আন্তর্জাতিক প্রবাসী খবর

‘ভারত সরকার বলে দিল করোনাভাইরাস ঠেকানোর উপায়’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভারতে আয়ুষ মন্ত্রণালয় নামে একটি মন্ত্রণালয় আছে। এটি আয়ুর্বেদ, ইউনানি, হোমিয়োপ্যাথি, যোগব্যায়াম ইত্যাদির মন্ত্রণালয়। এরকম মন্ত্রণালয় যে কোনও সভ্য দেশে থাকতে পারে, তা আমার জানা ছিল না। আয়ুর্বেদ, ইউনানি, হোমিয়োপ্যাথি ইত্যাদিকে বিজ্ঞানের মতো মনে হলেও আসলে এগুলো সত্যিকার বিজ্ঞান নয়।

বিজ্ঞান না বলে এগুলোকে অবিজ্ঞান বা অপবিজ্ঞান বলা যায়। প্রাচীনকালে যখন শরীর, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত জ্ঞান মানুষের সীমিত ছিল, তখনও মানুষ চেষ্টা করেছে রোগের চিকিৎসা করতে। রোগজীবাণু সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের প্রথম জ্ঞানলাভের আগে, এর ওষুধ আবিষ্কারের আগে আয়ুর্বেদ এসেছে দুনিয়ায়। এই প্রাচীন আয়ুর্বেদ পদ্ধতি কী করে জীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, যদি জীবাণু সম্পর্কে জ্ঞানই না থাকে, কী করে রোগ নির্ণয় করবে যদি আধুনিক বিজ্ঞানকে না ব্যবহার করে।

চিকিৎসাই বা কী দিয়ে করবে যদি জীবাণুনাশক বলতে কিছু না থাকে তাদের! যোগব্যায়ামও নাকি কত রকম রোগ সারায়, আসলে কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, ভুল। ইউনানি সম্পর্কে না হয় না-ই বললাম, এটিও অপবিজ্ঞান। হোমিয়োপ্যাথির ওপর অনেকের বিশ্বাস। প্লাকেবো ইফেক্ট ছাড়া, এর খুব বেশি কিছু ক্ষমতা আছে বলে বেশির ভাগ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানী মনে করেন না।

তাছাড়া এত বেশি জলে গুললে ওষুধের ধারও কমে যায়। কী করে কোথায় গিয়ে কী কাজ করবে সে ওষুধ! প্রাচীনকালে কোনও কিছু আবিষ্কার হলে, সেটিকে জাতীয় গৌরবের বিষয় করাটা যুক্তিসংগত। কিন্তু যে বিজ্ঞানকে প্রাচীনকালে মানুষ বিশ্বাস করতো, সেটিকে আধুনিক যুগেও বিশ্বাস করতে হবে, তাহলেই দেশপ্রেম বজায় থাকবে, তা না হলে থাকবে না- এ বড়ই অযৌক্তিক আবদার।

চিকিৎসাবিজ্ঞান আগের চেয়ে এখন অনেক উন্নত, অনেক অগ্রসর। আগের ভুলত্রুটি সংশোধন করা হয়েছে। কে না জানে যে নতুনকেই গ্রহণ করতে হয়, পুরনোকে জাদুঘরে রেখে দিতে হয়। আমরা একসময় গরুর গাড়িতে চলাফেরা করতাম, এখন মোটরগাড়িতে করি। গরুরগাড়ি আমাদের ঐতিহ্য হতে পারে, কিন্তু গরুরগাড়ি না চড়ে আমরা দ্রুতগতির মোটরগাড়িকেই বেছে নিই চলাফেরার জন্য। গরুরগাড়িকে ঐতিহ্যের বা দিশি কৃষ্টির জাদুঘরে রেখে দিই।

পুরনোকে আঁকড়ে ধরে যারা বাঁচতে চায়, তারা সম্ভব হলে প্রস্তরযুগকেও ধরে বাঁচতে চাইত। আমি বলছি না পুরনো যা কিছুই আছে, সব ব্যবহারের অযোগ্য, তা কিন্তু নয়। পুরনো অনেক মূল্যবোধ আজকের অনেক মূল্যবোধের চেয়ে উন্নত। দর্শনের বেলায় পুরনোরও দাম আছে। কিন্তু বিজ্ঞানবিষয়ক অজ্ঞতাকে আমরা দিন দিন কাটিয়ে উঠেছি, আমরা তো অজ্ঞতাকে আঁকড়ে ধরলে বাঁচব না।

