ক্রিকেট (Cricket) খেলাধুলা বিপিএল

২২ গজের এক অদম্য যোদ্ধার গল্প

স্পোর্টস ডেস্ক : বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) এলিমিনেটর পর্ব চলছে। আগের ম্যাচে ফিল্ডিং করতে যেয়ে হাতে চোট পেয়েছেন ঢাকা প্লাটুনের এক ক্রিকেটার। দিতে হয়েছে ১৪টি সেলাই। অন্য কেউ হলে হয়তো বিশ্রাম নিতো। অথচ খেলাপাগল লোকটি সেই অবস্থাতেই মাঠে নামলেন।

প্রতিপক্ষের বিধ্বংসী ওপেনার গেইলের ক্যাচ লুফে নিলেন এক হাতে। বুঝতেই দিলেন না অপর হাতের অবস্থা। যেনো এর মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলেন, দমে যাবার পাত্র নন এই খেলোয়াড়। তিনি মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। ২২ গজের এক অকুতোভয় যোদ্ধা। বাবা-মা তাকে আদর করে ডাকেন কৌশিক বলে। বাংলাদেশি সমর্থকদের কাছে ভালোবাসার একজন মানুষ তিনি। তাকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক জীবন্ত কিংবদন্তি, একজন মিথ বললেও হয়তো অত্যুক্তি হবে না।

১৯৮৩ সালের ৫ অক্টোবর নড়াইলে নানু বাড়িতে মাশরাফীর জন্ম। ছোট থেকেই ছিলেন ডানপিটে স্বভাবের। নদীতে সাঁতার কাটা আর সারাদিন খেলে বেড়ানো, এটাই ছিল তার দৈনিক কাজ। ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবলও খেলতেন ভালোই।

বয়সভিত্তিক পর্যায়েই কোচদের চোখে পড়ে যান কৌশিক। হীরে চিনতে ভুল করেননি টাইগারদের সে সময়ের খন্ডকালীন কোচ অ্যান্ডি রবার্টস। তাই দ্রুত পাঠিয়ে দেন বাংলাদেশ ‘এ’ দলে। দারুণ পারফরম্যান্সের সুবাদে কোন প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট না খেলেই সরাসরি সুযোগ পান জাতীয় দলে। দারুণ গতির ফলে নাম দেয়া হয় ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’।

২০০১ সালের ৮ নভেম্বর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলা শুরু করেন মাশরাফী। তার প্রথম শিকার জিম্বাবুয়ের গ্রান্ট ফ্লাওয়ার। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে মাত্র এক ইনিংস বল করার সুযোগ পেলেও চার উইকেট শিকার করে জানান দেন নিজের আগমনী বার্তা। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে অভিষেক হয় দিন কয়েক পরেই। সে ম্যাচে ২ উইকেট নিয়েছিলেন ম্যাশ। সেই শুরুর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কাটিয়েছেন প্রায় দুই দশক। তবে সবাইকেই একসময় অবসর নিতে হয়, সেই পথে এগোচ্ছেন মাশরাফীও।

বিশ্বকাপের পর থেকেই তার অবসর নিয়ে গুঞ্জন শুরু। চলমান বিপিএলের শেষদিকে নিয়মিত তাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অবসর প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হয়েছে। এলিমিনেটর ম্যাচ হারার পর এই বিষয়ে খোলাখুলি অনেক কথাই বলেন চিত্রা পাড়ের ছেলেটি। সেখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, খেলার প্রতি এখনো কতটা নিবেদিতপ্রাণ তিনি।

সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নে জর্জর মাশরাফী জানান, ঘটা করে দূরের কথা মাঠ থেকেই অবসর নিতে চান না তিনি। কারো জোরাজুরিতে নয়, নিজের ইচ্ছামতো সময়ে খেলা ছাড়তে চান দেশসেরা অধিনায়ক। তিনি স্পষ্ট বলে দেন, ‘আমি খেলতে চাই, পরিষ্কার করেই তো বলেছি। আগের দিনও পরিষ্কার করে বলেছি যে, ঢাকা লিগ খেলব। বিপিএল আছে বিপিএল খেলব। এটা উপভোগ করছি।’

দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পথটা এমনই ছিল মাশরাফীর। বারবার সবাই ভেবেছে তিনি ফুরিয়ে গেছেন, আর প্রয়োজন নেই। কিন্তু ঠিকই সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছেন মাশরাফী একজনই হয়। অভিষেক সিরিজের পরে মাত্র এক সিরিজ খেলেই চলে যান ইনজুরিতে। ফিরে এসে আবার খেলেছেন, পুনরায় ইনজুরি তাকে ছিটকে দিয়েছে মাঠের বাইরে। এখন পর্যন্ত বার দশেক অস্ত্রোপচারের জন্য ছুরিকাঁচির নিচে যেতে হয়েছে। হার না মানা নড়াইল এক্সপ্রেস বারবারই ফিরে এসেছেন দাপটের সঙ্গে, পরাজিত করেছেন ইনজুরিকে। তার সর্বশেষ প্রমাণ বিপিএল এলিমিনেটরের ম্যাচটি।

