মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা এলাকায় মাত্র ১৭ মিনিটের ব্যবধানে পরপর দুইবার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশ।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, গতকাল মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ৩৩ মিনিটে প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে, যার মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৯। এর ঠিক ১৭ মিনিট পর রাত ৯টা ৫১ মিনিটে দ্বিতীয় দফা কম্পন অনুভূত হয়, যার মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ২।
ইউএসজিএসের তথ্য মতে, ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তিস্থল ছিল ভূ-পৃষ্ঠের প্রায় ৬৭ দশমিক ৮ কিলোমিটার গভীরে। কম্পনের কেন্দ্রস্থল মায়ানমার সীমান্ত এলাকায় হলেও এর প্রভাব বাংলাদেশের বিস্তৃত অঞ্চলে অনুভূত হয়েছে।
এর আগেও একই দিনে ভোর ৪টা ৩৬ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হালকা মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানায়, ওই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শেষ জেলা সাতক্ষীরা। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১।
গত বছরের ২১ নভেম্বর ভোরে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে সারাদেশ কেঁপে ওঠার পর থেকে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে একাধিকবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। শুধু একটি নয়, ওই ভূমিকম্পের পরবর্তী ৩২ ঘণ্টার মধ্যেই আরও তিনবার মৃদু কম্পন হয়, যা জনমনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে প্রতিটি কম্পনের উৎপত্তিস্থল দেশের ভেতরে—ঢাকা কিংবা এর আশপাশের এলাকায়—থাকায় শঙ্কা আরও বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ এখন আর কেবল ভারত বা মিয়ানমারের ভূমিকম্পের প্রভাবেই কাঁপছে না; বরং দেশের অভ্যন্তরীণ ফল্ট লাইনগুলোও ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে উঠছে। নরসিংদীর মাধবদী, সাভারের বাইপাইল এবং রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো সেই ইঙ্গিতই দেয়।
ভূবিজ্ঞানীরা ২১ নভেম্বরের ভূমিকম্পটিকে ইন্ট্রাপ্লেট ভূমিকম্প হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ এটি কোনো টেকটোনিক প্লেটের সীমানা নয়, বরং ভারতীয় প্লেটের ভেতরে থাকা কোনো চ্যুতি বা ফাটল থেকে সৃষ্টি হয়েছে।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের বড় ভূমিকম্পগুলোর অধিকাংশের উৎস ছিল দেশের বাইরের অঞ্চল। যেমন ১৮৯৭ সালের গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক কিংবা ১৯৫০ সালের আসাম–তিব্বত ভূমিকম্প। তবে দেশের ভেতরেও যে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে, তার নজির রয়েছে।
১৬৪২ সালের সিলেট ভূমিকম্পে ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটেনি। তবে ১৭৬২ সালের চট্টগ্রাম–আরাকান ভূমিকম্পে ঢাকায় প্রায় ৫০০ মানুষের মৃত্যু হয় এবং বহু গ্রাম পানিতে তলিয়ে যায়। এছাড়া ১৮৮৫ সালের প্রায় ৭ মাত্রার বেঙ্গল ভূমিকম্প এবং ১৯১৮ সালের ৭ দশমিক ৬ মাত্রার শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্পে একাধিক জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বাংলাদেশ তিনটি টেকটোনিক প্লেট—ভারতীয় প্লেট, ইউরেশীয় প্লেট এবং বার্মা মাইক্রোপ্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এসব প্লেটের পারস্পরিক চাপের কারণে অঞ্চলটি স্বাভাবিকভাবেই ভূমিকম্পপ্রবণ। জিপিএস পরিমাপ অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন ফল্ট লাইন প্রতি বছর কয়েক মিলিমিটার করে সরে যাচ্ছে, যার ফলে ভূ-অভ্যন্তরে শক্তি জমা হচ্ছে।
বিশেষ করে ডাউকি ফল্ট এলাকায় সিলেট বিভাগ, মধুপুর ফল্ট অঞ্চলে ঢাকা ও টাঙ্গাইল এবং চট্টগ্রাম–মিয়ানমার প্লেট সীমানা সংলগ্ন এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ফল্ট লাইনের নড়াচড়া অনেক সময় অগভীর ভূমিকম্প সৃষ্টি করে, যা নরম পলিমাটির কারণে বেশি তীব্রভাবে অনুভূত হয়।
ঢাকার মাটির গঠন এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা অববাহিকার নরম পলিমাটির কারণে ভূমিকম্পের তরঙ্গ ধীরগতিতে চললেও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এ প্রক্রিয়াকে ‘সাইট অ্যামপ্লিফিকেশন’ বলা হয়। ফলে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও রাজধানীতে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে ঢাকার কিছু এলাকায় মাটি আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা লিকুইফ্যাকশনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ অবস্থায় ভূমিকম্পের সময় মাটি তরলের মতো আচরণ করতে পারে।
অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান রুবাইয়াত কবির বলেন, বাংলাদেশ ভারতীয় প্লেটের ওপর অবস্থান করায় এখানে ভূমিকম্প হওয়া স্বাভাবিক। যদিও ঘন ঘন এমন ঘটনা ঘটে না, তবু ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ভূদুর্যোগ বিশেষজ্ঞ মোহন কুমার দাস বলেন, দেশের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলো চিহ্নিত ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি ভূমিকম্পের সময় কী করণীয়, সে বিষয়ে জনসচেতনতার অভাবও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


