স্বপ্না চক্রবর্তী : গ্যাস্ট্রিকের চিকিৎসায় জনপ্রিয় ওষুধের একটি হচ্ছে হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালের তৈরি সার্জেল ক্যাপসুলটি। ঠিক একইভাবে জনপ্রিয় স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালের তৈরি সেকলোও। শারীরিক নানা জটিলতায় জনপ্রিয় ফিনিক্স, লোসেকটিল, প্যানটনিক্স বা ইটোরিক্সও। কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকায় সামান্য শারীরিক সমস্যায়ও মানুষ মুড়ি-মুড়কির মতো এসব ওষুধ সেবন করছে। কিন্তু যদি শুনে এসবের বেশিরভাগ ওষুধই বাজারে নকল তৈরি করে বিক্রি করছে একটি গোষ্ঠী! সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক অভিযানে ৯৮ হাজার পিস সার্জেল ২০এমজি, ৩৯ হাজার ৬শ’ পিস সেকলো ২০এমজি, ১ লাখ ১৬ হাজার ৬২০ পিস ফিনিক্স ২০এমজি, ৩৯ হাজার ৭২০ পিস লোসেকটিল ২০এমজি, ২৮ হাজার ৪২০ পিস প্যানটোনিক্স ২০এমজি, ৬ হাজার পিস ইটোরিক্সের নকল ওষুধ জব্দ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ৯১৪ বক্স নকল ওষুধ জব্দ করা হয়। যার বাজার মূল্য প্রায় ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৭৬০ টাকা।
নকল ওষুধ জব্দ

Advertisement

এসব ওষুধের বেশিরভাগই আটা-ময়দার মিশ্রণে তৈরি অদ্ভুত এক দলা যার কোনো ঔষধি গুণ তো নেইই বরং এগুলো সেবনে শারীরিক নানা জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জব্দকৃত এসব ওষুধের বাইরেও প্রতিদিনই ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অভিযানে জব্দ হচ্ছে হাজার হাজার জীবন রক্ষাকারী নকল ওষুধ। যেগুলোর সেবন জীবন রক্ষাকারী না হয়ে জীবন ধ্বংসকারীও হতে পারে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। এসব নকল ওষুধ চেনা সাধারণ মানুষের পক্ষে তো অসম্ভবই খোদ ঔষধ প্রশাসনকেও বেগ পেতে হয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এমন অবস্থায় দেশে উৎপাদিত সব ওষুধের একটি করে সিরিয়াল নাম্বার তথা ইউনিট নাম্বার দেয়ার কাজ চলছে বলে জানা গেছে। তবে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, দক্ষ জনশক্তির অভাবে ঠিক কতদিন লাগতে পারে এই কাজ সম্পন্ন করতে তা জানে না কেউ।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)’র গোয়েন্দা মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, গত এক বছরে নকল ওষুধ তৈরি এবং বিক্রির অভিযোগ ১৫টি মামলায় আমরা ৩০ জনেক গ্রেপ্তার করেছি। এর মধ্যে ৬টি বহুল প্রচলিত ওষুধ এবং ৫টি নামি দামি কোম্পানির ওষুধ রয়েছে। এসব আসামির প্রায় সবাই ২ থেকে ৩ বছর ধরে নকল ওষুধের কারবার করে আসছে। ফলে চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা কমে যাচ্ছে। শুধু নামি দামি ওষুধের কোম্পানির নয় বরং নাম সর্বস্ব ইউনানি কোম্পানিগুলোও এ নকল ওষুধের কারবারে জড়িয়ে পড়ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে প্রায় ৮০টি সন্দেহজনক ইউনানি কোম্পানির ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসনকে ডিবি তথ্য দিয়েছে।

বিক্রয় হচ্ছে নিষিদ্ধ ওষুধও ॥ শুধু নকল বা ভেজাল ওষুধই নয় রাজধানীতে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে বিক্রয় নিষিদ্ধ ওষুধও। এগুলোর বিরুদ্ধে নানা সময় অভিযান চললেও তা খুবই সীমিত। বুধবারও এরকম একটি অভিযানে রাজধানীর চকবাজার এলাকা থেকে ১০ লাখ টাকা মূল্যের ৪ লাখ ৯২ হাজার ২৫৩টি বিক্রয় নিষিদ্ধ বিদেশী ওষুধসহ সজল বর্মণ (২৮) নামের এক কালোবাজারিকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এদিন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে র‌্যাব-১০ এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, মঙ্গলবার র‌্যাব-১০ এর একটি দল রাজধানীর চকবাজার মডেল থানাধীন ইমামগঞ্জ এলাকায় একটি অভিযান চালায়।

