in

সংশপ্তকের জন্য শ্রদ্ধাঞ্জলি

ড. বেনজীর আহমেদ: আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিন। প্রায় চার দশক ধরে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়ে যাওয়া এই মহীয়সী ১৯৪৭ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মেছিলেন। মধুমতী নদী, বাঘিয়ার বিল আর বর্ণিল বাঁওড়ের জলকল্লোলস্নাত পরিবেশে শৈশব কেটেছে তার। মাটি আর মৃত্তিকাসংলগ্ন মানুষের মধ্যে বেড়ে ওঠা। সেই কোমল মাটির মতো মানুষটিকে জাতির বৃহত্তর প্রয়োজনে কখনও কখনও কঠোর হতে হয়েছে। কোমলে-কঠোরে মিলে এক অনন্য চরিত্রে আজ তিনি জাতির স্বপ্ন ও আশার ধ্রুব নক্ষত্র।

বলা হয়ে থাকে, জওহরলাল নেহরু ছিলেন একজন ‘ভিশনারি’, আর তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন মিশনারি। বঙ্গবন্ধু ও তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে একই কথা বলা যায়।

বঙ্গবন্ধুর স্মরণশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। প্রচলিত আছে তিনি কারও নাম শুনলে সচরাচর সেই নাম ভুলতেন না। দেশের কোথায় কী হচ্ছে তা বঙ্গবন্ধুর নখদর্পণে ছিল। সব খোঁজখবর তিনি রাখতেন। এই গুণ প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে স্পষ্ট।

আমার মনে পড়ছে, ঢাকায় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের অল্প কয়েক দিন আগে আমি তখন র‌্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে একটা কাজে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে কথা প্রসঙ্গে ঢাকায় ক্যাসিনো থাকার কথা বললেন। অতঃপর জিজ্ঞেস করেন, ‘তাহলে তুমি কী করছ? তুমি এগুলো দেখছ না কেন?’ আমি বেশ অবাক হলাম। তার জ্ঞানের বাইরে যে কিছুই নেই, সেটা আরও একবার উপলব্ধি করলাম। পরে আমি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে র‌্যাবকে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালানোর নির্দেশ দিই। এর ফলে যা হলো, তা এই অঞ্চলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনন্য উদাহরণ এবং বাকিটা ইতিহাস।

এর কিছু দিন পরে র‌্যাবের ‘রেইজিং ডে’ ছিল। প্রধানমন্ত্রী সেখানে গিয়েছিলেন। ওই সময় সুন্দরবনে জলদস্যু দমন অভিযানের কারণে আমরা জানতে পারি বঙ্গোপসাগরে ছোট ছোট অনেক দ্বীপ জাগতে শুরু করেছে। তখন আমি প্রধানমন্ত্রীকে বললাম, ‘প্রধানমন্ত্রী বঙ্গোপসাগরে নতুন কিছু দ্বীপ ভেসে উঠছে। আমরা আমাদের কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য কি এ রকম একটা দ্বীপ নিতে পারি, যেখানে বিদেশি পর্যটক ও দেশের মানুষের জন্য কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করা যেতে পারে।’ তিনি তার মোবাইল ফোন খুললেন। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি মোবাইলের স্ট্ক্রিন আমার সামনে ধরে জেগে ওঠা দ্বীপগুলোর নাম ধরে বলতে লাগলেন, দ্বীপগুলোর কোনটাতে কোন ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন, সেটাও তিনি বলে দিচ্ছিলেন। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে, আগে দেশকে ভালোভাবে জানতে হবে- এই সত্যটা তার কাছ থেকে আমি সবচেয়ে বেশি জেনেছি। তার অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার ফলে উত্তরবঙ্গের দুর্ভিক্ষের শব্দকোষ থেকে আজ ‘মঙ্গা’ নামের শব্দটি চিরস্থায়ীভাবে বিলুপ্ত হয়েছে।

আমি পুলিশের মহাপরিদর্শক হওয়ার পর যখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘দেখ, পুলিশকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে হলে প্রশিক্ষণকে প্রাধান্য দিতেই হবে। তোমাদের মধ্যে র‌্যাঙ্কের পরিবর্তন হলেই মাঝে মাঝে প্রশিক্ষণ হয়। এটা কিন্তু ঠিক না। বছরব্যাপীই কিন্তু তোমাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চলমান থাকতে হবে। সকল অফিসারসহ প্রতিটি সদস্যকে প্রতি বছরই প্রশিক্ষণে থাকতে হবে, সে যে র‌্যাঙ্কেরই হোক না কেন।’

আমার আবারও চমকানোর পালা। দেখলাম, পুলিশ বাহিনীর অতি খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সম্পর্কেও তিনি বিশেষজ্ঞের মতো বলে যাচ্ছেন। প্রশিক্ষণ ছাড়া যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী এগোতে পারে না, সেটি তিনি কতটা উপলব্ধি করেন!