বিশ্বব্রহ্মা- সম্পর্কেও প্রচুর ভুল তত্ত্ব এবং তথ্য প্রাচীনকালে ছিল, সেগুলোকে ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আমরা বাতিল করেছি। আজ বিজ্ঞানের যে আবিষ্কারটি সবচেয়ে নতুন, তা একসময় ভুলও প্রমাণিত হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বেলায়ও তাই হচ্ছে। চিকিৎসা উন্নত হচ্ছে দিন দিন। আগে যে রোগের কোনও চিকিৎসা ছিল না, মানুষ মারা যেত যেসব রোগে -সেসব রোগের চিকিৎসা করে মানুষ দিব্যি এখন বেঁচে থাকছে। আমরা এমন সব যন্ত্র আবিষ্কার করেছি, যে যন্ত্র রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করে, চিকিৎসায় সাহায্য করে। এসব যন্ত্র সম্পর্কে প্রাচীনকালের বিজ্ঞানীদের অবশ্যই কোনও ধারণা ছিল না।

আমার আজকের বিষয় প্রাচীন এবং আধুনিক চিকিৎসার পার্থক্য নিয়ে নয়, আয়ুষ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি নিয়ে। ভারতের কেন্দ্রীয় আয়ুষ মন্ত্রণালয় থেকে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, আয়ুর্বেদ, হোমিয়োপ্যাথি ও ইউনানি চিকিৎসা দিয়ে নাকি করোনাভাইরাস সংক্রমণ ‘প্রতিহত করা যাবে’। কেবল ঘোষণাই নয়, চিকিৎসাও বলে দেওয়া হয়েছে- খালি পেটে তিন দিন একটি বিশেষ হোমিয়োপ্যাথি ওষুধ, বা ছ’টি উপাদান-সমন্বিত একটি আয়ুর্বেদিক তরল, কিংবা তিনটি ভেষজে সমৃদ্ধ বিশেষ ইউনানি মিশ্রণ। যে ভাইরাসের দাপটে চীনে ১১১০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, সমগ্র বিশ্ব উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত, তার সমাধান কি এতই সহজ?

কোন ওষুধে কী রোগ সারবে তা সরকারি কোনও মন্ত্রণালয় বলে দিতে পারে না। বলে দিলে সাধারণ মানুষের প্রভাবিত হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। সরকারি মন্ত্রণালয় দেশজ বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থাকেই ভয়ঙ্কর করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক হিসেবে বিচার করছে। এ কি আদৌ গ্রহণযোগ্য? একজন চিকিৎসক হিসেবে বলছি, এ গ্রহণযোগ্য নয়।

দেশজ বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থা যুগ যুগ ধরে এই উপমহাদেশে চলছে। এতে লক্ষ কোটি মানুষের আস্থা। কিন্তু তাই বলে দায়িত্বশীল মন্ত্রণালয় তো বলে দিতে পারে না যে ওই দেশীয় বিকল্প ব্যবস্থাই মড়ক ঠেকাতে পারে। এ অবশ্য নতুন কিছু নয়। রাজনীতিকরা, চিরকালই অবিজ্ঞান বা অপবিজ্ঞানের পক্ষপাতী। পুরাণকে তাঁরা বিনা দ্বিধায় সত্য কাহিনী বলে বিচার করেন।

রাজনীতিকরা বিজ্ঞানের কোন তত্ত্বটি পুরাণের কোন কালে প্রমাণিত, তা নিয়ে হৈচৈ করেন। বিজ্ঞানের পরিবর্তে তাঁরা অপবিজ্ঞান বা অ-বিজ্ঞান নিয়েই উৎসব করেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে যে ওষুধ-বিধানটি দেওয়া হয়েছে, সেটি যত তাড়াতাড়ি ক্ষমা চেয়ে সরিয়ে নেওয়া যায়, ততই মঙ্গল।

ভাইরাসের কোনও ভ্যাক্সিন আজও আবিষ্কার হয়নি। চেষ্টা চলছে আবিষ্কারের। ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের আগে জানিনা কত মানুষকে প্রাণ দিতে হবে। চীন যেভাবে মড়ক ঠেকাতে উঠে পড়ে লেগেছে, সেভাবে কিছু করা এই উপমহাদেশে সম্ভবত সম্ভব হতো না। এখানে এখনও অজ্ঞতা থিকথিক করছে। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ রোধ করতে যেভাবে সুস্থ এবং অসুস্থকে পৃথক করতে হয়, তা-ই কতটুকু করা যেত, আমার সংশয় হয়।

