অপরাধ-দুর্নীতি

হত্যার আগে সন্তান বলে ‘বাবা আমাকে ফাঁসি দিচ্ছো কেনো’


অফিসের সহকর্মীসহ অন্যান্যের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় সোয়া কোটি টাকা সুদে ধার নিয়েছিলেন টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) কনিষ্ঠ সহকারী ব্যবস্থাপক রকিব উদ্দিন আহম্মেদ লিটন (৪৬)। কিন্তু অনলাইনে জুয়া খেলে তিনি সব টাকা নষ্ট করেন।

পাওনাদারদের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে মেজাজ বিগড়ে থাকতো তার। বাসায় স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন প্রতিনিয়ত। গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি কিছু দিন আত্মগোপনেও ছিলেন। সর্বশেষ গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে খুন করেন রকিব।

এরপর নিজেও রেললাইনে গিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হন। পরে আর পুলিশের কাছে ধরা দেননি, ফেরেননি ঘরেও। তিনটি খুনের ঘটনার পর থেকে পাগলের বেশ ধরে আত্মগোপনে ছিলেন।

ঘটনার পর থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। সর্বশেষ মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সদর থানা এলাকা থেকে রকিবকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা উত্তর বিভাগের বিমানবন্দর জোনাল টিম।

গ্রেপ্তারের পর তিনি এই হত্যাকাণ্ডের কথা ‘স্বীকার করেছেন’ জানিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মো. মশিউর রহমান বলেন, পাওনাদারদের চাপে অতিষ্ঠ হয়ে স্ত্রী ও দুই ছেলে-মেয়েকে হত্যা করেন বলে জানিয়েছেন রাকিব। এই হত্যাকাণ্ডের পর ট্রেনের নিচে মাথা দিয়ে ‘নিজেকেও শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন’। তবে ট্রেন আসতে দেরি করায় তা হয়নি। পরে পাগল ও ভিক্ষুকের বেশ নিয়ে ঘোরাঘুরি করছিলেন রাকিব।

মশিউর রহমান আরও বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে রাকিব জানিয়েছেন স্ত্রী মুন্নী, ছেলে ফারহান ও মেয়ে লাইবাকে নিয়ে দক্ষিণখানের ওই ভবনের চতুর্থ তলার দক্ষিণ পাশের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস করতেন। তিনি বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড-বিটিসিএলে কনিষ্ঠ সহকারী ব্যবস্থাপক হিসাবে উত্তরায় কর্মরত ছিলেন। সংসারে মাঝে মাঝে টুকটাক পারিবারিক বিষয় নিয়ে ঝামেলা হলেও সবাইকে নিয়ে সুখে শান্তিতে একত্রে বসবাস করছিলেন। অফিসের কলিগসহ অন্যান্য ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় এক কোটি ১৫ লক্ষ টাকা সুদের উপর বিভিন্ন সময়ে ধার নিয়েছিল। অনলাইনে জুয়া খেলে সে সব টাকা নষ্ট করে। এদিকে পাওনাদাররা তাদের পাওনা টাকা আদায়ের জন্য চাপ দিতে থাকে। এ কারণে সে বাসায় স্ত্রী-সন্তানদের সাথে খারাপ আচরণ করত এবং গত ডিসেম্বর মাসে সে কিছু দিন আত্মগোপনে ছিল। তখন তার পরিবার দক্ষিণখান থানায় জিডি করে। কিন্তু কিছু দিন পরে সে বাসায় ফিরে আসে।

মশিউর বলেন, পাওনাদারদের টাকার চাপে সে তার পরিবারের সদস্যদের সাথে বিভিন্ন সময় আলোচনা করলেও তার পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজন তাকে তার জুয়া খেলার কারণে বিশ্বাস করত না। তখন পাওনাদারদের বিভিন্ন চাপের কারণে রাকিবের স্ত্রী মুন্নী ও তার ছেলে ফারহান তাকে বলে, এভাবে বেঁচে থেকে লাভ কী? আমাদের কাউকে দিয়ে মেরে ফেল, এভাবে বেঁচে থাকতে ভালো লাগে না। পাওনাদারদের চাপ, আত্মীয়-স্বজনদের অবিশ্বাস এবং স্ত্রী-সন্তানদের বিভিন্ন কথা তার অসহ্য লাগে।


