ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচিত হলে যেকোনো মূল্যে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরার ঘোষণা দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশের জনগণ পাশে থাকলে কঠোর হস্তে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। যাতে দেশের সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ নির্বিঘ্নে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। বিএনপি চেয়ারম্যান সবার জানমালের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, জলাবদ্ধতা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং চট্টগ্রামকে সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানীতে পরিণত করাসহ তাঁর দলের নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
গতকাল দুপুরে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড মাঠে অনুষ্ঠিত বিশাল নির্বাচনি জনসভায় ‘জনরায় নিয়ে বিএনপি সরকারে গেলে’ তাদের পরবর্তী করণীয় কী হবে- সেসব পরিকল্পনার বর্ণনা দেন।
বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, অপরাধী যেই হোক, আইনের দৃষ্টিতে তার পরিচয় অপরাধী। অপরাধীর বিরুদ্ধে দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাজেই দুর্নীতি যেই করুক, দুর্নীতি যারাই করুক, তাদের বিরুদ্ধে দেশের আইন একইভাবে প্রযোজ্য হবে।
তিনি বলেন, আজকে লাখ লাখ মানুষের সামনে পরিষ্কারভাবে বলে দিতে চাই, আমরা যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি-সেসব পরিকল্পনা কেউ যদি দুর্নীতির মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত করে, তাদের কোনো ছাড় আমরা দেব না। যেকোনো মূল্যে আগামী সরকারে গেলে আমরা দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরব। এটাই আমাদের কমিটমেন্ট এ দেশের মানুষের কাছে।
জনসভায় বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকার, আসলাম চৌধুরী, এস এম ফজলুল হক ও সুকোমল বড়ুয়া।
নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর সভাপতিত্বে ও সদস্যসচিব নাজিমুর রহমানের পরিচালনায় এ জনসভায় আরও বক্তব্য দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মীর হেলাল উদ্দিন, হারুনুর রশিদ, দীপেন দেওয়ান, সহসম্পাদক ওয়াদুদ ভুইয়া, সরোয়ার জামাল নিজাম, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, আবু সুফিয়ান, গিয়াস উদ্দীন কাদের চৌধুরী, এনামুল হক এনাম, আবুল হাশেম বক্কর, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন প্রমুখ। চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের প্রার্থীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-১ নুরুল আমিন, চট্টগ্রাম-২ সরোয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম-৩ মোস্তফা কামাল পাশা, চট্টগ্রাম-৪ আসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৫ মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম-৬ গিয়াস উদ্দীন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৭ হুমাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৮ এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৯ আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম-১০ সাঈদ আল নোমান, চট্টগ্রাম-১১ আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১২ এনামুল হক, চট্টগ্রাম-১৩ সরওয়ার জামাল নিজাম, চট্টগ্রাম-১৪ জসীম উদ্দীন আহমেদ, চট্টগ্রাম-১৫ নাজমুল মোস্তফা আমীন ও চট্টগ্রাম-১৬ মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা। প্রার্থীদের প্রত্যেকের হাতে ধানের শীষ তুলে দিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন তারেক রহমান। তারেক রহমান সর্বশেষ ২০০৫ সালের ৬ মে চট্টগ্রামে আসেন। সে সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারে অংশ নিয়ে তিনি নগরীর লালদীঘি ময়দানে জনসভায় বক্তব্য রাখেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, যতই পরিকল্পনা গ্রহণ করি না কেন, যদি আমরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না করি, তাহলে আমাদের কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না। এ পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই আমাদের দুটো বিষয়ে খুব কড়াকড়িভাবে নজর দিতে হবে। কারণ এ দুটো বিষয় (দুর্নীতি ও নিরাপত্তা) বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের জনগণকে তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বিগত দিনগুলোতে বঞ্চিত করেছে। অতীতে বিএনপি এ দুটি বিষয়ে সাফল্য দেখিয়েছে মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেন, এ বিষয় দুটির একটি হচ্ছে, মানুষের নিরাপত্তা। যাতে করে মানুষ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে; ব্যবসাবাণিজ্য, চাকরিবাকরি সব করতে পারে। বিএনপি নির্বাচিত হলে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কী করবে- সে বিষয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। সেই নারীদের কর্মহীন রেখে আমরা কোনোভাবেই দেশকে প্রত্যাশিত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারব না। আমরা নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চাই। আমরা সরকার গঠনে সক্ষম হলে সব পরিবারে নারীদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। একইভাবে আমরা ধীরে ধীরে দেশের সব কৃষকের কাছে কৃষক কার্ড নামে একটি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। যে কার্ডের মাধ্যমে কৃষক এবং কৃষানি ভাইবোনের ঋণ সুবিধাসহ বিভিন্ন সুবিধা পাবে। যাতে করে আস্তে আস্তে তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে।
সমাবেশে যোগদানের আগে র্যাডিসন ব্লু বে ভিউ হোটেলের মেজবান হলে ‘ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান’ মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেন তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন। বিএনপি চেয়ারম্যান এ সময় বলেন, চট্টগ্রাম-ঢাকাসহ সব বড় শহরে জলাবদ্ধতা আছে। এ সমস্যা নিরসনে একটা কাজ করতে হবে, তা হলো খাল খনন। বৃষ্টি হলে পানি জমে যায়। পানিগুলো তো কোথাও যেতে হবে। তাই দরকার খাল খনন। সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল আমরা খনন করব।
পলোগ্রাউন্ডসহ চারপাশ লোকে লোকারণ্য : দীর্ঘ ২০ বছর পর চট্টগ্রামের কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে যোগ দিলেন তারেক রহমান। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে তিনি সমাবেশস্থলে প্রথমে অপেক্ষমাণ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেন। পরে তিনি মঞ্চে ওঠেন। তারেক রহমানের আগমনকে ঘিরে ভোর থেকে মাঠে আসতে শুরু করেন নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ। চট্টগ্রামের পাশাপাশি রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজার থেকেও আসেন নেতা-কর্মীরা। সমাবেশ শুরু আগেই পলোগ্রাউন্ডসহ চারপাশ লোকারণ্য হয়ে যায়।
ফেনীতে মেডিকেল কলেজ ও ইপিজেড স্থাপনের আশ্বাস : ফেনী থেকে সিদ্দিক আল মামুন জানান, ফেনীতে একটি মেডিকেল কলেজ ও ইপিজেড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের প্রধান বাধা দুর্নীতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে। গতকাল ফেনী পাইলট হাই স্কুল মাঠে ফেনী জেলা বিএনপি আয়োজিত নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ফেনী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহারের সভাপতিত্বে ও সদস্যসচিব শেখ ফরিদ বাহারের সঞ্চালনায় জনসভায় বক্তব্য দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও ফেনী-৩ আসনের মনোনীত প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবুল খায়ের ভূঞা, জয়নুল আবেদীন ফারুক, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।
কীভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হয় বিএনপি জানে : কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, আমরা নাকি দেশের মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছি। আমরা ধোঁকা দিতে যাব কেন? এ মানুষদের কাছে আমাদের আবারও আসতে হবে না? আমরা সরকারে ছিলাম। কীভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হয় বিএনপি জানে। অনেকেই কয়েক দিন ধরে প্রচার চালাচ্ছেন, আমরা সরকারে গেলে একসঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড দেব। আমরা কিন্তু একবারও বলিনি এ কথা। আমরা আমাদের পরিকল্পনা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করব।
গতকাল রাতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম হাইস্কুল মাঠে বিএনপির নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও কুমিল্লা-১১ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কামরুল হুদা সভাপতিত্ব করেন।
সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার ছয়টি আসনে বিএনপির প্রধান নির্বাচন সমন্বয়ক আমিন উর রশিদ ইয়াছিন, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি জাকারিয়া তাহের সুমন প্রমুখ।
এ সমাবেশ ছাড়াও গতকাল রাতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার সুয়াগাজীতে এবং দাউদকান্দির কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে দুটি সমাবেশ করেছেন।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


