
দেশের তৃণমূলে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও বেগবান করতে একযোগে ৪৫টি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে নতুন ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। তবে দীর্ঘদিন পর কমিটি দেওয়ায় যেখানে নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্দীপনা তৈরি হওয়ার কথা, সেখানে কমিটি ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে শুরু হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্ক। পদবঞ্চিত ও প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া নেতাদের অভিমানে দল ছাড়ার ঘোষণা এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগে মাঠপর্যায়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে। কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ‘নিষ্ক্রিয়’ এবং সুবিধাবাদীদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন অনেকে। অবশ্য সংগঠনের শীর্ষ নেতারা এই ক্ষোভকে ‘সাময়িক’ বলে অভিহিত করেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পদবঞ্চিত অনেকে বলেছেন, হঠাৎ করে নতুন মুখদের নেতৃত্বে আনা হয়েছে, যা সংগঠনের জন্য অশনিসংকেত। ছাত্রদল যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে রাজনীতির ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তা বলা মুশকিল। কেননা এ মুহূর্তে ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমানের উচিত ছিল সংগঠনের কেন্দ্রীয় নতুন কমিটি দেওয়া। এখন তৃণমূলে নতুনভাবে কমিটি করতে গিয়ে আরও সাংগঠনিক সংকট তৈরি হলো। বিষয়টি নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এদিকে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কমিটি নিয়ে অসন্তোষের দ্রুত সমাধান না হলে সংগঠনে অভ্যন্তরীণ কোন্দল আরও বাড়তে পারে এবং তা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কমিটি গঠনের বিষয়ে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির কালবেলাকে বলেন, তারা কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিএনপি ও অন্যান্য সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। বিগত দিনের কর্মকাণ্ড এবং আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা বিবেচনায় নিয়েই কমিটি দেওয়া হয়েছে।
একযোগে ৪৫টি ইউনিট কমিটি ঘোষণা: ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির গত দুদিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ৪৫টি ইউনিটের কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন। তার মধ্যে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে ২২টি। সেগুলো হলো—বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স), বরিশাল জেলা ও মহানগর ছাত্রদল, ভোলা, ঝালকাঠি, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী মহানগর, নওগাঁ, জয়পুরহাট, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, লক্ষ্মীপুর, কক্সবাজার, চাঁদপুর, যশোর, বান্দরবান, নোয়াখালী, রাঙামাটি, সুনামগঞ্জ, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ও কিশোরগঞ্জ জেলা।
এ ছাড়াও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছে ২৩টি ইউনিটে। সেগুলো হচ্ছে—ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, ঢাকা মহানগর পূর্ব ও পশ্চিম, কুমিল্লা মহানগর, ময়মনসিংহ মহানগর, ময়মনসিংহ উত্তর ও দক্ষিণ জেলা, জামালপুর, নেত্রকোনা, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, খাগড়াছডড়ি, কুমিল্লা মহানগর, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর মেডিকেল কলেজ, সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ।
ক্ষোভ ও বিতর্কের নেপথ্যে: কমিটি ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজপথে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। বিতর্কের প্রধান কারণগুলো হলো—অছাত্র ও বয়স্কদের প্রাধান্য দেওয়া। একাধিক এলাকার নেতারা অভিযোগ করেন, অনেক ইউনিটে নিয়মিত ছাত্রদের বাদ দিয়ে অছাত্র ও ব্যবসায়িক কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের পদ দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে।
বিগত দিনে ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় থাকা কর্মীদের বাদ দিয়ে ‘সুবিধাবাদী’ ও ‘লবিং-নির্ভর’ নেতাদের পদায়নের অভিযোগ তুলেছেন পদবঞ্চিতরা। এমন অবস্থায় কমিটি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেশের কয়েকটি জেলা ও মহানগরে নবগঠিত কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদের নেতারা পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। অনেক জায়গায় পদবঞ্চিত কর্মীরা ঝাড়ু মিছিল ও কেন্দ্রীয় নেতাদের কুশপুত্তলিকা দাহ করেছেন। বিভিন্ন স্থানের নেতাকর্মীরা ফেসবুক লাইভে এসে নিজেদের অতীত জীবনের আন্দোলন-সংগ্রামের স্মৃতিচারণ করে অঝোরে কেঁদেছেন। কেউ কেউ অভিমানে ছাত্রদলের রাজনীতি ছাড়ারও ঘোষণা দিয়েছেন।
ক্ষুব্ধ কয়েকজন নেতাকর্মী কালবেলাকে জানিয়েছেন, স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের পছন্দের লোক এবং তাদের অনুসারীদের পদায়ন করতে গিয়ে সংগঠনের চেইন অব কমান্ড ভেঙে ফেলা হয়েছে।
