‘মা-বাবা-বোনকে খুন করেছি, পুলিশ না আসলে স্বামী-মেয়েকেও মেরে ফেলবো’

জুমবাংলা ডেস্ক : রাজধানীর কদমতলী এলাকার একটি বাসা থেকে শনিবার সকালে এক দম্পতি ও তাদের এক মেয়ের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘুমের ওষুধ খাইয়ে, হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধ করে তাদের হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে দম্পতির বড় মেয়ে মেহেজাবিন ইসলাম মুনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্য, সকাল ৮টার দিকে পুলিশের জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে মুন বলেন, ‘আমি মা-বাবা ও বোনকে হত্যা করেছি। আপনারা দ্রুত না এলে আমার স্বামী ও মেয়েকে হত্যা করব।’ ফোন পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মুনকে আটক করে পুলিশ। তিনজনের লাশ উদ্ধার ছাড়াও মুনের স্বামী শফিকুল ইসলাম ও মেয়ে মারজান তাবাসসুম তৃপ্তিয়াকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। পুলিশ জানিয়েছে, এর আগে প্রথম স্বামী জামিউল ইসলাম আমিনকে হত্যার দায়ে দীর্ঘদিন জেল খাটেন মুন।

কদমতলীর মুরাদপুর হাইস্কুলের পাশে লালমিয়া সরকার রোডের ২৮ নম্বর ছয় তলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকতেন মাসুদ রানা (৫০)। তার সঙ্গে স্ত্রী জোৎস্না ইসলাম মৌসুমী (৪০) ও ছোট মেয়ে জান্নাতুলের (২০) থাকতেন। বড় মেয়ে মুনের প্রথম বিয়ে হয় ২০১৪ সালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে। বিয়ের ৬ মাসের মাথায় তার স্বামী আমিন খুন হন। আমিন খুনের অভিযোগে গ্রেফতার হন মুন, তার মা মৌসুমী, ছোট বোন জান্নাতুল ও মুনের খালা শিউলি আক্তার। কারাগারেই জন্ম হয় তার মেয়ে তৃপ্তিয়ার।

কিছুদিন পরই সবাই জামিনে ছাড়া পেলেও মুনের জামিন হয়নি। প্রায় ৫ বছর জেল খাটার পর দেড় বছর আগে জামিনে মুক্ত হন মুন। এর কিছুদিনের মধ্যেই শফিকুল ইসলামের (৩০) সঙ্গে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে স্বামীর সঙ্গে কদমতলীর বাগানবাড়িতে থাকতেন। দীর্ঘ ২৫ বছরের প্রবাস জীবন শেষে গত ৫ মাস আগে দেশে ফেরেন মাসুদ রানা।

মুনের চাচাতো বোন শিলা ইসলাম বলেন, মেহজাবিন তার পরিবারের সবাইকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল। সে তার আগের ঘরের স্বামীকেও খুন করেছে। সেই মামলায় মেহজাবিনের জেল হয়েছিল। পাঁচ বছর জেল খেটে সে জামিনে ছাড়া পায়। তিনি বলেন, গত দু’দিন আগে স্বামী সন্তানকে নিয়ে মায়ের বাসায় বেড়াতে আসে মেহজাবিন। এসেই তার ছোট বোনের জান্নাতুলের সঙ্গে তার স্বামীর পরকীয়া রয়েছে বলে বাবা-মাকে অভিযোগ করে। এ নিয়ে অনেক কথা কাটাকাটি হয়। তার জেরেই হয়তো এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

মাসুদ রানার পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন আব্দুল মতিন। তিনি বলেন, জায়গা সম্পত্তি নিয়েও পরিবারের সঙ্গে বিরোধ ছিল মেহজাবিনের। সম্পত্তি লিখে দেয়ার জন্য বাবা-মাকে অনেক চাপ দিত। এ নিয়ে এর আগে বৈঠক শালিস হয়েছে। শুক্রবার রাত ৮টার দিকেও ওই বাসায় অনেক চেঁচামেচি হয়েছে। রাত ১০টার পর ওই বাসা থেকে কোন শব্দ পাওয়া যায়নি। পরে সকালে পুলিশ আসার পর আমার হত্যাকান্ডের বিষয়টি বুঝতে পারি।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শফিকুল ইসলাম বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় সবার জন্য চা বানায় মুন। আমরা একসঙ্গে সবাই বসে সে চা খেয়েছি। এরপর আর কিছুই মনে নেই। পুলিশ বলছে, ওই বাসা থেকে ৪০টি ঘুমের ওষুধের খোসা পাওয়া গেছে। যে ওষুধ একজন সুস্থ মানুষ সর্বোচ্চ ৪ মিলিগ্রাম খেতে পারে। প্রতিটি ওষুধ ২ মিলিগ্রাম করে। সেখানে ৪০টি ওষুধ ৮০ মিলিগ্রাম ৫ জনকে খাইয়েছে মুন। অর্থাৎ একজনকে দিয়েছে ১৬ মিলিগ্রাম করে। ওভারডোজের কারণে সবাই অচেতন ছিলেন। এরপর মুন সবার হাত-পা দড়ি দিয়ে বাঁধে। কদমতলী থানার ওসি জামাল উদ্দিন মীর বলেন, হাত-পা বাঁধার পর সবাইকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে মুন। সকাল ৮টার দিকে পুলিশের জরুরী সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে সে হত্যার কথা জানায়।

পুলিশের ওয়ারী বিভাগের ডিসি শাহ ইফতেখার বলেন, পুলিশ ফোন পাওয়ার পর দ্রুত ওই বাড়িতে যায়। সেখানে তিনজনের লাশ ও দুইজনকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। শফিকুল ও তার মেয়ে তৃপ্তিয়াকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধের বিষক্রিয়ায় শিশু তৃপ্তিয়ার মুখমন্ডল সবুজ হয়ে গেছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, শফিকুল ও তৃপ্তিয়া আশঙ্কামুক্ত। কী কারণে মুন এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে সে ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তিনটি হত্যাকাণ্ডের কারণে মুন অনেকটা ভারসাম্যহীন অবস্থায় রয়েছে। তাকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা মরদেহগুলো হাত পা বাঁধা অবস্থায় পেয়েছি।

ডিসি শাহ ইফতেখার আরও বলেন, মুনের সাথে কথা বলে প্রাথমিকভাবে যেটা জানতে পেরেছি, ‘বাবা দেশে না থাকায় তার মা তাকে এবং তার ছোট বোনকে (নিহত জান্নাতুল) দিয়ে দেহ ব্যবসা করাত। এসব নিয়ে প্রতিবাদও করেছিল সে, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। তার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর ছোট বোনকে দিয়ে ব্যবসা চলছিল। এর মধ্যে তার স্বামী ছোট বোনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে।

এছাড়া মেহজাবিনের বাবা মাসুদ রানা ওমানে আরেকটি বিয়ে করেছেন। এসব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ থেকে পরিবারের সবাইকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে মেহজাবিন পুলিশকে জানিয়েছেন।’ তবে মেহজাবিনের একার পক্ষে এই ঘটনা ঘটানো কতটুকু সম্ভব, এনিয়ে পুলিশের মধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কদমতলী থানার ওসি জামাল উদ্দিন মীর বলেন, মেহজাবিনের স্বামীকেও আমরা সন্দেহের বাইরে রাখছি না। তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সম্পত্তির বিষয়ও এখানে রয়েছে। তদন্তে এসব আসবে।


জুমবাংলানিউজ/এসআর