মাশরাফীর ক্যারিয়ারের সেরা সময় বলা যায় ২০০৬ সালকে। সে বছর তিনি ৪৯টি উইকেট শিকার করেন। যা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশিদের মাঝে এক ‘ক্যালেন্ডার ইয়ার’-এ সর্বোচ্চ। একইবছর মাশরাফী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন কৈশরের ভালোবাসা সুমির সঙ্গে। তাদের সুখের সংসার আলো করে এসেছে হুমায়রা ও সাহেল নামে দুই সন্তান। সুযোগ পেলেই পরিবারকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন মাশরাফী। যা পরিবারের প্রতি তার কর্তব্যবোধের পরিচয় দেয়।

তবে পরিবারের পাশাপাশি দেশের প্রতি তার আত্মনিবেদনও কম নয়। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজ জেলা নড়াইল-২ আসন থেকে সংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। এছাড়া ‘নড়াইল ফাউন্ডেশন’ সংগঠনের মাধ্যমে নিজ এলাকায় সেবা করে যাচ্ছেন তিনি। বিপিএলে এর আগে রংপুর রাইডার্সকে চ্যাম্পিয়ন করার পর ফ্র্যাঞ্চাইজি তাকে দামী গাড়ি উপহার দিতে চেয়েছিল। অথচ এর পরিবর্তে তিনি জেলা হাসপাতালের জন্য অ্যাম্বুলেন্স দেয়ার অনুরোধ করেন। এ থেকেই বোঝা যায় ব্যক্তি মাশরাফীর মহত্ত্ব।

আন্তর্জাতিক ব্যস্ততায় ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলার সুযোগ অনেক কম পেয়েছেন ম্যাশ। খুলনা বিভাগের হয়ে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে প্রতিনিধিত্ব করা মাশরাফীর সর্বোচ্চ ইনিংসটি ১৩২ রানের। আন্তর্জাতিক টেস্টে ৩টি অর্ধশতক রয়েছে তার। তবে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে নিয়মিত মুখ তিনি।

২০০৭ বিশ্বকাপে ছিলেন সহ-অধিনায়ক। সেবার ভারত বধে রেখেছিলেন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। ভালো খেলার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৯ সালে পান অধিনায়কত্বের ব্যাটন। তবে ইনজুরি নামের কালো থাবা অধিনায়ক হিসেবে প্রথম টেস্টেই ছিটকে দেয় তাকে। বলা যায় সেটিই ছিল তার শেষ টেস্ট ম্যাচ। ২০১১ বিশ্বকাপে অভিন্ন কারণে স্কোয়াডে জায়গা পাননি। দলে সুযোগ না পাওয়ায় মিডিয়ার সামনে তার কান্না ছুঁয়েছিল সবার হৃদয়।

তবে মাশরাফী যে হার মানবার নন, এটি প্রমাণ করতেই ফিরে এসেছেন বারবার। ২০১৪ সালে একেরপর এক হারতে থাকা বাংলাদেশের দায়িত্ব আবার দেয়া হয় ম্যাশের হাতে। তার ছোঁয়াতে যেনো বদলে যায় সবকিছু। ২০১৫ বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে জাতীয় দলকে এনে দেন সর্বোচ্চ সাফল্য। তার অধীনে সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বর্ণযুগের কান্ডারি মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। তার নেতৃত্বে পাকিস্তানকে ১৬ বছর পর হারানোসহ হোয়াইটওয়াশ করে টাইগাররা। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে সিরিজ হারানোর পেছনেও নেতৃত্বে ছিলেন ম্যাশ। প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল খেলা, কয়েকবার এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলা এবং বহুজাতিক টুর্নামেন্টের প্রথম শিরোপাও আসে মাশরাফীর হাত ধরে। এ কারণে তাকে অভিহিত করা হয় ‘ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক’ বলে। এখন পর্যন্ত একটি টেস্টে অধিনায়কত্ব করা মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার সাফল্যের হার শতভাগ। ৮৫ টি ওয়ানডে ম্যাচে ৪৭ জয় ও ২৮টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ১০ জয় তার অসাধারণ অধিনায়ক সত্তারই আরেক প্রমাণ।

ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারও যথেষ্ট সমৃদ্ধ মাশরাফীর। ৩৬ টেস্টে ৭৮ উইকেট শিকার করেছেন, যেখানে ৬০ রানে ৪ উইকেট সেরা সাফল্য। ব্যাট হাতেও করেছেন ৭৯৭ রান, যেখানে ৭৯ রানের সর্বোচ্চ ইনিংস তার ব্যাটিং সত্তার প্রমাণ দেয়। ২১৭ টি আন্তর্জাতিক একদিনের ম্যাচে ২৬৬ ব্যাটসম্যানকে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠিয়েছেন। সেরা বোলিং ফিগার ২৬ রানে ৬ উইকেট। এই ফরম্যাটে ব্যাট হাতে করেছেন ১৭৮৬ রান, যেখানে সর্বোচ্চ ইনিংসটি অপরাজিত ৫১ রানের। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে বরাবরই দূর্বল বাংলাদেশ। তবে এখানেও মাশরাফীর পারফরম্যান্স যথেষ্ট ভালো। ৫৪ ম্যাচে ৪২ উইকেট নিয়েছেন যেখানে ম্যাচসেরা বোলিং ১৯ রানে ৪ উইকেট। ব্যাট হাতে করেছেন ৩৭৭ রান।

২০০৯ সালে ইনজুরির পর আর টেস্ট খেলেননি মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে বিদায় নিয়েছেন ২০১৭ সালে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক ফরম্যাটে শুধুমাত্র ওয়ানডে ম্যাচ খেলে যাচ্ছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের জীবন্ত এই কিংবদন্তি। তবে আর বেশিদিন তাকে এই ফরম্যাটে খেলতে দেখার সম্ভাবনা বাস্তবতার নিরিখে অনেক কম।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পাশাপাশি ঘরোয়া ও ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টুর্নামেন্টেও অন্যতম আকর্ষণ নড়াইল এক্সপ্রেস। ২০০৯ সালে আইপিএল-এর দল কলকাতা নাইট রাইডার্স তাকে ৬ লাখ ডলার দিয়ে কেনে। বিপিএল এ ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্স, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স, রংপুর রাইডার্স ও ঢাকা প্লাটুনের হয়ে খেলেছেন। প্রথমোক্ত তিন ফ্র্যাঞ্চাইজিকে চ্যাম্পিয়ন করলেও ঢাকা প্লাটুনের হয়ে তার যাত্রা থেমে গেছে এলিমিনেটর পর্বেই।

অবশ্য বিপিএলেও তার অধিনায়ক সত্তার প্রমাণ পাওয়া যায় পরিসংখ্যানে। দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের জমজমাট এ আসরে কমপক্ষে ২০ ম্যাচ অধিনায়কত্ব করা ক্রিকেটারদের মাঝে জয়ের হারে সবার উপরে মাশরাফী (৬২.৭৯%)। সবমিলিয়ে বিপিএলে ৮৬ ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়ে ৫৪ ম্যাচে জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছেন নড়াইল এক্সপ্রেস।

জাতীয় দলের হয়ে ওয়ানডে ফরম্যাটে সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক মাশরাফী। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্যাচ নেয়ার রেকর্ডও তারই। এছাড়া ভারতের বিপক্ষে টানা চার বলে চার ছক্কা মারেন তিনি, যা এখনো কেউ ভাঙ্গতে পারেনি।

লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে পরপর চার বলে চার উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব তার। অধিনায়ক হিসেবে দলে তার অবদান ও প্রভাব অনস্বীকার্য। তার সম্পর্কে সাকিব আল হাসান এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ‘মাশরাফী ভাই যদি না খেলে শুধু ড্রেসিংরুমে থাকেন তাও অন্যরকম উদ্দীপনা কাজ করে’। এ থেকেই জাতীয় দলে মাশরাফীর গুরুত্ব ও অবস্থান পরিষ্কার হয়ে যায়।

যেখানেই গিয়েছেন মাশরাফী সেখানেই পেয়েছেন সফলতার দেখা। সিক্ত হয়েছেন মানুষের ভালোবাসায়। তার নামে মানুষ খোঁজে আশা, পায় ভরসা। অথচ তার চলার পথে বাঁধা এসেছে বারবার। ইনজুরি ও অফ ফর্মের সঙ্গে যুদ্ধ করে জয়ী হয়ে ফিরেছেন প্রতিবারই। তাই মাশরাফীকে ২২ গজের এক অদম্য যোদ্ধা বললে তা অত্যুক্তি হবেনা মোটেও।


জুমবাংলানিউজ/এসআর




আপনি আরও যা পড়তে পারেন


rocket

সর্বশেষ সংবাদ