনের পরিবারকে মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে দিতেন৷’’

এদিকে আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন,‘‘রাঙ্গার বক্তব্যই প্রমাণ করে এরশাদ নূর হোসেনকে হত্যার সাথে জড়িত৷’’ অবশ্য জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেছেন,‘‘এরশাদ নুর হোসেন ডা. মিলন হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না৷’’

সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর পরিবহণ শ্রমিক নূর হোসেন তার বুকে পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ গণতন্ত্র মুক্তি পাক লিখে জীবন্ত পোস্টার হয়েছিলেন৷ এইদিনই ঢাকার গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি৷ তার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন নতুন গতি পায়৷ ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন৷ নূর হোসেন নিহত হওয়ার দিন ১০ নভেম্বর বাংলাদেশে ‘শহীদ নূর হোসেন দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে৷ কিন্তু সেই এরশাদের দল জাতীয় পার্টি এখন দিনটিকে ‘গণতন্ত্র দিবস’ হিসেবে পালন করে৷

জাতীয় পার্টির ‘গণতন্ত্র দিবসের’ আলোচনা সভায় রবিবার দলের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন,‘‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কাকে হত্যা করলেন৷ নূর হোসেনকে? নূর হোসেন কে? একটা অ্যাডিকটেড ছেলে৷ একটা ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর৷’’

তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদে এবং বিচারের দাবিতে সোমবার ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়েছেন নূর হোসেনের মা, তিন ভাই, বোন এবং পরিবারের সদস্যরা৷ শহীদ নূর হোসেনের বড় ভাই মো. আলি হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন,‘‘সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবাদ করার ক্ষমতা আমাদের নাই৷ তাই পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তায় বসেছি৷’’

তিনি বলেন, ‘‘আমার ভাই নূর হোসেন গণতন্ত্রের জন্য শহিদ হয়েছে৷ এরশাদ নিজে সংসদে ক্ষমা চেয়েছেন৷ আমার বাবার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন৷ এখন রাঙ্গাকে প্রমাণ করতে হবে আমার ভাই মাদকাসক্ত ছিলো৷ প্রমাণ করতে না পারলে তার বিচার করতে হবে৷ সরকারের কাছে এই বিচারের দাবি জানাই৷ যদি বিচার না করা হয় তাহলে আমরা আত্মাহুতি দেব৷  নিজের গায়ে কোরোনি ঢেলে আমরা মরব৷ আমাদের কেন এই অপমান করা হলো?’’

জাতীয় পার্টি সরকারের সঙ্গে আছে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘সরকারের কাছে তাই দাবি ওনাকে যেন বয়কট করা হয়৷ তার সংসদ সদস্যপদ যেন বাতিল করা হয়৷’’ আর নূর হোসেনের মা মরিয়ম বিবি রাঙ্গার বিরুদ্ধে মামলা করার কথা বলেছেন৷

এদিকে সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘‘রাঙ্গা যা বলেছেন তা মন্তব্যেরও অযোগ্য৷ তারা সরকারের অংশ৷ তারা মহাজোটের অংশ ৷ তাই এটা সরকারের কথা বলেই ধরে নিচ্ছি৷ আর সে কারণেই সরকার চুপচাপ আছে৷ কোনো কথা বলছে না৷ কিন্তু সরকারকে এর জবাব দিতে হবে৷’’

তিনি জাতীয় পার্টি প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘ওরা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে৷ বাংলাদেশে ওদের কোনো জায়গা নেই৷’’

এবিষয়ে মশিউর রহমান রাঙ্গার ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে বার বার তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি৷ তবে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, ‘‘রাঙ্গা যা বলেছেন তা তার নিজস্ব বক্তব্য৷ কিন্তু আমার কাছে ভালো লাগেনি৷ তবে আমরা মনে করি নূর হোসেন ও ডা, মিলনকে নিয়ে অযথাই এরশাদ সাহেবকে দায়ী করা হয়৷ আমরা মনে করি তাদের মৃত্যুর জন্য এরশাদ সাহেব দায়ী নন৷ এজন্য আমরা একটি তদন্ত কমিটি চাই৷ যারা তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করবে৷ তাই বলে নূর হোসেনের চরিত্র হননের প্রশ্ন আসে না৷’’

তবে রাঙ্গার বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেয়ার কেনো প্রতিক্রয়া আপাতত নেই বলে জানান তিনি৷

আর জাতীয় পার্টির দূর্গ বলে পরিচিত রংপুরের মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসির আরাফাত বলেন, ‘‘নূর হোসেন ইয়াবাখোর বা মাদকাসক্ত ছিলেন বলে আমরা কখনো শুনিনি৷ রাঙ্গা সাহেবই প্রথম বললেন৷ একজন মৃত মানুষের এভাবে চরিত্র হনন ঠিক নয়৷ এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়৷’’

এদিকে আওয়ামী লীগ বা ১৪ দলের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয় যায়নি৷ তবে আওয়ামী লীগ নেতা ও ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘‘মশিউর রহমান রাঙ্গা একটি দলের মহাসচিব হয়ে একজন শহীদের ব্যাপারে যে ঘৃণ্য এবং জঘন্য মন্তব্য করেছেন তা প্রত্যাহার করে এজন্য তার ক্ষমা চাওয়া উচিত৷’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘নূর হোসেনের ব্যাপারে জঘন্য মন্তব্য করার সময় রাঙ্গা স্বাভাবিক ছিলেন কিনা সেটা দেখা দরকার৷’’

তার ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানানো হবে কিনা? এর জবাবে তিনি বলেন,‘‘জাতীয় পার্টি সরকারের কোনো অংশ নয়৷  তাই আমাদে আহ্বান জানানোর কিছু নেই৷ তবে রাঙ্গার বক্তব্য প্রমাণ করে যে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় এরশাদ এই হত্যার সাথে জড়িত৷ খুনের সাথে জড়িত৷



জুমবাংলানিউজ/এইচএম




আপনি আরও যা পড়তে পারেন


সর্বশেষ সংবাদ