সেনাবাহিনী প্রসঙ্গ ও মাহফুজ আনামের মন্তব্য
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইন্ডিয়া টুডের ‘নাথিং বাট ট্রু’ অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম এমন মন্তব্য করেছেন যা দেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেন, “সেনাবাহিনী চাইলে হাসিনা যাবার পরই ক্ষমতা নিতে পারত”। এই মন্তব্যটি বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা, রাজনৈতিক পরিবেশ এবং সেনাবাহিনীর ভূমিকাকে নতুনভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
সেনাবাহিনীর ভূমিকা: ২০২৫ সালের সংকটকাল ও তাদের অবস্থান
২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে একটি জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়। সেই সময় সেনাবাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপের আশঙ্কা অনেকেই প্রকাশ করলেও, মাহফুজ আনামের মতে সেনাবাহিনী সেই সুযোগ গ্রহণ করেনি। বরং তারা অপেক্ষাকৃত সংযম দেখিয়েছে এবং ঘোষণা করেছে যে, তারা শুধুমাত্র ইউনূস সরকারের প্রতি সমর্থন জানাতে আগ্রহী।
Table of Contents
সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান তার এক বিরল ভাষণে দেশকে বিশৃঙ্খলা থেকে সতর্ক করেছিলেন। এ বক্তব্য দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর অবস্থানকে প্রকাশ করে। তবে এই সতর্কবার্তাটি শুধু সরকারের উদ্দেশ্যে নয়, বরং জাতীয় অস্থিরতা সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী, ছাত্র সংগঠন ও বিরোধী রাজনীতির দিকেও ছিল।
রাজনৈতিক শূন্যতা এবং সেনাবাহিনীর সুযোগ
মাহফুজ আনামের বক্তব্য অনুযায়ী, হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর তিন-চার দিন দেশের কার্যত কোনো সরকার ছিল না। এই সময়টিই ছিল সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের সবচেয়ে আদর্শ সুযোগ। কিন্তু সেনাবাহিনী সেই সময় হস্তক্ষেপ না করে তাদের পেশাদারিত্ব এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার প্রতি প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে।
এই অবস্থানই প্রমাণ করে, সেনাবাহিনী দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের পরিবর্তে, একটি নিরপেক্ষ ও সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। ফলে, ইউনূস সরকারকে সময় দিয়ে তারা একটি স্থিতিশীল প্রশাসন গঠনে সহায়তা করেছে।
ছাত্র আন্দোলন ও নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব
হাসিনা সরকারের পতনের মূল চালিকাশক্তি ছিল ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলন। এই আন্দোলনের ফলে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) আবির্ভাব ঘটে। সেনাবাহিনী এবং প্রশাসনের স্থিতিশীলতার মধ্যে এই নতুন রাজনৈতিক শক্তির উদ্ভব ভবিষ্যতের জন্য একটি সম্ভাবনাময় অধ্যায় উন্মোচন করেছে। তবে সেনাবাহিনী নতুন দলের কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ না করে পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় আছে, যা গণতন্ত্রের বিকাশে সহায়ক।
সামাজিক ও ধর্মীয় ভারসাম্য রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকাবলী
সাম্প্রতিক সময়ে হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর সহিংসতা এবং মৌলবাদী গোষ্ঠীর উত্থান সেনাবাহিনীর জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, অন্যদিকে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা সেনাবাহিনীর দায়িত্ব। মাহফুজ আনামের বক্তব্যে উঠে আসে যে, বর্তমান সেনাবাহিনী এই ভারসাম্য রক্ষায় খুবই সচেতন এবং তারা ইউনূস সরকারের নীতির প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।
ভারত ও পাকিস্তান প্রসঙ্গ এবং সেনাবাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কূটনৈতিক অবস্থানগত কারণে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার আমলে ভারতঘেঁষা নীতির কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল ছিল। তবে ইউনূস সরকারের অধীনে কিছু উষ্ণতা ফিরে এসেছে, যা সামরিক কূটনৈতিক স্তরেও অনুরণিত হচ্ছে।
তবে মাহফুজ আনাম এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়েছি। সুতরাং ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে আমাদের বিচার করবেন না। আমরা গর্বিত বাঙালি, আবার গর্বিত মুসলমানও।” এটি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ভূমিকাকেও প্রতিফলিত করে, যারা একইসঙ্গে দেশপ্রেম, পেশাদারিত্ব এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন ও সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। সেনাবাহিনী নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো পক্ষপাত দেখাচ্ছে না বরং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ভূমিকা পালন করছে। মাহফুজ আনামের কথায়, “সেনাবাহিনী আসলে তেমন কোনো রাজনৈতিক আগ্রহ দেখায়নি।” এটি স্পষ্ট করে দেয়, বর্তমান সেনাবাহিনী অতীতের তুলনায় অনেক বেশি গণতন্ত্রমুখী ও দায়িত্বশীল।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও, মাহফুজ আনামের বিশ্লেষণে একটি বিষয় সুস্পষ্ট—বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার রক্ষক, ক্ষমতা দখলের লোভ থেকে দূরে থাকা একটি পরিণত ও দায়িত্বশীল বাহিনী।
বাংলাদেশের জনগণও এখন সেনাবাহিনীকে দেখছে এক নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে, যারা রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখার কাজ করছে। এই আস্থা, গণতন্ত্রের পথ সুগম করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
- সেনাবাহিনী কি রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে?
না, মাহফুজ আনামের মতে তারা বরং দায়িত্বশীলভাবে ইউনূস সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। - ২০২৫ সালের নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হবে?
তারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, তবে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করবে না। - সেনাবাহিনীর উপর জনমতের প্রভাব কেমন?
বর্তমানে সেনাবাহিনীর প্রতি জনআস্থা বাড়ছে, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।