এখনও বিজ্ঞানের আলো পৌঁছোয়নি শত শত গ্রামেগঞ্জে। সেসব অঞ্চলে মানুষ এখনও রোগ সারাতে পীরের পড়া পানি, এখনও ওঝার ঝাড়ফুঁক, এখনও কবিরাজি, হাতুড়ে ডাক্তারের ওপর নির্ভর করে। কোথায় আমরা ওই অপবিজ্ঞানের গ্রাস থেকে বাঁচিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা দেবো, এবং এতে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করবে সরকার, সরকারি প্রচারযন্ত্র, তা নয়, উলটো হচ্ছে। সরকারই কিনা অপবিজ্ঞান প্রচার করছে।

গণতন্ত্রকে মানুষের মঙ্গলের জন্য না খাটিয়ে অমঙ্গলের জন্য খাটানো অবশ্য নতুন কিছু নয়। অধিকাংশ লোক মূর্খ এবং ধর্মান্ধ বলে নিশ্চিন্তে তারা যেন মূর্খতার এবং ধর্মান্ধতার চর্চা করে যেতে পারে, সেই ব্যবস্থা সরকার করে দেয়। অথচ সরকারের উচিত মূর্খতা, ধর্মান্ধতা দূর করা। মানুষ অপবিজ্ঞান নিয়ে মেতে আছে বলে সরকারের কি উচিত নয় অপবিজ্ঞানের ভয়াবহতা থেকে মানুষকে উদ্ধার করা, বিজ্ঞানের ব্যবহার শেখানো?

কোথায় সরকার শিক্ষা দেবে কী করে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে, কী করে মাস্ক পরতে হবে, স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুতে হবে, কারো জ্বর বা কাশি হলে হাসপাতালে পাঠাতে হবে- তা নয়, সরকার পক্ষ থেকে বরং অবিজ্ঞানের দাওয়াই লিখে দেওয়া হলো। অন্ধকারের লোকদের আরও বেশি অন্ধকারে পাঠানো হলো। এ শুধু ভারতেই ঘটছে না।

বাংলাদেশই বা কী করছে জনগণকে অজ্ঞতা, মূর্খতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কারাচ্ছন্নতা থেকে বের করে আনার জন্য? কিছুই না। যেহেতু অধিকাংশ মানুষ অন্ধকারেই আচ্ছন্ন হয়ে আছে, অন্ধকারকেই আলো ভাবছে, তাই সরকার পক্ষ অন্ধকারকেই প্রেস্ক্রাইব করছে। বিজ্ঞানের আলো তাই ঘরে ঘরে পৌঁছোচ্ছে না।

আমার খুব সন্দেহ হয় আয়ুষ মন্ত্রণালয়ে যাঁরা কর্মকর্তা, অসুখ বিসুখ হলে কি তাঁরা ইউনানি কবিরাজি আয়ুর্বেদী ওষুধ খাবেন নাকি বড় হাসপাতালের বড় ডাক্তারের কাছে যাবেন? ঘটে বুদ্ধি থাকলে নিশ্চয়ই আধুনিক চিকিৎসা নেবেন, প্রাচীন চিকিৎসা নেবেন না। রাজনীতিকদের ঘটে বুদ্ধি ঠিকই আছে, নিজের জন্য যা করেন, তা জনতার জন্য করতে চান না। কারণ অন্ধকারের লোকদের অন্ধকারে রেখে দেওয়া আলোয় আনার চেয়ে সহজ। সহজ কাজটিই তাঁরা করেন। এবং বাহবা পান। বদল ঘটাতে সকলেই চান না, এতে পরিশ্রম কিনা। লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।

যাদের বাচ্চা আছে, এই এক গেইমে আপনার বাচ্চার লেখাপড়া শুরু এবং শেষ হবে খারাপ গেইমের প্রতি আসক্তিও। ডাউনলোডকরুন : http://bit.ly/2FQWuTP




জুমবাংলানিউজ/এসআই


আপনি আরও যা পড়তে পারেন


rocket

সর্বশেষ সংবাদ