বর্তমানে বাংলাদেশের প্রশাসনে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে রেকর্ড সংখ্যক কর্মকর্তা নিযুক্ত রয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ওএসডি হিসেবে আছেন ৫১৬ জন কর্মকর্তা। এই সংখ্যাটি প্রশাসনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ১২ জন রয়েছেন সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে, যা পূর্বে কখনো দেখা যায়নি।
ওএসডি মানে এমন একটি প্রশাসনিক অবস্থা যেখানে একজন কর্মকর্তা অফিসে উপস্থিত থাকলেও তার কাছে কোনো দায়িত্ব বা কার্যভার থাকে না। সাধারণত প্রেষণ, পদোন্নতি বা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের কারণে কিছু কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে ওএসডি করা হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে ওএসডি’র সংখ্যা ও বৈশিষ্ট্য আগের তুলনায় অনেক ভিন্ন ও প্রশ্নবিদ্ধ।
Table of Contents
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে রেকর্ড ও বিতর্ক
শুধু ওএসডি নয়, একই সঙ্গে শীর্ষ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগেও নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রশাসনের শীর্ষপদে ১৭ জন কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালন করছেন। সচিব ও সিনিয়র সচিবদের মধ্যে এই সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে অনেকে সমালোচনা করছেন। কারণ এই ব্যবস্থা নতুনদের পদোন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করছে। আবার ওএসডি থাকা কর্মকর্তা যারা কোনো দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত নন, তারাও বছরের পর বছর বসে বেতন নিচ্ছেন। এতে জনগণের অর্থ অপচয় হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
ওএসডি-র ইতিহাস ও রাজনৈতিক ব্যবহার
ওএসডি ব্যবস্থাটি ব্রিটিশ আমলে বিশেষ প্রশাসনিক কাজের জন্য চালু হয়েছিল। তবে বাংলাদেশে এটি অনেকাংশেই রাজনৈতিক ব্যবস্থার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে ভিন্নমত পোষণকারী বা সরকার-ঘেঁষা না এমন কর্মকর্তাদের ওএসডি করে রাখা হয়েছে দীর্ঘ সময়ের জন্য। অনেক কর্মকর্তা এই অবস্থায় থেকেই চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন।
এই পরিস্থিতি নিয়ে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তারা সুপারিশ করেছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কোনো কর্মকর্তাকে ওএসডি করা যাবে না। বরং অস্থায়ীভাবে তাদের প্রশিক্ষণ বা শিক্ষা কার্যক্রমে পদায়ন করার কথা বলা হয়েছে।
সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক পুনর্গঠন
২০২৫ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং পরদিন মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত হয়। ৬ আগস্ট দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয় ৮ আগস্ট। এই সরকারের অধীনে প্রশাসনে ব্যাপক পুনর্বিন্যাস ঘটে।
পূর্ববর্তী সরকারের সময় সুবিধাভোগী হিসেবে বিবেচিত অনেক আমলাকে ওএসডি করা হয় এবং অনেককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে যারা সেই সময়ে বঞ্চিত ছিলেন, তাদের মধ্যে অনেককে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে পুনঃস্থাপন করা হয়।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও প্রশাসনে ওএসডি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আরও বিস্তারিত পড়ুন।
ওএসডি কর্মকর্তাদের পরিসংখ্যান
মোট ওএসডি ৫১৬ জনের মধ্যে:
- ১২ জন সিনিয়র সচিব ও সচিব
- ২ জন গ্রেড-১ কর্মকর্তা
- ৩৩ জন অতিরিক্ত সচিব
- ৭৬ জন যুগ্ম সচিব
- ১৩৬ জন উপসচিব
- ১৫৫ জন সিনিয়র সহকারী সচিব
- ৯৪ জন সহকারী সচিব
- ৮ জন সিনিয়র সহকারী প্রধান
এই সংখ্যাগুলি সরকারি অর্থ ও জনশক্তির অপচয়ের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ওএসডি ব্যবস্থা
বিশ্বের অন্যান্য দেশে ওএসডি-এর মত কোনো ব্যবস্থা নেই। ইউরোপ, আমেরিকা বা জাপানের মত দেশে প্রশাসনিক কাঠামোতে এমন নিষ্ক্রিয়তা কখনো দেখা যায় না। বাংলাদেশে ওএসডি পদের স্থায়িত্ব এবং অকার্যকর অবস্থান প্রশাসনের কাঠামোকে দুর্বল করে তোলে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, হাইকোর্ট সম্প্রতি নির্দেশ দিয়েছে যে কোনো কর্মকর্তাকে ১৫০ দিনের বেশি সময় ওএসডি করে রাখা যাবে না। এই নির্দেশনার ভিত্তিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে একটি কমিটি গঠনের আদেশও দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ মতামত ও সুপারিশ
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেছেন, অতিরিক্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে প্রশাসনের নিচ থেকে ওপরে উঠতে চাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ওএসডিতে যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, তাদের আবার কাজে ফিরিয়ে আনা উচিত।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, ২৫ বছর চাকরির পর বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার বিধানটি বাতিল করার কথা বলা হয়েছে।
বর্তমানে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থায় যে অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি হয়েছে, তা বাংলাদেশের প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনের স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং নৈতিকতার উন্নয়নের জন্য এই ব্যবস্থাগুলিকে পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। ওএসডি ব্যবস্থার অপব্যবহার বন্ধ করে, দক্ষ কর্মকর্তাদের কাজে লাগানো এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সীমিত করার পদক্ষেপ নিতে হবে।
FAQ: বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি
- ওএসডি কী?
ওএসডি মানে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, যাকে কোনো কাজ ছাড়াই প্রশাসনে রাখা হয়। - কতজন কর্মকর্তা বর্তমানে ওএসডি?
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৫১৬ জন কর্মকর্তা ওএসডি আছেন। - চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কেন বিতর্কিত?
এই নিয়োগগুলো পদোন্নতির পথ রোধ করে এবং প্রশাসনে পক্ষপাতিত্ব সৃষ্টি করে। - ওএসডি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কী করা উচিত?
যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন, তাদের পুনরায় কাজে লাগানো উচিত। - এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী করা উচিত?
হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদী ওএসডি বন্ধ এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পদায়ন জরুরি।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।