জিজ্ঞাসাবাদে রাকিবের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তা মশিউর বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি রাকিব, তার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েরা দেরিতে নাস্তা করেন। নাস্তা শেষে রাকিব স্ত্রীর সাথে গল্প করেন। গল্প শেষে সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে মুন্নী হালকা ঘুমিয়ে পড়েন। ছেলে ফারহান পাশের রুমে মোবাইলে গেম খেলছিল, আর মেয়ে লাইবা পাশেরে এক রুমে টিভি দেখছিল। সে সময়ে হঠাৎ রকিবের মাথায় চিন্তা আসে যে, এই দুনিয়ায় সে তার পরিবারসহ বেঁচে থেকে লাভ কী বরং তাদের সবাইকে মেরে সে নিজে আত্মহত্যা করলে তার স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা সন্তানসহ সে নিজে পাওনাদার ও অন্যান্য দুনিয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে। তখনই সে তার পাশে থাকা হাতুড়ি দিয়ে প্রথমে স্ত্রীর মাথায় আঘাত করে এবং গলা চেপে ধরে। তখন রাকিবের স্ত্রী তাকে বলে, তুমি আমাকে মারলে কেন, এ বলে সে নিস্তেজ হয়ে যায়। পরে লিটন টিভি রুমে গিয়ে কাপড়ের রশি দিয়ে মেয়ের গলা পেঁচিয়ে ধরে, মেয়ে মারা যাওয়ার পর আবার সে তার ছেলে ফারহানের রুমে যায়। ছেলে তখন তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিল। মেয়েকে যে রশি দিয়ে মেরেছিল সেই রশি দিয়ে ছেলের গলায় পেঁচিয়ে ধরে। তখন ছেলে টের পেয়ে ধস্তাধস্তি শুরু করে। এক পর্যায়ে ছেলে খাট থেকে নিচে পড়ে যায়। তখন লিটন ছেলের বুকের উপর চড়ে বসে এবং চাপ দিয়ে ধরে। তখন ছেলে বলতে থাকে, বাবা আমাকে ফাঁসি দিচ্ছো কেনো? আমার কী অপরাধ? এই বলে ছেলে লিটনের হাতের উপর আঁচড়াতে থাকে এবং ছেলের নখের আঁচড়ে লিটনের হাত কেটে যায়। এক পর্যায়ে লিটন ছেলেকে বলে, আমরা এ পৃথিবীতে কেউ থাকব না। আমরা সবাই এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব বলে ছেলেকেও মেরে ফেলে।

এরপরে লিটন নিজেও ‘আত্মহত্যার চেষ্টা করেন’ জানিয়ে মশিউর রহমান বলেন, ‘রাকিব বলেছে, স্ত্রী-সন্তানদের মেরে ফেলার পর সে নিজে নিজে বলতে থাকে, আমি পাপী, তোমরা নির্দোষ। তোমাদের পাশে আমি মরব না, আমি মরব রাস্তার পাশে বা রেললাইনের ধারে। যেন আমার লাশ শিয়াল কুকুরে খায়। পরে সে বাসায় তালা দিয়ে বিকাল ৪টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে রেললাইনে যায়। ট্রেনের নিচে পড়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে। কিন্তু ট্রেন না আসায় সে আত্মহত্যা করতে পারেনি। আত্মহত্যা করতে না পেরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন জায়গায় ভিক্ষুক এবং পাগলের ছদ্মবেশ ধারণ করে ঘুরতে থাকে।’

মা ও দুই শিশুর লাশ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থল থেকে একটি ডায়রি উদ্ধার করেছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে পাঠানো হয়। সেই ডায়রিতে লেখা ছিল, ‘আজ ১২ তারিখ। সবাইকে মুক্তি দিয়ে গেলাম। ভবিষ্যতে আমার স্ত্রী ও দুই সন্তান যেন কারও কাছে হেয় না হয়। আমাকে পাওয়া যাবে রেললাইনে।’

সে সময় স্বজনরা জানিয়েছিলেন, ওই লেখা রাকিবের। অনলাইনে ব্যবসা করতে গিয়ে কোটি টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে মুক্তির পথ হিসেবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছেন তিনি।

উল্লেখ্য, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর দক্ষিণখান থানার প্রেমবাগান এলাকার মো. মনোয়ার হোসেনের বাড়ির ৪র্থ তলার দক্ষিণ পাশের ফ্ল্যাট থেকে পচা গন্ধ আসলে দক্ষিণখান থানা পুলিশে খবর দেয়া হয়।

পুলিশ দরজা খুলে ভেতরে অর্ধগলিত অবস্থায় একই পরিবারের স্ত্রী, শিশুপুত্র ও শিশুকন্যার মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় দক্ষিণখান থানা পুলিশসহ উত্তরা অপরাধ বিভাগের বিভিন্ন ঊধ্বর্তন পুলিশ কর্মকর্তা, পিবিআই, এসবি, র‌্যাব, সিআইডির ক্রাইমসিন বিভাগ ও ডিবি উত্তরের বিমানবন্দর জোনাল টিম চাঞ্চল্যকর তিন খুনের মামলাটির ছায়াতদন্ত শুরু করে।

এ ঘটনায় নিহত মুন্নী রহমানের বড় ভাই মুন্না রহমান দক্ষিণখান থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় একমাত্র আসামি করা হয় নিখোঁজ রাকিব উদ্দিন আহম্মেদকে। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর থানার ভাতশালী গ্রামে।

যাদের বাচ্চা আছে, এই এক গেইমে আপনার বাচ্চার লেখাপড়া শুরু এবং শেষ হবে খারাপ গেইমের প্রতি আসক্তিও।ডাউনলোডকরুন : http://bit.ly/2FQWuTP

আরও পড়ুন

বন্ধুদের নিয়ে প্রেমিকাকে ধর্ষণ

globalgeek

করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু, হাসপাতালে মরদেহ রেখে পালিয়েছে স্বজনরা

Sabina Sami

ছেলের অত্যাচার সইতে না পেরে বাড়ি ছাড়লেন বাবা

Sabina Sami

বিহঙ্গ বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহীসহ ২ জনের মৃত্যু

Sabina Sami

ন্যাশনাল ব্যাংকের টাকা উদ্ধারের গল্প গোয়েন্দা কল্প কাহিনীকেও হার মানায়!

mdhmajor

অনিয়মের অভিযোগে আরও ১১ জনপ্রতিনিধি সাময়িক বরখাস্ত

Sabina Sami