সত্তরের দশকে ‘স্নেইল ডার্টার’ নামে ছোট্ট একটি মাছের প্রজাতিকে বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বিপন্ন প্রজাতি সংরক্ষণে গোটা পৃথিবীজুড়েই ততদিনে সচেতনতা গড়ে উঠতে শুরু করেছে। ফলস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি রাজ্যে এই মাছ নিয়ে বেশ কয়েক দশক আলাপ-আলোচনা চলমান ছিল। বিপন্ন প্রজাতির মাছ হিসেবে দাবি করার কারণে এই বিতর্ক পৌঁছে গিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টেও! ফলাফল ছিল অদ্ভুত। কিছু দিনের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল একটি বাঁধের নির্মাণ কাজ।
এখন প্রমাণিত হয়েছে, মাছটির প্রজাতিই ছিল আলাদা। এটি কোনো বিপন্ন প্রজাতির মাছ নয়। আসলে ‘স্নেইল ডার্টার’ বলে কোনো মাছই নেই। এই দাবি করেছেন ইয়েল পিবডি মিউজিয়ামের ইকথিওলজির কিউরেটর থমাস নিয়ার। ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে মৎস-জীববিজ্ঞান গবেষণাগারের নেতৃত্বে রয়েছেন থমাস নিয়ার। তিনি সহকর্মীদের সঙ্গে কারেন্ট বায়োলজি জার্নালে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন।
সেখানে জানিয়েছেন, স্নেইল ডার্টার (Percina tanasi) কোনো আলাদা প্রজাতি বা উপপ্রজাতি নয়। এটি Percina uranidea নামে একটি মাছের পূর্বাঞ্চলীয় গোষ্ঠী। একে ‘স্টারগেজিং ডার্টার’ও বলা হয়। স্টারগেজিং ডার্টার প্রকৃতিতে ভালোভাবেই টিকে আছে। বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত হয় না এই মাছ।
নিয়ার বলেন, সে সময় গবেষকেরা মাছটির পক্ষ নিয়েছিলেন কারণ, এভাবে টেনেসি ভ্যালি অথরিটির (টিভিএ) টেলিকো বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করার সম্ভাবনা ছিল। আরেকটি জরুরি কারণও ছিল। তিনি মনে করেন, ‘এটি সম্ভবত প্রথম এবং সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ, যেখানে মানুষ একটি প্রজাতিকে আলাদা হিসেবে ঘোষণা করেছে, যেন ভবিষ্যতে মাছটি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।’
টিভিএ ১৯৬৭ সালে টেলিকো বাঁধ নির্মাণ শুরু করে। পরিবেশবাদী, আইনজীবী, কৃষক এবং স্থানীয় চেরোকি জনগোষ্ঠী প্রকল্পটি বন্ধ করতে চেয়েছিল। চেরোকিদের ঐতিহাসিক জায়গাগুলো এই বাঁধের কারণে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ১৯৭৩ সালের আগস্টে বাঁধের এ কাজ বন্ধের একটি সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়।
ডেভিড ইটনিয়ার ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব টেনেসির একজন প্রাণিবিদ। তিনি বাঁধের বিরোধিতা করেছিলেন। ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে লিটল টেনেসি নদীতে ডাইভিং করতে গিয়ে তিনি মাছটি আবিষ্কার করেন। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের মাছ আগে কখনও দেখিনি।’ তারপর এর নাম দেন ‘স্নেইল ডার্টার’। মাছটি ছোট হলেও শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কারণ, এটি বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত হলে বাঁধ নির্মাণ বন্ধ হয়ে যাবে।
১৯৭৯ সালে টেনেসির সিনেটর ছিলেন হাওয়ার্ড এইচ. বেকার জুনিয়র। তিনি বলেছিলেন, ‘এই দুই ইঞ্চি মাছটি কয়েক বছর আগেও সবার নজরের বাইরে ছিল। আর এখন আমার জীবনে যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মাছ।’ একই বছর টেনেসির এক প্রতিনিধি জন ডানকান সিনিয়র এই মাছটিকে অপ্রয়োজনীয়, কদর্য, ক্ষুদ্র এবং অখাদ্য বলে বর্ণনা করেন।
সুপ্রিম কোর্ট স্নেইল ডার্টারের পক্ষে রায় দিয়েছিল। তবে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার একটি বিল স্বাক্ষর করেন বাঁধের পক্ষে। ফলে টেলিকো বাঁধকে বিপন্ন প্রজাতি আইন থেকে ছাড় দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সালে চালু হয় বাঁধটি।
২০১৫ সালে টিভিএ-র সাবেক জীববিজ্ঞানী জেফরি সিমন্স আলাবামা রাজ্য এবং মিসিসিপির সীমানায় একইরকম দেখতে কিছু মাছ খুঁজে পান। মাছগুলো দেখতে স্নেইল ডার্টারের মতো। তিনি জানতেন, যদি এটি আসলেই স্নেইল ডার্টার হয়, তবে এটি ওই এলাকায় থাকার কথা না। এরপর শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আভা গেজেলায়াগ ও তাঁর সহকর্মীরা মাছটির ডিএনএ বিশ্লেষণ করেন। তাঁরা স্নেইল ডার্টারের শারীরিক বৈশিষ্ট্য অন্য মাছের সঙ্গে তুলনা করেন। এতে নিশ্চিত হওয়া যায়, স্টারগেজিং ডার্টারের সঙ্গে এই প্রজাতির মাছের মিল আছে।
প্লেটার সুপ্রিম কোর্টে মাছের পক্ষে সফলভাবে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তিনি ইয়েলের গবেষণার ফলাফল নিয়ে আপত্তি জানান। এই গবেষণায় প্রজাতি আলাদা করার চেয়ে একীভূত করার পদ্ধতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যা বিপন্ন প্রজাতি আইনকে দুর্বল করতে পারে, বলেন তিনি।
কিন্তু নিয়ার বলেন, ‘তাঁদের গবেষণা আসলে এই আইনকে আরও শক্তিশালী করে। কারণ এটি দেখায় যে নতুন তথ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী বিজ্ঞান সংশোধন করা যায়। তিনি বলেন, ‘এই গবেষণায় ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলো আমাদের নতুন অনেক প্রজাতি আবিষ্কারে সাহায্য করেছে। এর মধ্যে অনেকেগুলো আসলেই অনেক বেশি বিপন্ন।’
টেলিকো বাঁধের লড়াইয়ের কয়েক দশক পর, বর্তমানে স্নেইল ডার্টার নামে পরিচিত মাছটি ভালো অবস্থায় রয়েছে। ২০২০ সালে এটিকে বিপন্ন প্রজাতির তালিকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এটি এখন এক সাফল্যের গল্প। কারণ, বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত সফল হয়েছে। তবে জন ডানকান সিনিয়রের ছেলে জন জে. ডানকান জুনিয়র বলেন, ‘বাবা এই গবেষণায় সন্তুষ্ট হতেন। তিনি মনে করতেন, ওই ছোট্ট মাছের জন্য প্রকল্পটি কখনোই বন্ধ হওয়া উচিত ছিল না।’
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।