বিয়ের রাতে স্বামীর হাতে ধর্ষিতা হচ্ছেন হাজার হাজার স্ত্রী

বিয়ের রাতেই ৩৪ বছরের সাফাকে তার স্বামী ধর্ষণ করেছিল। কুচকি, কব্জি এবং মুখে জখম নিয়ে তাকে ফুলশয্যার রাত কাটাতে হয়েছে।

সাফা বলেন “আমার তখন মাসিক চলছিল। আমি সেরাতে সেক্স করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।,

“কিন্তু আমার স্বামী ভাবলো আমি সহবাস এড়াতে চাইছি।

”প্রথমে সে আমাকে পেটালো, হাত বেধে ফেললো। মুখ চেপে ধরলো যাতে আমি চিৎকার না করতে পারি। তারপর আমাকে ধর্ষণ করলো।“

কিন্তু তারপরও সমাজের ভয়ে পুলিশের কাছে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চাননি সাফা।

কারণ অপরাধের শিকার মানুষদেরই অপরাধী হিসাবে গণ্য করা পুরুষতান্ত্রিক মিশরীয় সমাজের স্বাভাবিক একটি ঘটনা।

আর নির্যাতিত যদি হয় নারী, তাহলে কথাই নেই।

মিশরে প্রতিবছর গড়ে কমপক্ষে ৬,৫০০ নারী স্বামীর হাতে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি বা সহবাসের জন্য জবরদস্তির শিকার হন বলে সরকারি এক পরিসখ্যান বলছে।

মিশরে প্রতিবছর গড়ে কমপক্ষে ৬,৫০০ নারী স্বামীর হাতে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি বা সহবাসের জন্য জবরদস্তির শিকার হন বলে সরকারি এক পরিসখ্যান বলছে।

টিভি সিরিয়াল পরিস্থিতি বদলে দিল

তবে এপ্রিল মাসে রোজার সময় মিশরের একটি টিভিতে একটি সিরিয়াল নাটকের প্রচার ছিল মোড় ঘোরানো একটি ঘটনা।

নিউটনস্‌ ক্রেডল নামে ঐ সিরিয়ালের একটি পর্বে দেখানো হলো – এক পুরুষ তার স্ত্রীকে যৌন সম্পর্কের জন্য জবরদস্তি করছে।

মিশরের অনেক নারী তাদের নিজেদের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার সাথে ঐ দৃশ্যের মিল খুঁজে পেলেন।

সাহস করে অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের সেই অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে শুরু করেন।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শত শত নারীর সেসব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অনলাইনে চলে আসে।

সানার তিক্ত অভিজ্ঞতা

ফেসবুকে তৈরি হয় ‘স্পিক আপ‘ নামে একটি পেজ যেখানে জায়গা পায় সাতশরও বেশি বিবাহিতা নারীর নিজের জীবনের তিক্ত যৌন অভিজ্ঞতার কথা।

তার ভেতর ছিল ২৭-বছরের সানার কথা।

“স্বামী ছিল আমার কাছে ফেরেশতার মত। বিয়ের এক বছর পর আমি তখন ভরন্ত অন্তঃসত্ত্বা। সন্তান জন্মের জন্য তখন খুব বেশিদিন বাকি নেই,“ ফেসবুকের ঐ পেজে তিনি লেখেন।

“একদিন ছোটখাটো একটি ব্যাপারে আমাদের মধ্যে অনেক ঝগড়া হলো। সে আমাকে শাস্তি দিতে চাইলো।

“সে আমাকে ধর্ষণ করলো। আমার গর্ভপাত হয়ে যায়।“

এরপর থেকে সানা পরিবারের কোনো সাহায্য ছাড়া এক হাতে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য লড়ে যাচ্ছেন। স্বামীর কাছ থেকে আলাদা থাকেন।

কিন্তু জন্ম দেওয়ার আগেই পেটের সন্তান হারানোর শোক এখনও তিনি ভুলতে পারছেন না।

যৌন সম্পর্কের জন্য স্ত্রীর ওপর জবরদস্তি – বিশেষ করে বিয়ের রাতে – মিশরের বহু অঞ্চলে অলিখিত একটি সামাজিক রীতি।

কিন্তু বিষয়টি নিয়ে এই প্রথম বেশ খোলামেলা বিতরক শুরু হয়েছে।

নামকরা গায়কের স্ত্রী ধর্ষণের শিকার

বিতর্ক আরো জোরদার হয় যখন নামকরা এক গায়কের সাবেক স্ত্রী ইনস্টাগ্রামে তার বিবাহিত জীবনে স্বামীর হাতে ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

