ভারতীয় নারীর কারণেই এই হত্যাকাণ্ড

ভারতীয় এক নারীর সঙ্গে পরকীয়ার জেরেই খুন হয়েছেন মাহমুদা খানম মিতু। তাকে খুনের মাস্টারমাইন্ড তার স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আকতার।

পরকীয়ার বিষয়টি জেনে ফেলার পর বাবুলের সঙ্গে দাম্পত্য কলহ শুরু হয় মিতুর। এক পর্যায়ে মিতুকে সরিয়ে ফেলতে হত্যার ছক আঁকেন বাবুল। তিন লাখ টাকায় খুনি ভাড়া করে এ হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করেন।

হত্যাকাণ্ডের ৫ বছর পর তদন্তকারী সংস্থা পিবিআইয়ের তদন্তে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

চট্টগ্রাম নগরীর জিইসির মোড়ে ৫ বছর আগের সেই হত্যাকাণ্ডের মামলার এখন প্রধান আসামি বাবুল আকতার।

অথচ স্ত্রী হত্যাকাণ্ডে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় প্রথমে তিনিই মামলা করেছিলেন।

হত্যার ঘটনায় সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা রয়েছে দাবি করে পিবিআই বলছে, গায়েত্রী অমর সিং নামের এক ভারতীয় নারীর সঙ্গে পরকীয়াকে কেন্দ্র করেই বাবুল ও মিতুর মধ্যে দাম্পত্য কলহ তৈরি হয়। এরপর তিন লাখ টাকায় খুনি ভাড়া করে স্ত্রীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেন বাবুল।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গায়েত্রী একজন এনজিও কর্মী। ২০১৩ সালে তিনি কক্সবাজারে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা-ইউএনএইচসিআর-এ কাজ করতেন। তখনই তার সঙ্গে বাবুল আক্তারের সম্পর্ক হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কক্সবাজার জেলায় চাকরি করার সময় তার সঙ্গে গায়েত্রীর দেখা হয়। সেখানে তাদের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারা কক্সবাজারের মারমেইড বিচ রিসোর্টে একান্ত সময় কাটিয়েছেন বলেও পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।

বাবুলকে পাঠানো ২৯টি মোবাইল মেসেজ ও উপহার দেওয়া তিনটি বইয়ে বিষয়টি অনেকটা খোলাশা হয়েছে।

বাবুলকে পাঠানো ‘তালিবান’ নামক একটি বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় গায়েত্রী তাদের প্রথম দেখা, প্রথম একসঙ্গে কাজ করা, প্রথম কাছে আসা, মারমেইড হোটেলে ঘোরাফেরা, রামু মন্দিরে প্রার্থনা, রামুর রাবার বাগানে ঘোরাফেরা এবং চকরিয়ায় রাতে সমুদ্রের পাশ দিয়ে হাঁটা ইত্যাদি স্মৃতির কথা উল্লেখ করেছিলেন।

গায়ত্রী বর্তমানে সুইজারল্যান্ড অথবা পূর্ব আফ্রিকার কোনো দেশে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা-ইউএনএইচসিআরের প্রটেকশন অফিসার হিসেবে কর্মরত। ব্যক্তিগত জীবনে গায়ত্রী বিবাহিত এবং তার একটি ছেলে রয়েছে।

মিতু হত্যাকাণ্ড ঘটনায় বুধবার ৫৭৫ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয় পিবিআই। প্রতিবেদনে পিবিআই বলছে, মিতু হত্যা ছিল কন্ট্রাক্ট কিলিং। বাবুল আক্তারের পরিকল্পনায় এটি সংঘটিত হয়। মিতুকে হত্যার জন্য তিন লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে।

এ ঘটনায় মঙ্গলবার সাক্ষ্য আইনে চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শফীউদ্দিনের আদালতে জবানবন্দি দেন বাবুল আকতারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক অংশীদার সাইফুল হক। তিনি জানিয়েছেন, মিতু হত্যার ৩ দিন পর তিনি বাবুলের নির্দেশে গাজী আল মামুনের মাধ্যমে মো. কামরুল ইসলাম শিকদার মুসাকে তিন লাখ টাকা দেন। গাজী আল মামুন সেই মুসার আত্মীয়। মামুনও জবানবন্দি দিয়ে টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিবিআই চট্টগ্রামের এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিকাশের মাধ্যমে এই টাকা লেনদেন হয়েছে। টাকা লেনদেনের স্লিপ আমাদের হাতে এসেঝে। এর বাইরে যাদের মাধ্যমে টাকাগুলো লেনদেন করা হয় তারাও স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

বিকাশের মাধ্যমে এই টাকা লেনদেন হয়েছে বলে দাবি করেছেন পিবিআই এক কর্মকর্তা।

পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বুধবার বলেন, বাবুল আক্তার শুরু থেকে তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিলেন। হত্যাকাণ্ডের কিছু দিন আগে জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে আহত হওয়ার কথা বলেছিলেন বাবুল। স্ত্রী নিহতের পর বাবুল আপনজন হারানোর মতোই আচরণ করেছেন। কিন্তু তদন্ত করতে গিয়ে তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, তার পরিকল্পনায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। নিজের সোর্স মুসাকে দিয়েই সে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

বুধবার বাবুল আকতারসহ আটজনকে আসামি করে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেছেন মিতুর তার বাবা মোশারফ হোসেন।

মামলায় বাবুল আক্তার ছাড়াও বাকি সাত আসামি হলেন- মো. কামরুল ইসলাম সিকদার ওরফে মুসা (৪০), এহতেশামুল হক ওরফে হানিফুল হক ওরফে ভোলাইয়া (৪১), মো. মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম (২৭), মো. আনোয়ার হোসেন (২৮), মো. খায়রুল ইসলম ওরফে কালু (২৮), সাইদুল ইসলাম সিকদার ওরফে শাকু (৪৫) ও শাহজাহান মিয়া (২৮)।

বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাঙ্গুনিয়া থেকে সাইদুল ইসলাম সিকদার ওরফে সাক্কু কে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব-৭।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে , মিতু হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া খুনিরা যে মোটরসাইকেল ব্যবহার করেছিল সেটা সরবরাহকারী ছিলেন এই সাক্কু। তার ছোট ভাই কামরুল ইসলাম শিকদার হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় সড়কে খুন হন বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু। খুনিরা গুলি করার পাশাপাশি ছুরিকাঘাতে তাকে হত্যা করে। ঘটনার সময় বাবুল আক্তার ঢাকায় ছিলেন।


জুমবাংলানিউজ/ জিজি