অভিযানে আনুমানিক ১০ লাখ টাকা মূল্যের ৪ লাখ ৯২ হাজার ২৫৩টি বিক্রয় নিষিদ্ধ বিদেশী ওষুধসহ কালোবাজারি চক্রের সদস্য সজল বর্মণ (২৮) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গ্রেপ্তার ব্যক্তি পেশাদার ওষুধ কালোবাজারি চক্রের সক্রিয় সদস্য। তিনি বেশ কিছুদিন ধরে অবৈধভাবে বিক্রয় নিষিদ্ধ বিভিন্ন বিদেশী কোম্পানির ওষুধ কালোবাজারি ও চোরাচালানের মাধ্যমে সংগ্রহ করে চকবাজারসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন ওষুধের দোকানে সরবরাহ করে আসছিলেন।

এরও আগে চলতি বছরের জুন মাসে এযাবৎকালের সবচেয়ে বেশি নকল ওষুধ জব্দ করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় এ অবৈধ কারবারের সঙ্গে জড়িত চক্রের ১০ সদস্যকে। জব্দ করা সামগ্রীর মধ্যে ছিল দেশী-বিদেশী নামি কোম্পানির মোড়কে বিভিন্ন নকল ওষুধ।
আটা ময়দায় তৈরি হয় নকল ওষুধ ॥ পুলিশ জানিয়েছে, এসব নকল ওষুধ তৈরি করা হতো আটা, ময়দা ও বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে। জনপ্রিয় ও বহুল প্রচলিত বেশকিছু ওষুধ নকল করে বাজারজাত করত চক্রটি। কুমিল্লার কাপ্তান বাজারের একটি ইউনানি ওষুধ কারখানায় এসব নকল ওষুধ তৈরি করে গুদামজাত করা হতো ঢাকার সাভারে। সেখান থেকে বিপণনের জন্য নেওয়া হতো রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায়। তবে দেশের সর্ববৃহৎ ওষুধ বিপণন কেন্দ্র মিটফোর্ড এলাকায় ওষুধ বাজার নকল, ভেজাল, মানহীন ওষুধের কেন্দ্র হয়ে উঠলেও এখানে কোনো নকল ওষুধ তৈরির কারখানা পাওয়া যায়নি জানিয়ে মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, যদি মিটফোর্ড এলাকায় কারখানাগুলো থাকত তাহলে বরং আমাদের জন্য সুবিধা হতো। কিন্তু এই এলাকায় ভেজাল ওষুধ বিক্রি হয় ঠিকই। কিন্তু কোনো কারখানা নেই।

সাম্প্রতিক অভিযানে আমরা কুমিল্লার যে আসামিকে গ্রেপ্তার করেছি তার নাম মো. ইকবাল হোসেন। তিনি নীলফামারীর সৈয়দপুরের একজনের নাম এবং ফোন নাম্বার দিয়েছে। কিন্তু গ্রেপ্তারের খবর পাওয়ার পর থেকেই ওই নাম্বারটি আমরা বন্ধ পাচ্ছি। তবে আমাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। শুধু এই একটি অভিযানই নয় বরং মানুষের জীবন রক্ষাকারী নকল ওষুধ তৈরি এবং বাজারজাত যারাই করছে তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিয়ে আসাই আমাদের লক্ষ্য।

চলছে অভিযানও ॥ এসব ভেজাল-নকল এবং মানহীন ওষুধের বাজারজাত বন্ধে প্রতিদিনই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বলে জানান ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ।

তিনি বলেন, দেখেন এটা একটা কঠিন সিন্ডিকেট। আমরা প্রতিদিনই রাজধানীর কোনো না কোনো জায়গায় অভিযান পরিচালনা করি। প্রতিদিনই নকল ওষুধ না পেলেও মানহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ, সরকারি ওষুধ আমরা জব্দ করছি। কিন্তু ভেজাল ওষুধ শনাক্ত করা আসলেই একটু কঠিন। তিনি বলেন, এগুলো প্যাকেজিং একটি বিশেষ পদ্ধতিতে করা হয়। তাই সাধারণ মানুষের পক্ষে খালি চোখে আসল ওষুধের সঙ্গে এর পার্থক্য বের করা প্রায় অসম্ভব। আমাদের যেগুলোতে সন্দেহ হয় প্রাথমিকভাবে জব্দ করে আমাদের মিনি ল্যাব রয়েছে সেখানে পরীক্ষা করি। সেখানেই পাওয়া যায় আটা-ময়দার দলা পাকানো একটা কিছু। যেগুলোতে ওষুধের ন্যূনতম উপাদানও নেই। যা খেলে মানুষের শরীর সুস্থ হওয়া দূরে থাক বরং খারাপ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

