in

মামলাজট এবং কিছু পর্যবেক্ষণ

ফাইল ছবি

জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম: বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ক্রমেই সুস্পষ্ট হচ্ছে। অনেক রাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে আর্থসামাজিক সূচকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক একটি গোলটেবিল উপস্থাপন করে দেখিয়েছে, দেশের ১২টি সূচকের মধ্যে ১০টিতেই দক্ষিণ এশিয়া এবং অন্য নিম্ন আয়ের দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে বাংলাদেশ। এই অর্জনে বাঙালি জাতি গর্বিত এবং আশাবাদী এই ভেবে যে, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ নিজের সক্ষমতার পরিচয় তুলে ধরবে আরও শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য গতিতে।

নাগরিক হিসেবে দেশ নিয়ে যে আশার আলো আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেই আলোতে প্রত্যেক নাগরিককে আলোকিত করাই এখন আমাদের প্রধান দায়িত্ব। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে বাস্তব রূপ দিতে হলে আর্থসামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

বিশ্বের প্রতিটি দেশেই প্রচলিত আইনের প্রতি নাগরিকদের শ্রদ্ধাশীল থাকার প্রবণতা রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা পেতে হলে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র প্রদত্ত সুবিধার সদ্ব্যবহার করে সামাজিক অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখাই সুনাগরিক হিসেবে আমাদের কর্তব্য। সে ক্ষেত্রে পারিবারিক সুশিক্ষা, সচেতনতা, ধর্মীয় ও নৈতিক জ্ঞান, সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ, পরিবেশের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব, দেশপ্রেম অগ্রগণ্য।

উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলোর অভাবেই সৃষ্টি হতে পারে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, যা আমাদের অর্জিত সাফল্য করে দিতে পারে ম্লান; অস্থিতিশীল করতে পারে সামাজিক নিরাপত্তাবলয়কে; অনিশ্চিত করতে পারে আইনের শাসনকে।

৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশটি জনবহুল হওয়ায় এখানে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন কিছুটা কষ্টসাধ্য। ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষাহারের এ দেশে যদিও নাগরিক সচেতনতার অভাব থাকার কথা নয়; বিভিন্ন কারণে তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। মৌলিক চাহিদার ঘাটতি, বাসস্থানের অপ্রতুলতা, নিশ্চিত কর্মের অভাব, দারিদ্র্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার সম্পর্কিত সীমিত জ্ঞান, আয়বৈষম্য, দ্রুত নগরায়ণ, নগরজীবনে উদ্ভূত নতুন চ্যালেঞ্জ, মাদকাসক্তি ইত্যাদি বিষয় নাগরিক জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। মানবিক মূল্যবোধ থেকে সরে যাচ্ছে মানুষ। স্থানীয় ক্ষমতার চর্চা সৃষ্টি করছে শ্রেণিগত বৈষম্য। মানুষ কলহ-বিবাদ, মারামারি, খুন-খারাবি, মিথ্যাচার, অন্যকে অপরাধী করে নিজ সুবিধা ভোগ করার মতো নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে ঝুঁকে পড়ছে। ফলে সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে মামলা-মোকদ্দমা, বাড়াচ্ছে আইনি জটিলতা।

একটি অপরাধ সংঘটিত হলে যথাসময়ে তা রেজিস্ট্রিভুক্ত হয় না। আবার বিলম্বে অন্তর্ভুক্ত হলেও তার তদন্ত বিঘ্নিত হয়। কারণ, স্থানীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আবার কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে এর পক্ষে-বিপক্ষে তাৎক্ষণিক সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন মন্তব্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে অনেক চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত বিলম্বিত হয়। ফলে ভিকটিম পরিবারগুলো ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়।

সংশ্নিষ্ট আইন সম্পর্কে ধারণা থাক বা না থাক; সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করতে বাধা থাকে না। ফলে তদন্ত বিঘ্নিত হওয়ার খুবই আশঙ্কা থাকে। অথচ ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে কোনো বিষয়ে জনপরিসরে যাওয়া যুক্তিসংগত নয়। তদন্তাধীন কিংবা বিচারাধীন বিষয় নিয়ে মন্তব্য, আলোচনা-সমালোচনাও অযৌক্তিক। যিনি তদন্তের দায়িত্বে থাকেন, তিনি সঠিক তদন্ত করতে বাধাপ্রাপ্ত হন। আবার সুযোগ বুঝে কিছু ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তা নিজস্ব স্বার্থের ব্যাপারে প্রলুব্ধ হয়ে পড়েন। এতে সঠিক তদন্ত বাধাগ্রস্ত এবং প্রতিবেদন দাখিল বিলম্বিত হয়। বিচারাধীন মামলার ক্ষেত্রেও এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। লাগামহীন সমালোচনার কারণেও বিচারকের বিচারকাজের গতি অনেক ক্ষেত্রে হয়ে পড়ে মন্থর।

প্রচলিত আইন অনুযায়ী অধিকাংশ মামলার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য গ্রহণ ব্যতিরেকে বিচারকাজ নিষ্পন্ন হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। তাই সাক্ষ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। শহর এলাকায় কোনো মোকদ্দমায় যে সাক্ষী মানা হয়, তার ঠিকানা যে কোনো মুহূর্তে পরিবর্তন হতে পার। মামলার বিচারকাজ বিলম্বে শুরু হলে সেই সাক্ষীকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তদন্ত কর্মকর্তার বদলির কারণেও সময়ক্ষেপণ হয়। মামলা চলাকালে বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে আদালতে আসেন না। এ ব্যাপারে মনে হয়, সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ ততটা আন্তরিক নয়। আবার বিশেষজ্ঞ বা ডাক্তারের রিপোর্ট প্রদানও বিলম্বিত হয়।