কাঁদতে কাঁদতে বর্ণনা করা তার ঐ ভিডিও ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েয়ে যায়। অনেক সংবাদপত্রের খবর হয় তার ঐ স্বীকারোক্তি।

তবে ঐ গায়ক ইনস্ট্রগ্রামে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।

এক ভিডিও পোস্ট করে তিনি বলেন, তার সাবেক স্ত্রীর কথা বানোয়াট, মিথ্যা।

কিন্তু ঐ নারী তার দাবী থেকে টলেননি।

বরঞ্চ তিনি বৈবাহিক সম্পর্কের ভেতর ধর্ষণকে অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করে দেশের আইন বদলানোর দাবি জানিয়েছেন।

বিয়ের রাতে ধর্ষিতা হচ্ছেন হাজার হাজার স্ত্রী

মিশরে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক রিপোর্টে সরকার পরিচালিত নারী অধিকার সংস্থা ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর উইমেন (এন সি ডব্লিউ) জানায় প্রতি বছর গড়ে কমপক্ষে ৬,৫০০ নারী স্বামীর হাতে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি বা যৌণ সম্পর্কের জন্য জবরদস্তির শিকার হন।

“মিশরের সমাজে পুরুষরা ধরেই নেয় বিয়ের পর স্ত্রী যৌন সম্পর্কের জন্য রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত থাকবে।

”এই অলিখিত সামাজিক রীতির ফলেই বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে এসব ধর্ষণের ঘটনা ঘটে,“ বলেন রেদা দানবউকি যিনি নারী অধিকার বিষয়ে বেসরকারি সংস্থা উইমেনস সেন্টার ফর গাইডেন্স অ্যান্ড লিগাল আ্যাওয়ারনেসের নির্বাহী পরিচালক।

তিনি বলেন, ধর্মীয় কিছু অনুশাসনের ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে মিশরে একটি সাধারণ বিশ্বাস বহু মানুষের মধ্যে রয়েছে যে স্ত্রী যদি স্বামীর সাথে যৌন সম্পর্কে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে সে “পাপী“ এবং “ফেরেশতারা সারারাত ঐ নারীকে অভিশাপ দেবে।“

ফতোয়া – সহিংস স্বামীই হবে পাপী

মিশরে দার আল-ইফতা নামে যে প্রতিষ্ঠানটি ধর্মীয় নানা বিষয়ে ফতোয়া দেয়, তারা এই বিতর্কের সমাধান করতে গিয়ে বলেছে – “কোনো স্বামী যদি তার সাথে সহবাসের জন্য স্ত্রীর সাথে সহিংস আচরণ করে, তাহলে সেই হবে পাপী, এবং আদালতে কাছে গিয়ে স্বামীর শাস্তি দাবি করার অধিকার স্ত্রীর রয়েছে।“

কিন্তু উইমেনস সেন্টার ফর গাইডেন্স অ্যান্ড লিগাল আ্যাওয়ারনেসের মিঃ দানবউকি বলেন তার প্রতিষ্ঠানের কাছে গত দুই বছরে স্বামীর হাতে ধর্ষণের দুশটি ঘটনার প্রমাণ রয়েছে।

এসব ঘটনার সিংহভাগই হয়েছে বিয়ের রাতেই।

মিশরের আইনে বৈবাহিক সম্পর্কে ধর্ষণ কোনো অপরাধ নয় যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এমন আচরণকে যৌন সহিংসতা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

তাছাড়া, আদালতেও এসব অভিযোগ প্রমাণ করা শক্ত।

যে কারণে স্বামী পার পেয়ে যায়

মিশরের পেনাল কোড বা অপরাধ আইনের ৬০ নম্বর ধারার কারণে আদালতে এসব মামলায় অভিযুক্ত স্বামীরা শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যান।

আইনের ঐ ধারায় বলা হয়েছে – সরল বিশ্বাসে করা কোনো কাজ এবং শারিয়া আইনে দেওয়া অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হবেনা।

কিন্তু মিঃ দানবউকি বলেন, অভিযোগকারীর “দেহ পরীক্ষা করে, জখমের চিহ্ন দেখে“ সহজেই স্বামীর হাতে ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণ করা সম্ভব।

রক্ষণশীল মিশরের সমাজে পরিবর্তন আসে খুব ধীরে, তবে স্বামীর হাতে ধর্ষিতা নারীরা সাহস করে তাদের কথা মানুষকে জানাতে শুরু করেছেন।

সাফা এবং সানা – দুটিই ছদ্মনাম। ঐ দুই নারীর ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন রাখতে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।


জুমবাংলানিউজ/ জিজি