এই ভেজাল বা নকল ওষুধ বাজারজাত বন্ধের উপায় কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা অনেক দিন থেকেই চাচ্ছি প্রত্যেকটি ওষুধের একটি ইউনিট নাম্বার বা সিরিয়াল নাম্বার দিতে। কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও কথা বলেছি। কিন্তু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এর অন্যতম প্রতিবন্ধক। এছাড়া আমাদের ফার্মেসি ব্যবসায়ীরাও এতটা সচেতন না। সাধারণ মানুষ তো না-ই। তবে আমরা চেষ্টা করছি যত দ্রুত সম্ভব সব ওষুধের সিরিয়াল নাম্বার তৈরির কাজটা দ্রুততম সময়ের মধ্যে করে ফেলা। আপাতত এটাই নকল ওষুধ সরবরাহ বন্ধের একমাত্র উপায়। তবে এসব ওষুধ উৎপাদনকারী কারখানাগুলোকে যদি খুঁজে বের করা যায় তাহলেও কিছুটা সমাধান হতে পারে।
শক্ত সিন্ডিকেট ॥ তবে এই প্রক্রিয়াটি এতটা সহজ নয় জানিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বিএমএ’র সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. তারেক মেহেদী পারভেজ বলেন, এসব খবর আমাদের কাছে প্রতিদিনই আসে। আমরা বিভিন্ন অভিযান পরিচালিতও হতে দেখি। কিন্তু এটি একটি কঠিন সিন্ডিকেট। বিশেষ করে মিটফোর্ড এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হতে দেখি। এসব জায়গায় অভিযান চালাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিভিন্ন বাধারও সম্মুখিন হতে হয়।

শুধু তাই নয় মিটফোর্ডের ওষুধ ব্যবসায়ীরা মার্কেট বন্ধ রেখে অবরোধও পালন করেন। এটা একটা কঠিন সিন্ডিকেট এখানে ওষুধ প্রস্তুতকারী, বিপণনকারী, ওষুধ ব্যবসায়ী যেমন জড়িত তেমনি প্রভাবশালী মহলও জড়িত। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে। ওষুধ মানুষের জীবন রক্ষা করে। এটিতেই যদি ভেজাল থাকে তাহলে মানুষ কি করবে? তাই আমাদের আহ্বান থাকবে ভেজাল বা নকল ওষুধ যাতে কোনোভাবেই বাজারজাত হতে না পারে সে বিষয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা। তিনি বলেন, আমাদের অনেক ওষুধের দোকানেরই লাইসেন্স বা অনুমোদন নেই। এ কারণে সেসব দোকানের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে নকল ও ভেজাল ওষুধ। এতে জনস্বাস্থ্য পড়ছে হুমকির মুখে।

এসব ওষুধ বিপণনের জন্য রয়েছে বিশেষ নেটওয়ার্ক। সেই নেটওয়ার্কই সব ধরনের কাজ করে থাকে। অতীতে কয়েকটি ওষুধ কোম্পানির তৈরি প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে অনেক শিশু মারা গেছে। সেসব ওষুধ খেয়ে শিশুদের কিডনি বিকল হয়ে গিয়েছিল। কাজেই দেশে নকল ও ভেজাল ওষুধের কারবারিদের নির্মূল করতে হবে যে কোনো উপায়ে। এজন্য ওষুধের বাজারে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। নকল ওষুধের সব কারখানা খুঁজে বের করতে হবে গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে। এ ধরনের ওষুধের বিক্রেতাদেরও আনতে হবে কঠোর শাস্তির আওতায়।

ভেজাল প্যারাসিটামল প্রসঙ্গ ॥ প্রসঙ্গত, ভেজাল প্যারাসিটামল সেবনে ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত কিডনি অকেজো হয়ে ৭৬ শিশুর মৃত্যু হয়। বিষয়টি সে সময় ব্যাপক আলোড়ন তোলে। সেই সময় শিশু মৃত্যুর ঘটনায় প্যারাসিটামল সিরাপ নিয়ে অভিযোগ করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা জানান, ভেজাল প্যারাসিটামল খেয়ে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। পরে তদন্ত ও ল্যাব পরীক্ষায় ধরা পড়ে, পলিক্যাম ল্যাবরেটরিজসহ পাঁচ কোম্পানির তৈরি প্যারাসিটামল সিরাপে বিষাক্ত পদার্থ ডাই-ইথিলিন গ্লাইকলের উপস্থিতি। এরপর ১৯৯৩ সালের জানুয়ারিতে পলিক্যামের পরিচালক আবদুর রবসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
কিন্তু আসামিরা হাইকোর্টে গেলে মামলার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। দীর্ঘ দিন স্থগিত থাকার পর ২০১৫ সালে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার শুরু হয়। বিচারে তাদের শাস্তিও হয়েছে। সূত্র : জনকণ্ঠ

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Saiful Islam is a journalist at Zoom Bangla News with seven years of experience in news writing and editorial work. He contributes to producing accurate, well-structured, and reader-focused content across digital platforms. His work reflects a strong commitment to editorial standards and responsible journalism.