শুধু কি তাই? সাক্ষীদের প্রতি বারবার জামিন-অযোগ্য সমন জারি করা সত্ত্বেও আদালতে হাজির করা যায় না। প্রতিবেদন প্রদানকারী বিশেষজ্ঞ বা ডাক্তার আদালতে হাজির না হওয়ার কারণ সম্পর্কে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদাসীন থাকে। এ জন্য আদালত বারবার তারিখ নির্ধারণ করতে বাধ্য হন। ফলে সাক্ষীর অভাবে অনেক মারাত্মক অপরাধের অপরাধী নিস্কৃতি পেয়ে যায় এবং বিচার বিলম্বিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ফৌজদারি মামলায় মানীত সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসতে চান না জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। কারণ সাক্ষী সুরক্ষা আইন আমাদের দেশে নেই। এ ব্যাপারে কেউ চিন্তাভাবনা করেন কিনা, জানা নেই। তবে এক সময় হয়তো এ আইন এই দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন মামলাজট শতগুণে দাঁড়াবে।

যে দেশে একটি অপরাধের বিচার নিষ্পত্তি হতে ২১ বছর কিংবা তারও বেশি সময় লাগে; যে দেশে বিচারাধীন বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে লাগামহীন মন্তব্য করা হয়, সে দেশে অপরাধের সংখ্যা এবং মামলার জট কতটুকু কমবে? অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দখলে থাকা জব্দকৃত আলামত (যেমন অস্ত্র, মাদক) হলো অপরাধীর একমাত্র অপরাধ। তাতে অধিক সময় নিয়ে তদন্ত করার কিছুই থাকে না। তদন্ত কর্মকর্তা ইচ্ছা করলে ১৫-২০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেন। আইনেও তা বলা আছে।

কিন্তু দেখা যায়, কোনো কোনো মামলায় অজ্ঞাত কারণে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর পার হয়ে যায়, অথচ তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয় না। আবার বিচারাধীন অনেক মামলার ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিচারক অভিযোগ গঠন না করে কোনো পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অথবা আবেদন ছাড়াই বারবার তারিখ নির্ধারণ করেন। এতে মামলার জট বাড়তে থাকে। এ ব্যাপারগুলো রাষ্ট্রপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সর্বদা আদালতের দৃষ্টিতে নেওয়া খুবই প্রয়োজন।

আবার নিম্ন আদালতগুলো ইচ্ছা করলে অনেক ছোট বিষয় অতি সহজে নিষ্পত্তি করতে পারেন। এ জন্য প্রয়োজন তাৎক্ষণিক চিন্তা ও কর্মকৌশল প্রয়োগ। উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট রেখে আবেদনপত্র নিষ্পত্তি করে দিলে মামলাভুক্ত ব্যক্তিদের বিপুল অর্থ ব্যয় করে উচ্চ আদালতে আসতে হয় না এবং ‘ইন্টারলোকিউটারি অর্ডার’-এর কারণে মূল মামলাগুলোর ‘প্রসিডিংস’ বছরের পর বছর স্থগিত হয়ে থাকে না। তাতে অনেক দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাই দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। এ ছাড়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) মাধ্যমেও মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে বিচারক ও আইনজীবীদের অতিরিক্ত কিছু সময় ব্যয় করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্ব।

বর্তমানে উচ্চ আদালতসহ অধস্তন সব আদালতে প্রায় ৩৭ লাখ মামলা বিচারাধীন। তার মধ্যে আপিল বিভাগে প্রায় ১৫ হাজার মামলা, হাইকোর্ট বিভাগে প্রায় পাঁচ লাখ এবং অধস্তন আদালতে প্রায় ৩২ লাখ। মামলার জট কমানোর জন্য বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এরই মধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি হাইকোর্ট ডিভিশনের বেশ কিছু বেঞ্চকে পুরোনো মামলা নিষ্পত্তির জন্য অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন। পুরোনো মামলা নিষ্পত্তিতে ওই বেঞ্চগুলোর বিচারপতিরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট ছিলেন। অধস্তন আদালতের বিচারকদের মামলা নিষ্পত্তিতে আরও নিষ্ঠাবান হওয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ এর আক্রমণের ফলে মামলার জট কমানোর গতি কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

স্বাধীন-সার্বভৌম দেশটির প্রতি দেশাত্মবোধ গড়ে তুলে নিজেদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে সামাজিক ভারসাম্য তৈরি করতে পারলেই দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার সংখ্যা কমে আসবে। প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্বারা সেল গঠন করে তদারকির কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সাক্ষীদের যথাসময়ে উপস্থিতির জন্য রাষ্ট্রপক্ষকে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। নোটিশ বা সমন যথাসময়ে সঠিকভাবে জারি হচ্ছে কিনা, সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে। ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তার জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা থাকতে হব। কেননা, বাস্তবে দেখা যায়, যেসব মামলার তদন্ত অতি অল্প সময়ে শেষ হয়েছে, সে মামলাগুলোর নিষ্পত্তি অনেক অল্প সময়ে হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে সমাজ ও দেশের প্রতি সবারই দায়বদ্ধতা রয়েছে। যার যার অবস্থান থেকে যদি আমরা ধৈর্য ও সততার সঙ্গে নিজেদের সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে পারি, তবেই হয়তো এক দিন প্রত্যাশিত আগামীর দেখা মিলবে। সেই সুসময়ের অপেক্ষায় আমরা।

লেখক: বিচারপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকা

অনলাইনে খুব সহজে টাকা ইনকাম করার উপায়