অন্যদিকে, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, মূলত দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটাতে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমেই এই রদবদল করা হয়েছে। আন্দোলনের মাঠে যারা সক্রিয় থাকবেন, তাদেরই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন জেলা ও মহানগরীর তুলনামূলক চিত্র: ঢাকা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ চার ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পদবঞ্চিতদের একটি বিরাট অংশ বিক্ষোভ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। ময়মনসিংহ ও কুমিল্লাতেও কমিটি গঠন নিয়ে স্থানীয় নেতাদের মধ্যে বড় ধরনের বিভক্তি স্পষ্ট হয়েছে। অনেকে ক্ষোভে দল ছাড়ার আলটিমেটাম দিয়েছেন। নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের কমিটি দেওয়াকে কেন্দ্র করে কোন্দল স্পষ্ট হয়েছে। যেখানে বিগত দিনের মামলার আসামিদের পদায়ন না করায় ত্যাগী ও সাধারণ কর্মীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন মো. জাহিদ। এবারও জেলা শাখার নতুন কমিটিতে শীর্ষ পদের একটি প্রত্যাশিত ছিলেন তিনি। কিন্তু নতুন কমিটিতে পদ না পেয়ে ফেসবুকে লাইভে এসে অঝোরে কেঁদেছেন তিনি। তার কান্নার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠন নিয়ে ত্যাগী ও দীর্ঘদিনের সক্রিয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয় থেকে দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা অনেক নেতাকর্মী নতুন কমিটিতে স্থান না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাদের দাবি, দুঃসময়ে যারা দলের পাশে ছিলেন; তাদের উপেক্ষা করে হঠাৎ করে নতুন মুখদের নেতৃত্বে আনা হয়েছে, যা সংগঠনের জন্য অশনিসংকেত।
সাবেক কমিটির সদস্য সচিব মামুন হাসান রোহান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদলের রাজনীতি করায় মামলা-হামলার শিকার হয়েছি। অথচ কমিটিতে আমাদের জায়গা হয়নি। এটি অত্যন্ত কষ্টের। আরেক ছাত্রনেতা বলেন, এই কমিটিতে বিবাহিত এবং ছাত্রলীগের এক কর্মীকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আমাদের জন্য লজ্জার। দীর্ঘদিন লড়াই সংগ্রাম করে আজ আমরা বঞ্চিত।
এদিকে নতুন কমিটির নেতারা দাবি করেছেন, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা মেনেই কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং এখানে যোগ্যতা ও সাংগঠনিক দক্ষতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তারা সবাইকে বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের কমিটি বাতিলের দাবিতে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেছেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কমিটি বাতিলের দাবিতে পৌরসভা প্রাঙ্গণ হতে বিক্ষোভ মিছিল শহরের বনরূপা হয়ে জেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনে আসে। পরে জেলা বিএনপির নেতাদের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেন তারা।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হয়নি। অপহরণকারী, চাদাঁবাজ ও বিবাহিতদের দিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল অর্থের বিনিময়ে রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করেছে। ফলে ঘোষিত কমিটি বাতিল করে ত্যাগী ও যোগ্যদের নিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালানোর হুঁশিয়ারি দেন তারা।
অবশ্য সড়ক থেকে নেতাকর্মীদের সরাতে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদ মামুন ও সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম পনির দফায় দফায় আলোচনা করেন। তারা বিষয়টি সন্তোষজনক সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’-এর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে বহিষ্কার হওয়া ছাত্রদলের এক নেতাকে নোয়াখালী জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি করা হয়েছে। এ নিয়ে হাতিয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, হাতিয়া উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আরেফিন আলী সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকের বিপক্ষে স্বতন্ত্র ‘ফুটবল’ প্রতীকের প্রার্থী তানভীর উদ্দিন রাজীবের হয়ে কাজ করেন। এ সময় তিনি ওই প্রার্থীর সিপ (পোলিং) এজেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তাকে ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে সম্প্রতি নোয়াখালী জেলা ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটিতে তাকে সহসভাপতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে এমন পদে পদায়নকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রকাশ্যে বিরোধী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করা একজন নেতাকে কীভাবে এত দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হলো। কী প্রক্রিয়ায় তার বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হয়েছে তা নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। অনেকেই এটিকে ‘অদৃশ্য শক্তির প্রভাব’ বলে মন্তব্য করেছেন।
হাতিয়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও নবগঠিত জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ মাহমুদ বলেন, দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কেউ আবার দায়িত্ব পেলে তা একনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের জন্য কষ্টের ও দুঃখজনক।
উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব আব্দুল হালিম বলেন, বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ছিল দলের শুদ্ধতার প্রতীক; কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত যদি পরে উপেক্ষিত হয়, তাহলে শৃঙ্খলার জায়গাটা কোথায় থাকে? যারা দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছে, তাদের অবমূল্যায়ন করা হলে ভবিষ্যতে কেউ আর ত্যাগ স্বীকারে আগ্রহী হবে না।
উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব ফাহিম উদ্দিন বলেন, সাংগঠনিক কার্যক্রমের উদ্দেশ্য কর্মীদের উৎসাহিত করা। সেখানে কেউ সরাসরি দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করে আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে এলে, তা কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। এতে কর্মীরা নিরুৎসাহিত হবেন। কিছু নেতার ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণেই এমন সিদ্ধান্ত এসেছে বলে মনে হয়।
ঢাকার বাইরে প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নোয়াখালী ব্যুরো, সুবর্ণচর ও রাঙামাটি প্রতিনিধি।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


