Advertisement

জুমবাংলা ডেস্ক: সরল বিশ্বাসে ভাড়া দিয়েছিলেন তারা। নিয়মিত ভাড়াও পেয়েছেন কিছুদিন। তবে হঠাৎ করে পাল্টে যায় ভাড়াটিয়ার চেহারা। বন্ধ হয়ে যায় ভাড়া দেওয়া। ভাড়াটিয়া নিজেই বনে যান বাড়ির মালিক। থানা-পুলিশকে ভুল বুঝিয়ে উল্টো প্রকৃত মালিকের নামেই দেন একের পর এক মামলা। আইনের অপপ্রয়োগ, মারপ্যাঁচ আর প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষুর কাছে হার মানতে বাধ্য হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। হয়রানির ভয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলা ছাড়া কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না ভাড়া দিয়ে বাস্তুহারা এসব অসহায় বাড়ির মালিক।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভদ্র ও নিরীহ প্রকৃতির বাড়ির মালিককে টার্গেট করেন আজিজুর রহমান সুমন নামের এক ব্যক্তি। ছেলেসন্তান নেই কিংবা বিদেশে থাকেন, আবার বাবা-মায়ের সঙ্গে দূরত্ব এমন বাড়ির মালিক হলে তো কথাই নেই। এক মাস কিংবা দুই মাস নয়, পুরো এক বছরের বাড়ি ভাড়ার টাকার চেক এবং চটকদার কথায় এমনভাবে বাড়ির মালিকদের মুগ্ধ করেন, পারলে বিনা পয়সায় তাকে বাড়ি ভাড়া দিয়ে দেন বাড়ির মালিকরা।

তবে বাড়িতে ওঠার কিছুদিন পরই পাল্টে যেতে থাকে তার চেহারা। প্রথমে চেক ডিজঅনার হলে আবারও মিষ্টি কথায় মুগ্ধ করেন আজিজুর রহমান সুমন। কয়েক মাস বাড়ি ভাড়া নিয়মিত পরিশোধ করার পর হঠাৎই পাল্টে যায় তার স্বরূপ। সুমনের রহস্যজনক ক্ষমতার কারণে তার হাত থেকে রক্ষা পাননি খিলক্ষেত থানার এক পুলিশ কর্মকর্তাও। যদিও পুলিশ অ্যাসল্ট মামলায় গ্রেফতার হয়ে এক মাসের মতো জেল খেটেছেন সুমন, তবু তার ক্ষমতার দাপট কমেনি একবিন্দুও।

গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার সাহেদ মিয়া এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘পুলিশের কোনো সদস্য সুমনের পক্ষে কাজ করছেন এটা সত্য নয়। পুলিশের এক কর্মকর্তাকে অ্যাসল্ট করার জন্য তাকে আমরা গ্রেফতার করেছি। এলাকায় বলে দেওয়া হয়েছে, প্রতারক সুমনকে যেন কেউ বাড়ি ভাড়া না দেন।’ বেদখলকৃত বাড়িগুলোর ব্যাপারে পুলিশ কী ব্যবস্থা নেবে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা তো আইনের বাইরে যেতে পারি না!’

জানা যায়, সুমন তার দখলকৃত বেশির ভাগ বাড়ি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছাত্রী হোস্টেল হিসেবে ভাড়া নিয়েছিলেন। কয়েকটি বাড়িকে তিনি ছাত্রী হোস্টেল বানান। ছাত্রী হোস্টেল অপেক্ষাকৃত স্পর্শকাতর হওয়ায় সেখানে চাইলেই যে-কেউ ঢুকতে পারে না। নিকুঞ্জ-২-এর ৬ নম্বর রোডের ৩ নম্বর বাড়ির মালিক ৭০ বছর বয়সী জাফর জায়েদী। তার একটাই ছেলে, থাকেন ব্রিটেনে। সুমন ২০১৫ সালে জাফর জায়েদীর চার তলা বাড়িটি ভাড়া নিয়ে দেন রেসিডেন্সিয়াল ল্যাবরেটরি কলেজ। একপর্যায়ে ভাড়া বন্ধ করে বাড়িটি তার নিজের বলে প্রচার করতে থাকেন সুমন।

