সময় — আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি। মুহূর্ত চলে যায়, স্মৃতি হয়ে ওঠে অতীত, আর আমরা এগিয়ে চলি ভবিষ্যতের দিকে। কিন্তু, যদি বলি আমরা সময়ের মধ্যে যাতায়াত করতে পারি — সময়ভ্রমণ সম্ভব? এই প্রশ্ন বহু দশক ধরে বিজ্ঞানীদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের আলোকে সময়ভ্রমণের ধারণা কতটা বাস্তবসম্মত? এই লেখায় আমরা এই প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করবো।
সময়ভ্রমণ বিজ্ঞান ভিত্তিক: আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব কী বলে?
সময়ভ্রমণ বিজ্ঞান ভিত্তিক চিন্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচিত তত্ত্ব হলো অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের Theory of Relativity। এই তত্ত্বের দুটি প্রধান অংশ — Special Relativity এবং General Relativity — সময় এবং স্থানের সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
Special Relativity অনুযায়ী, আলোর গতিবেগ সর্বদা ধ্রুব এবং একটি বস্তু যত বেশি গতি অর্জন করে, তত বেশি তার সময় ধীরগতিতে চলে। এর অর্থ, যদি কেউ আলোর গতি ঘেঁষে ভ্রমণ করে, তার জন্য সময় ধীরে চলে যাবে — অর্থাৎ ভবিষ্যতের দিকে সে এগিয়ে যাবে। এই ধারণাটিকেই বলা হয় “time dilation”।
অন্যদিকে, General Relativity অনুসারে, বৃহৎ ভরের বস্তু যেমন ব্ল্যাক হোল বা গ্রহ, সময়কে বাঁকিয়ে দেয়। এই তত্ত্ব বলছে, মহাকর্ষের কারণে সময়ের গতি পরিবর্তিত হতে পারে — যার মাধ্যমে সময়ভ্রমণের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
বাস্তবিক সময়ভ্রমণ: কল্পনা না বাস্তব?
অনেকেই হয়তো ভাবেন সময়ভ্রমণ শুধু সায়েন্স ফিকশন সিনেমা বা উপন্যাসে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বাস্তব বিজ্ঞান বলছে, কিছু নির্দিষ্ট শর্তে এটি সত্যিই সম্ভব হতে পারে।
নাসা বা ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ESA) গবেষণায় দেখা গেছে, মহাকাশচারীরা পৃথিবীর তুলনায় খুব সামান্য হলেও ভবিষ্যতে যাত্রা করে থাকেন। এটি হয় শুধুমাত্র উচ্চ গতি এবং মহাকর্ষীয় প্রভাবের কারণে — একে বলা হয় “twin paradox”।
বিজ্ঞানী কিপ থর্ন এবং স্টিফেন হকিং সময়ভ্রমণ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। কিপ থর্নের মতে, wormholes বা স্থান-কালের শর্টকাট হতে পারে সময়ভ্রমণের মাধ্যম। তবে এইধরনের গঠনগুলো এখন পর্যন্ত শুধু তত্ত্বেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে প্রমাণিত হয়নি।
স্টিফেন হকিং সময়ভ্রমণকে যুক্তি দিয়ে বলেন, যদি ভবিষ্যতে সময়ভ্রমণ সম্ভব হয়, তাহলে এখনও কেন কোনো ভবিষ্যতের মানুষ আমাদের সময়কালে আসেনি? এই যুক্তি যদিও জটিল, তবুও সময়ভ্রমণের সম্ভাবনার দরজাটি পুরোপুরি বন্ধ করে না।
সময়ভ্রমণ ও এর প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ
শক্তির প্রয়োজনীয়তা
সময়ভ্রমণ সম্ভব হলেও এর জন্য প্রয়োজন প্রচুর শক্তি। একটি ব্ল্যাক হোলের আশেপাশে সময়ের গতি পরিবর্তন সম্ভব হলেও সেই পরিবেশে কোনো যান বা মানুষ টিকে থাকতে পারবে না।
paradox এবং বিপরীতমুখী যুক্তি
সময়ভ্রমণ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো: যদি আপনি অতীতে ফিরে যান এবং এমন কিছু করেন যা ভবিষ্যতকে পরিবর্তন করে — তাহলে আপনি কি সত্যিই নিজেকে মুছে দেবেন? এই সমস্যা “grandfather paradox” নামে পরিচিত এবং এখনো কোনো বিজ্ঞানী এর সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি।
সময়ভ্রমণ কি আমাদের ভবিষ্যত?
কাজের বাস্তবতায় এখনো সময়ভ্রমণ অনেক দূরের ব্যাপার। তবে বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত এগিয়ে চলেছে। নতুন কণা আবিষ্কার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় মহাকাশ গবেষণা এবং পদার্থবিজ্ঞানের অজানা অধ্যায়গুলোর অনুসন্ধান — এসব কিছু একদিন সময়ভ্রমণকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।
তবে সময়ভ্রমণ বিজ্ঞান ভিত্তিক ধারণা হিসেবেই যতটা বাস্তব, বাস্তবে তা এখনো অনেক দূরে। তবুও এই ধারণা আমাদের কল্পনার সীমানা প্রসারিত করে দেয়।
জেনে রাখুন-
- সময়ভ্রমণ কী? সময়ভ্রমণ হলো এমন একটি ধারণা যেখানে মানুষ সময়ের এক অংশ থেকে অন্য অংশে ভ্রমণ করতে পারে। এটি বিশেষ পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানভিত্তিক হতে পারে।
- আলো ও সময়ভ্রমণের সম্পর্ক কী? আলোর গতিবেগ একটি নির্দিষ্ট সীমা। এর কাছাকাছি গতি অর্জন করলে সময় ধীরে চলে — এটাই হলো “time dilation”।
- ব্ল্যাক হোলের সাথে সময়ভ্রমণের সম্পর্ক? ব্ল্যাক হোলের আশেপাশে সময় বাঁকে যায়। এর ফলে তাত্ত্বিকভাবে সময়ভ্রমণ সম্ভব হতে পারে।
- wormhole কী? wormhole হলো স্থান ও সময়ের মধ্যে শর্টকাট — যা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বা এক সময় থেকে অন্য সময়ে ভ্রমণের সুযোগ দিতে পারে।
- সময়ভ্রমণ কি বাস্তবে হয়েছে? এখনো পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে কেউ সময়ভ্রমণ করেছে। তবে বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।