in ,

মানুষকে যে কারণে তাড়াহুড়া থেকে বারণ করা হয়েছে

মাইমুনা আক্তার : মানুষ স্বভাবগতভাবেই তাড়াহুড়াপ্রবণ। যেকোনো কাজে তাড়াহুড়া করা মানুষের মজ্জাগত অভ্যাস। মহান আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য তাদের মধ্যে এই প্রবণতা দান করেছেন। যারা এ অভ্যাসকে কল্যাণের কাজে প্রয়োগ করবে, তারা সফল হবে, আর যারা ভুল জায়গায় প্রয়োগ করবে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সব বিষয়ে তাড়াহুড়া করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাড়াহুড়ার প্রবণতা দিয়ে। অচিরেই আমি তোমাদের দেখাব আমার নিদর্শনাবলি। সুতরাং তোমরা তাড়াহুড়া কোরো না।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৩৭)।

অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ অত্যন্ত তাড়াহুড়াপ্রবণ।’ (সুরা : আল ইসরা, আয়াত : ১১)

আলোচ্য আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে মানুষের মজ্জায় যেসব দুর্বলতা নিহিত আছে, তন্মধ্যে একটি দুর্বলতা হচ্ছে অহেতুক তাড়াহুড়াপ্রবণতা। যা মানুষকে অকল্যাণের দিকে ঠেলে দেয়, মানুষের ঈমান ও আমলকে ত্রুটিযুক্ত করে দেয়। প্রিয়নবী (সা.) অহেতুক তাড়াহুড়াকে অপছন্দ করতেন। সাহল ইবনে সাআদ আস-সায়িদি (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ধৈর্য ও স্থিরতা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে, আর তাড়াহুড়া শয়তানের পক্ষ থেকে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২০১২)

অতএব প্রতিটি মুমিনের উচিত স্থিরতা অবলম্বন করা। মহানবী (সা.) স্থীরতাকে প্রশংসনীয় গুণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, আবদুল কাইস বংশের প্রতিনিধি দলের নেতা আশাজ্জকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে এরূপ দুটি গুণ আছে, যা আল্লাহ তাআলা বেশি পছন্দ করেন—সহিষ্ণুতা ও স্থিরতা।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২০১১)

স্থিরতার মানে হলো, মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা। যা প্রিয় নবী (সা.)-এর আরেকটি হাদিস দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায়। আবদুল্লাহ ইবনে সারজিস আল-মুজানি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘উত্তম আচরণ, দৃঢ়তা-স্থিরতা ও মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে নবুয়তের চব্বিশ ভাগের এক ভাগ।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২০১০)

অতএব তাড়াহুড়া প্রত্যাহারের মানে এটা ভাবা যাবে না যে সব বিষয়ে উদাসীন হয়ে উঠতে হবে। মহান আল্লাহর ইবাদত, বান্দার হক আদায় করার ব্যাপারে গুরুত্বহীন হয়ে উঠবে; বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সদা তৎপর থাকা মুমিনের কাজ। যেমন—মুসা (আ.) মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় তাঁর সঙ্গীদের আগেই খুব দ্রুত গতিতে তুর পাহাড়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি বলেন, তারা তো আমার পেছনেই আছে। আর হে আমার রব, আমি তাড়াতাড়ি আপনার কাছে এলাম, আপনি সন্তুষ্ট হবেন এ জন্য।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ৮৪)

যে কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যায়, ক্ষমাপ্রাপ্ত হওয়া যায়, সে কাজে বিলম্ব উচিত নয়; বরং মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সে কাজে গুরুত্বসহকারে আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতিতে তাড়াতাড়ি আত্মনিয়োগ করার আদেশ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা তীব্র গতিতে চলো নিজেদের রবের ক্ষমার দিকে এবং সে জান্নাতের দিকে, যার বিস্তৃতি আসমানসমূহ ও জমিনের সমান, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্য।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৩)

এ আয়াতে ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে প্রতিযোগিতামূলকভাবে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে ক্ষমার অর্থ আল্লাহর কাছে সরাসরি ক্ষমা চাওয়া হতে পারে। তবে বেশির ভাগ মুফাসসিরের মতে, এখানে এমন সব সৎকর্ম উদ্দেশ্য, যা আল্লাহ তাআলার ক্ষমা লাভ করার কারণ হয়।

কল্যাণের পথে প্রতিযোগিতা করা অহেতুক তাড়াহুড়ার পর্যায়ে পড়ে না; বরং তা একটি প্রশংসনীয় গুণ, যা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সাহায্য করে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে মুমিন বান্দাদের প্রশংসা করতে গিয়ে তাদের যে গুণগুলো উল্লেখ করেছেন, তন্মধ্যে অন্যতম হলো, কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতা করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা আল্লাহ এবং শেষ দিনে ঈমান আনে, সৎকাজের নির্দেশ দেয়, অসৎকাজে নিষেধ করে এবং তারা কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতা করে। আর তারাই পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১১৪)

সূত্র : কালেরকণ্ঠ।