পরিস্থিতি বদলে দিয়েছেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়

স্পোর্টস ডেস্ক: আগের অবস্থা আর নেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রতি ম্যাচে এখন অবজার্ভার থাকেন। খবর ডয়চে ভেলে’র।

মতি নন্দীর একটি অসাধারণ উপন্যাস আছে ক্রিকেট নিয়ে, ‘ননীদা নট আউট’। সেখানে জেতার জন্য ননীদার হরেক রকম স্ট্র্যাটেজি ছিল। তার একটা হলো ননিট্রিকস। তার মধ্যে আম্পায়ারকে ম্যানেজ করাও একটা ট্রিকস। যেমন মাঠে নেমেই ননীদা আম্পায়ারকে জিজ্ঞাসা করলেন ”বাতের ব্যথাটা কেমন আছে।” আম্পায়ার জানালেন, বেশ বেগ দিচ্ছে। ননীদা বললেন, ”ভাববেন না, খেলার শেষে অব্যর্থ কবিরাজি মালিশের তেল পাঠিয়ে দেবো। আমার পিসির তো সেই তেল মালিশ করে বাত উধাও।” সেখানেই শেষ নয়। একবার বল করতে এসে এলবিডাব্লিউর আবেদন করার মাঝপথে থেমে বললেন, ”না, না হয়নি।” আর একবার বললেন, ”আম্পায়ার, আপনি আউট না দিয়ে ভালো করেছেন। আমার অ্যাপিল করাই উচিত হয়নি। শিওর না হয়ে আবেদন করা উচিত নয়।” তারপর ‘শিওর’ হয়ে আবেদনের ফল, চারটে এলবি, দুটো রান আউট।

তবে এসব হলো ছোটখাট ট্রিকস। ক্লাব ক্রিকেটে কত যে ট্রিকস চলতো, গড়ের মাঠের সেই সব গল্প অনেকদিন ধরে ছিল হট টপিক। ম্যাচ ছাড়া, ম্যাচ ধরা ইত্যাদির গল্প। তবে এখন আর ওইসবের কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় সিএবি-র সভাপতি হওয়ার পর যে নিয়ম চালু করেছেন, তারপর তো সেসবের কোনো প্রশ্নই নেই।

সৌরভ দায়িত্ব নেয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের ঘরোয়া ক্রিকেট ম্যাচে অবজার্ভার চালু করে দিয়েছেন। একজন সাবেক ক্রিকেটার অবজার্ভার থাকবেন। সিএবি-র গাড়িতে করে তিনি ম্যাচের আধঘণ্টা আগে পৌঁছে যাবেন। থাকবেন পুরো সময়। তার জন্য লাঞ্চ আসবে সিএবি থেকে। পুরো খেলা দেখে তিনি রিপোর্ট দেবেন।

তার জন্য চার হাজার টাকা পাবেন। অবজার্ভারদের এই দাপটে আর কোনো ট্রিকস চলে না। ক্রিকেটারদেরও গোলমাল করা, আম্পায়ারদের সঙ্গে অসভ্যতা করা একেবারে বন্ধ। করলেই রিপোর্ট জম পড়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা। তা হলে রাজ্যের হয়ে খেলার সম্ভাবনা কমবে। আর ঘরোয়া ক্রিকেটেও তো এখন ভালো টাকা। কেই বা সেটা হারাতে চায়।

এখন ভারতীয় বোর্ডের চাল-চরিত্র-চেহারা সব বদলেছে। একসময় বোর্ডে ছিল মুম্বই-লবির দাপট। সেখানকার প্লেয়াররা, কর্তারা ভারতীয় ক্রিকেট শাসন করতেন। দীর্ঘদিনের ক্রীড়া সাংবাদিক ও সম্পাদক মানস চক্রবর্তীর মতে, ”সেসময় চালু কথাই ছিল, আমচি মুম্বই, তুমচি মুম্বই। মানে আমিও মুম্বই, তুমিও মুম্বই। কিন্তু এখন আর সেসব নেই। আগে ক্রিকেট টিম হলে, খবর লেখা হতো, কোন ভালো প্লেয়ারকে বাদ দেয়া হয়েছে। এখন আর সেসব কপি লেখার কোনো সুযোগই থাকে না।”

ঠিকই জগমোহন ডালমিয়া, আইএস বিন্দ্রার মতো অনেকেই সেই মুম্বই-শাসন ভেঙেছেন। আর এখন তো সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের বোর্ড। সৌরভ এবং অমিত শাহ-পুত্র জয় শাহই বোর্ড চালাচ্ছেন। সেখানে দলবাজি, কোনো একটি অঞ্চলের প্লেয়ারদের টিমে ঢুকিয়ে দেয়া এসব হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এখন সমস্যা হলো, সমমানের এত প্লেয়ার প্রতিটি পজিশনে এসে গেছে যে, কাকে ছেড়ে কাকে রাখা হবে, সেটাই সমস্যা।

আর বোর্ড যেমন ক্রিকেটারদের ঢালাও সুবিধা ও অর্থ দেয়, তেমনি ক্রিকেট মাঠে তাদের অসভ্যতা বরদাস্ত করে না। আবেগের বশে একটু-আধটু ভুলচুকক হয়ে গেল, সেটা অন্য কথা, না হলে সাকিবের মতো ঘটনা ঘটলে কঠোরতম শাস্তি হবেই। ক্রিকেটাররাও পেশাদার। তারা জানেন, ভারতীয় টিমে কেউ অপরিহার্য নয়। ফলে খামোখা শাস্তির মুখে কে-ই বা পড়তে চাইবেন। অস্ট্রেলিয়ায় বিরাট কোহলি এবং প্রথম টিমের বেশ কিছু বোলার না থাকা সত্ত্বেও অসাধারণ জয় পেয়েছে ভারত। তার উপর খেলার জগতে ভারতীয় মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমের একটা প্রভাব আছে। তার উপরে রয়েছে আদালত। সবমিলিয়ে পরিস্থিতি এখন অনেকটা ভালো।

তারপরেও কি আম্পায়ারের সিদ্ধন্ত নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ হয় না? হয়। এই অসমাপ্ত আইপিএলেও হয়েছে। রোহিত শর্মা একবার আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখিয়েছেন। গত মার্চে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে সূর্যকুমার যাদবের আউট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন কোহলি। তার দাবি, রিপ্লেতে দেখা গিয়েছে বল মাটি ছুঁয়েছিল। কিন্তু আম্পায়ার ও থার্ড আম্পায়ার আউট দিয়েছিলেন। তবে ওইটুকই। কোনোভাবেই সীমার বাইরে যাওয়া নয়।

আবেগের ক্রিকেটে ওইটুকু হতে পারে। তার বেশি হলে তো কড়া শাস্তি। চরম পেশাদার ক্রিকেটাররা এটা জানেন। তাই তারা সীমা ছাড়ান না। এক আধটা ব্যতিক্রম থাকতে পারে। না হলে মেজাজকে সংযত রাখার শিক্ষাটাও ক্রিকেট এবং পরিস্থিতিই তাদের দিয়ে দেয়।


জুমবাংলানিউজ/একেএ