সর্বশেষ কলেজে লুটপাটের অভিযোগে সুমন ৭০ বছরের বৃদ্ধ জাফর জায়েদীর বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকার ডাকাতি মামলা করেন। থানা এ মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিলে আদালতে নারাজি প্রার্থনা করেন সুমন। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআইও এর সত্যতা পায়নি বলে জানা গেছে।

ভুক্তভোগী জাফর জায়েদী বলেন, ‘ভাই, আমি আর কোথায় যাব এই অসুস্থ শরীর নিয়ে। আমাকে ৫ কোটি টাকার ডাকাতি মামলা দিয়েছে সুমন। আমি এখন বাস্তুহারা। থাকি ছোট ভাইয়ের বাসায়।’ প্রায় একই অবস্থা নিকুঞ্জ-১-এর ৮/এ রোডের ২৯ নম্বর বাড়ির মালিক ৭০ বছরের আরেক বৃদ্ধার। নিঃসন্তান এই বৃদ্ধাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে ওই বাড়িতেই বসবাস করে আসছেন সুমন নিজে। অনেকটা একই কৌশলে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০টি বাড়ি নিজের দখলে নিয়ে রেখেছেন সুমন। নিকুঞ্জ-২-এর ৯ নম্বর রোডের ২৭ নম্বর ছয় তলা বাড়ির মালিক কবির আহমেদের একমাত্র সন্তান জাহির ব্রিটেনপ্রবাসী। ২০১৬ সালে কবির আহমেদের কাছ থেকে ছয় তলা বাড়ি ছাত্রী হোস্টেল হিসেবে ভাড়া নিয়েছিলেন সুমন। একপর্যায়ে ভাড়া দেওয়া বন্ধ করে উল্টো ভবনটির মালিকানা দাবি করেন তিনি। বাড়ির প্রকৃত মালিক কবির আহমেদকে মেরে ফেলার হুমকি দিতে থাকেন সুমন। একপর্যায়ে বাবার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে দেশে চলে আসেন জাহির।

একটি বাড়ির মালিকপক্ষের স্বজন সৈয়দ আহাম্মেদ আলী বলেন, ‘আমার মামা-মামি তার সন্তানদের নিয়ে লন্ডনে থাকেন। সেই সুবাদে আমি বাড়িটি দেখাশোনা করি। সুমন বাড়িটি ছাত্রী হোস্টেল করবেন বলে ভাড়া নেন। কিন্তু প্রথম দুই-এক মাসের ভাড়া দিলেও পরের মাসে আর ভাড়া দেননি। ভাড়া চাইতে গেলেই খারাপ ব্যবহার করেন। এখন সুমন ভাড়া না দিয়ে উল্টো আমার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছেন। এ ঘটনা শুধু আমার সঙ্গে নয়, এ এলাকার সাত থেকে আটটি বাড়ি দখল করে রেখেছেন সুমন। সবার বিরুদ্ধেই থানায় মামলা দিয়েছেন তিনি।’

অভিযোগ রয়েছে, সুমনের দখলে থাকা বাড়িতে কলেজের সাইনবোর্ডের আড়ালে চলে মাদকসহ নানা অবৈধ ব্যবসা। কেউ বাড়িতে উঠতে গেলেই কলেজের ছাত্রদের ভুল বুঝিয়ে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন সুমন। ছাত্রী হোস্টেলের দোহাই দিয়ে মাস্তান দিয়ে তাড়িয়ে দেন বাড়ির প্রকৃত মালিকদের। সুমনের অপকর্মে পরোক্ষ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্য।

পিবিআইর প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার বলেন, ‘আইনের ফাঁকফোকরের সুবিধা নিয়ে সুমন এমন অপকর্ম করছেন তদন্তে এমনটাই উঠে এসেছে। যেসব পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষাকৃত নিরীহ এবং যাদের ওয়ারিশ নেই, সেই বাড়িওয়ালাদেরই টার্গেট করেন সুমন। তবে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আজিজুর রহমান সুমন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে সব অভিযোগই মিথ্যা। আমি প্রত্যেককে চুক্তি অনুযায়ী ভাড়া পরিশোধ করে আসছি।’

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Saiful Islam is a journalist at Zoom Bangla News with seven years of experience in news writing and editorial work. He contributes to producing accurate, well-structured, and reader-focused content across digital platforms. His work reflects a strong commitment to editorial standards and responsible journalism.