প্রধানমন্ত্রীর সেই পরামর্শের ধারাবাহিকতায় আমরা এ বছর ৫ সেপ্টেম্বর সকল র‌্যাঙ্কের অফিসারসহ সব সদস্যের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছি। পুলিশ বাহিনী গঠন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এটি একটি বিরল ঘটনা যে, সকল র‌্যাঙ্কের সবার জন্য প্রতি বছর নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেওয়ার যাত্রা শুরু হলো। এভাবে রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী ঈর্ষণীয় প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে আসছেন।

‘৮০-এর দশকে তৎকালীন বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিশ্বসভায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল খুবই দুর্বল। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে অনেকটা নতজানু হয়ে থাকতে হতো আমাদের। মাত্র ৭০ মিলিয়ন ডলার ঋণের জন্য ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে আমাদের তদানীন্তন অর্থমন্ত্রীদের প্যারিস কনসোর্টিয়ামের বৈঠকে দুর্বল চিত্তে হাজির হতে হতো। আজ আমাদের দেশ অন্যদের ২০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ঋণ দিচ্ছে। সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশ আজ যে উচ্চতায় উঠে এসেছে, তার পেছনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদূরপ্রসারী ও সাহসী ভূমিকা প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।

আজ পৃথিবীজুড়ে শেখ হাসিনাকে নিয়ে আলোচনা হয়। ২০১৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদর দপ্তরে তাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। নারী ও কন্যাশিশুদের শিক্ষা প্রসারে স্বীকৃতি স্মারক ‘শান্তিবৃক্ষ’ দেওয়ার সময় তার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ইউনেস্কোর প্রধান। তাকে ‘সাহসী নারী’ অভিহিত করে জাতিসংঘের এ সংস্থাটির প্রধান বলেছেন, ‘নারী ও কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বমঞ্চের জোরালো এক কণ্ঠ।’ গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সল্যুশনস নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কার’-এ ভূষিত করেছে। পুরস্কার প্রদানকালে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক এসডিএসএন-এর প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন কৌশলবিদ প্রফেসর জেফরি স্যাকস শেখ হাসিনাকে উন্নয়নশীল দেশের অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে ‘জুয়েল ইন দ্য ক্রাউন অব দ্য ডে’ হিসেবে তুলে ধরেন, যা প্রতিটি বাংলাদেশি বাঙালির জন্য অত্যন্ত গর্বের।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহাকাব্যিক অর্জন ও সাফল্যগাথা কোনো ছোট একটি প্রবন্ধে কিংবা পুস্তকে তুলে আনা অসম্ভব আস্পর্ধা। ১৯৯৬-২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি ও গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি তার সরকারের অন্যতম সাফল্য হিসেবে এখনও বিবেচিত হয়ে আসছে। দীর্ঘকাল ছিটমহলের বাসিন্দারা নাগরিকত্বহীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করে আসছিল। তিন বিঘা করিডোরে সন্ধ্যা নামার আগেই সেখানে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হতো। স্বাধীনভাবে মানুষ নিজের ঘরে ঢুকতে পারত না। ভারতের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি করে, ছিটমহলগুলোকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করে সেই কষ্টের, সেই যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়েছেন শেখ হাসিনা।

বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত ও মধ্যম আয়ের আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণে কাজ করে যাচ্ছে। এর বাইরে তার নেতৃত্বে ‘ডেলটা প্ল্য্যান’ নামের একটি একশ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা এগিয়ে চলছে। সড়ক যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিনি যে অবদান রেখেছেন তা অভাবনীয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র উড়িয়ে দিয়ে তার বজ্রকঠিন মনোবলের কারণেই আজ পদ্মা সেতু বাস্তবে রূপ নিয়েছে। মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেলের মতো মহাপ্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে তিনি যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন।

তিনি সাধারণ মানুষের অন্তরের কতটা গভীরে যেতে পেরেছেন তার প্রমাণ গফরগাঁওয়ের রিকশাচালক হাসমত আলী। হতদরিদ্র হাসমত আলী নিজের সব সঞ্চয় দিয়ে জমি কিনে তা শেখ হাসিনার নামে লিখে দিয়েছিলেন। অথচ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কোনো দিন দেখাই হয়নি।

এই রকম দেশের অগণিত হাসমত আলীর দোয়ার বরকতেই কমপক্ষে ১৯ বার হত্যাচেষ্টার হাত থেকে বেঁচে প্রধানমন্ত্রী মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। জন্মদিনের এই শুভ মুহূর্তে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে প্রাণঢালা অভিনন্দন। তার জন্য শুভাশিস- শতায়ু হোন সংশপ্তক প্রধানমন্ত্রী।

লেখক: ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, বাংলাদেশ