সিলেটের অর্থনৈতিক অঙ্গনে অভাবিত নারী জাগরণ

শুয়াইবুল ইসলাম, বাসস: সিলেটের নারীরা আর পিছিয়ে নেই এখন। এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক অঙ্গনে ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে নারী জাগরণ। ব্যবসা বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে তাদের বিচরণ বাড়ছে। আউটসোর্সিং করে অনেকে স্বনির্ভর হয়ে উঠছেন।

সিলেট উইমেন চেম্বারের সভাপতি স্বর্ণলতা রায় জানান, গত এক বছরে সিলেট জেলায় শতাধিক নারী উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছেন। গ্রামে বসেই অনেকে অনলাইনে ব্যবসা করছেন। শিক্ষিত মেয়েরা আউটসোর্সিং করছেন। নিজেরা গাড়ি চালিয়ে কর্মক্ষেত্রে যাচ্ছেন। সিলেটের প্রেক্ষাপটে এটি নারীদের জন্য একটি বড় অর্জন; যা অতীতে সম্ভব ছিল না।

কিছুদিন আগেও সিলেটের নারীদের জন্য আলাদা শপিংমল করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন স্বর্ণলতা রায়। উদ্দেশ্য, সিলেটের নারীদের উৎসাহিত করা বা তাদের জন্য কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করা। তবে, তিনি এখন বলছেন, ‘তথ্য প্রযুক্তির সুবাদে অনলাইন ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্র তৈরি হওয়ায় বাঁধা কেটেছে। বহু নারী এগিয়ে আসছেন। চাকরির আশায় না থেকে অনেকে উদ্যোক্তা হয়েছেন। দেশ-বিদেশে তাদের তৈরি পণ্য বিক্রি হচ্ছে।’ বর্তমানে সিলেটে কয়েক শ নারী ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়েছেন বলে জানান স্বর্ণলতা রায়।

সম্প্রতি যেসব নারী উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম সুলতানা পারভীন। জন্ম ও বেড়ে ওঠা সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নে। সিলেটের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ পাস করেছেন। তিনি কাজ করছেন সিলেটের বেতশিল্প নিয়ে। এরই মধ্যে তার বেতপণ্য অনলাইনে সাড়া ফেলেছে। গত এক বছরে প্রায় ২৫ লাখ টাকার বেতপণ্য তিনি বিক্রি করেছেন দেশ-বিদেশে।

সুলতানা পারভীন জানান, দেশব্যাপী ইউমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম (উই) নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই গ্রুপে যুক্ত হয়ে তিনি উদ্যোক্তা হতে অনুপ্রাণিত হন। এখন তিনি নিজেই অন্য মেয়েদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়তে সাহায্য করছেন। উই ফোরামে সিলেটের মডারেটর তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ‘চিরাচরিত’ নামে তার একটি পেজ আছে; যেখানে তিনি বেতশিল্পের যাবতীয় বিষয়য়াদি তুলে ধরেন।

দেশের মধ্যে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তিনি পণ্য পাঠানোর অর্ডার পেয়ে কুরিয়ার ও শিপমেন্টের মাধ্যমে তা প্রেরণ করেন। তার এই ব্যবসা বেতশিল্পের কারিগরদেরও সুদিন এনে দিয়েছে।

পারভীন জানান, তিনি এখন পর্যন্ত দেশের বাইরে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, আমেরিকা, কুয়েত ও কানাডায় তিনি পণ্য পাঠিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বেতশিল্প বাঁচিয়ে রাখা গেলে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করা হবে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে স্থাপিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্কে তিনি স্পেস বরাদ্দ পেয়েছেন।

তার মতো আরেক সফল নারী উদ্যোক্তা আয়েশা আক্তার। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া শীতলপাটি নিয়ে কাজ করছেন তিনি। স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবারের ভার বহন করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। এখন অনলাইনে এই বিশেষ পণ্যের ব্যবসা করে সুখেই জীবনযাপন করছেন। শীতলপাটির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর কদর এখনও সর্বত্র। যদিও, ন্যায্য দাম ও বাজারজাতকরণ এর অভাবে শীতলপাটির বুনন শিল্পীরা ধীরে ধীরে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আয়েশা আক্তার বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর আমার উপর সংসারের দায়িত্ব পরে। তিন সন্তান তখন স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করছে। ২০১৯ সালের শেষ দিকে দেশীয় পণ্যের একটি গ্রুপ উই এ যুক্ত হই। সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০২০ এর মার্চে শীতল পাটি নিয়ে কাজ শুরু করি। প্রথমে তেমন সাড়া না পেলেও কিছু লেখালেখি করার পর সাড়া পেতে শুরু করি।

অর্ডার পাওয়া শুরু হলেও বিপাকে পড়েন তিনি। কারিগররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। কারণ তাদের ধারণাÑ এগুলোর চাহিদা এখন নেই। শুরুটা একটু কঠিন হলেও বেশিদিন পেছনে তাকাতে হয়নি তার। তিন মাসের মধ্যে ৫ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেন। এরপর আয়েশা আক্তার তার ব্যবসায় নতুনত্ব নিয়ে এসেছেন। শীতলপাটি দিয়ে তৈরি করছেন ওয়ালমেট, গয়নাসহ নানাপণ্য। যা এখন বিদেশে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় ২টি ও আমেরিকায় ১টি শিপমেন্ট পাঠিয়েছেন তিনি। তিন শিপমেন্টেই বিক্রি করেছেন ৩ লাখ ৩২ হাজার টাকার পণ্য। এখন পর্যন্ত মোট ২২ লাখের বেশি টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছে।

সিলেটের বনানী চৌধুরী সীমা। জামদানি শাড়ি নিয়ে কাজ করছেন।  গত ঈদ উল ফিতরের আগে জামদানির শার্ট তৈরি করে সাড়া ফেলেন এই নারী। তার তৈরি প্রথম জামদানি শার্ট কিনেন দেশের একজন জনপ্রিয় চলচ্চিত্রশিল্পী।

একইভাবে গ্রামে বসে মনিপুরি শাড়ির ব্যবসা করছেন মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার টেংরানগর গ্রামের ইসমত জাহান হলি। মনিপুরি শাড়ি নিয়ে কাজ করেন তিনি। মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট ডিপ্লোমা করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। ২০২০ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেন। বছরে কমপেক্ষ ১২ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেন ঘরে বসেই।

তার মতো গ্রামে বসে আরেক নারী ফিরোজা আক্তার কাজ করেন সিলেটের বিশেষ সবজি ‘ঝাড়শিম’ বা ‘ফরাস” নিয়ে। সুস্বাদু শিম ফরাস বিদেশেও রপ্তানি করছেন তিনি। ত্রিনয়নীর উদ্যোক্তা স্বর্ণা দাস। কাজ করেন মাটির তৈরি জিনিস নিয়ে। সিলেট বিমানবন্দর এলাকার রোজিনা আক্তার একজন শিক্ষার্থী। তিনি এরই মধ্যে চা নিয়ে কাজ করে সফল হয়েছেন।

সিলেটে খাদিজা মেহজাবিন, নুসরাত মেহজাবিন ও ফেরদৌসিÑ তিন বোন মিলে গড়ে তুলেছেন থ্রি-সিস এক্সক্লুসিভ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। মূলত পেশা শিক্ষকতা হলেও পরিবারের কাউকে না জানিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। এখন আত্মীয়স্বজন সবার বাহবা পাচ্ছেন তারা।

শুধু ব্যবসাক্ষেত্রে নয়, তাদের বিচরণ এখন সর্বত্র। সিলেটের মঈন উদ্দিন আদর্শ মহিলা কলেজে ¯œাতক ম্যানেজমেন্ট (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রূপালী রাণী গোপ। নগরের মির্জাজাঙ্গালে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন। পড়াশুনার পাশাপাশি রূপালী আউটসোর্সিং করে মাসে আয় করছেন কমপক্ষে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শেষে ২০২০ সালের মার্চ থেকে করোনা পরিস্থিতি তৈরি হলে ঘরে বসেই অনলাইনে আয় শুরু করেন।

রূপালী জানান, সিলেট উইমেন চেম্বারের সভাপতি স্বর্ণলতা রায়ের দিকনির্দেশনা ও নিজের মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। তার স্বপ্ন নিজে স্বনির্ভর হওয়ার পাশাপাশি অন্য মেয়েদের স্বাবলম্বী করা। তার মতো আরও বেশ কয়েকটি মেয়ে আউটসোর্সিং শুরু করেছে বলে জানান রূপালী।

জাতীয় মহিলা সংস্থার সিলেট জেলা সভাপতি হেলেন আহমদ বলছেন, ‘সিলেটে বর্তমানে মেয়েরা অনেক এগিয়েছে। আগে ঘর থেকে বের হতে তাদের নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখী হতো। এখন সড়কে বাইক ও কার চালিয়ে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার দৃশ্য খুব স্বাভাবিক। ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজসেবাসহ সবক্ষেত্রেই নারীর নেতৃত্ব আশাব্যঞ্জক।’

কিছুদিন আগে সিলেটে নারী উদ্যোক্তা সম্মেলন হয়েছে। সেখানে সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি সিলেটের নারীদের জাগরণে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বলেন, ‘সিলেটের নারীদের জাগরণে আমি অভিভূত। সিলেটে তারা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন ভবিষ্যতে পুরুষ ও নারী আলাদা করে দেখার সুযোগ থাকবে না। আমরা আশাবাদী, এই ভেদাভেদ অচিরেই দূর হবে।’


জুমবাংলানিউজ/একেএ