বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান কিংবা ইন্দোনেশিয়ার রাস্তাঘাটে ফুটবল উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে বড় পর্দায় আর্জেন্টিনার খেলা দেখতে হাজারো মানুষের ভিড়, মেসির গোলে উল্লাস সবই যেন বিশ্বকাপের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ সেই উল্লাসে নিজের দেশের কোনো দল নেই। প্রশ্ন উঠছে, কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী থাকা সত্ত্বেও কেন বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারছে না এসব দেশ?

বার্তাসংস্থা বিবিসির এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, শুধু জনসংখ্যা নয়; অর্থনৈতিক সক্ষমতা, অবকাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং ফুটবল সংস্কৃতির ধারাবাহিক বিকাশ এসবই একটি দেশের বিশ্বকাপে সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঢাকায় মেসির গোলেই উৎসব, কিন্তু মাঠে নেই বাংলাদেশ
১৭ জুন আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচে লিওনেল মেসি গোল করার পর ঢাকার বিভিন্ন খোলা প্রাঙ্গণে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন হাজারো সমর্থক। অনেকের গায়ে ছিল আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সি। কিন্তু সেই দর্শকদের একজনও আর্জেন্টিনার নাগরিক ছিলেন না; তারা সবাই বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমী।
ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন শহরেও একই ধরনের দৃশ্য দেখা গেছে। নিজেদের দল বিশ্বকাপে না থাকায় অনেক সমর্থক আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল কিংবা অন্যান্য জনপ্রিয় দলকে সমর্থন করেন।
জনসংখ্যা বড় হলেই সাফল্য আসে না
তাত্ত্বিকভাবে একটি দেশের জনসংখ্যা যত বেশি, প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি। বিশ্বকাপজয়ী দেশগুলোর বেশিরভাগই জনবহুল যেমন ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যান্ড, ইতালি ও স্পেন তার উদাহরণ।
তবে ব্যতিক্রম উরুগুয়ে। মাত্র সাড়ে ৩৫ লাখ মানুষের দেশটি দুইবার বিশ্বকাপ জিতেছে।
ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ও ‘সকারনোমিকস’ বইয়ের সহলেখক স্টেফান সিজমানস্কির মতে, জনসংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি একমাত্র শর্ত নয়।
তার ভাষায়, ‘একটি দেশের ফুটবলে সফল হতে মানুষের পাশাপাশি অর্থ, অবকাঠামো এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা প্রয়োজন।’
সিজমানস্কি বলেন, যেসব দেশ বিশ্বকাপ জিতেছে, তাদের বেশিরভাগই দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছে। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো শত বছরেরও বেশি সময় ধরে উচ্চমানের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ায় তারা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
তার গবেষণা অনুযায়ী, সাধারণত বিশ্বকাপ জিততে মাথাপিছু গড় আয় ১৫ হাজার ডলারের বেশি হওয়া দরকার। যদিও ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা তুলনামূলক কম আয় নিয়েও সফল হয়েছে, কারণ তাদের ফুটবল ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতা অনেক সমৃদ্ধ।
বাংলাদেশে কাঠামোগত দুর্বলতা
বাংলাদেশের অভিনেতা, লেখক ও ফুটবল বিশ্লেষক অদিতি করিম বিবিসিকে বলেন, ‘লাখো-কোটি ফুটবল সমর্থক থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এত পিছিয়ে থাকবে এটা মেনে নেওয়া যায় না।’
তার মতে, ক্রিকেট জনপ্রিয় হওয়া কোনো অজুহাত নয়।
তিনি বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডও ক্রিকেট পরাশক্তি, কিন্তু তারা নিয়মিত বিশ্বকাপে খেলছে। আমাদের সমস্যা জনপ্রিয়তা নয়, বরং প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও কাঠামোর অভাব।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাস্তবতা বিবেচনায় আমার জীবদ্দশায় বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে খেলতে দেখার সম্ভাবনা আমি দেখি না। তবে বাংলাদেশি সমর্থকেরা বিশ্বকাপের আনন্দ থেকে নিজেদের কখনো দূরে রাখবেন না।’
ভারতের সমস্যা ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা
ভারতের সাবেক ফুটবলার শ্যাম থাপার মতে, দেশটির অন্যতম বড় সমস্যা ক্রিকেটের বিপুল জনপ্রিয়তা।
তিনি বলেন, ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) আর্থিক সাফল্যের কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সন্তানদের ফুটবলের বদলে ক্রিকেটে উৎসাহিত করছে।
তবে তার বিশ্বাস, ফুটবলেও সফল ক্যারিয়ার গড়ে ভালো আয় করা সম্ভব এই বার্তাটি পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছানো জরুরি।
চীনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ
চীন ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপে ফিরতে পারেনি, যদিও গত এক দশকে ফুটবলে বিপুল বিনিয়োগ করেছে।
বেইজিংভিত্তিক ফুটবল বিশ্লেষক মার্ক ড্রেয়ারের মতে, সমস্যার মূল কারণ অতিরিক্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।
তার ভাষায়, ‘ফুটবলের সিদ্ধান্ত ফুটবল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নেওয়া উচিত। কিন্তু চীনে সবকিছুই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে।’
ইন্দোনেশিয়ার ভিন্ন পথ
ইন্দোনেশিয়া ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের শেষ ধাপ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। তবে দেশটির অনেক খেলোয়াড়ই ইউরোপে জন্ম নেওয়া ইন্দোনেশীয় বংশোদ্ভূত।
বিবিসি ইন্দোনেশিয়ার জেরোম উইরাওয়ান জানান, অনেক ম্যাচে ইন্দোনেশিয়ার শুরুর একাদশে আট বা নয়জন ইউরোপে জন্ম নেওয়া ফুটবলার খেলেছেন।
অবকাঠামো সংকটে ইথিওপিয়া
ইথিওপিয়াও কখনো বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি। দেশটির পেশাদার লিগ বর্তমানে উপযুক্ত স্টেডিয়ামের সংকটে ভুগছে।
ইথিওপিয়ান প্রিমিয়ার লিগের প্রধান নির্বাহী কিফলে সাইফে জানান, চলতি মৌসুমে ৩৮০টির বেশি ম্যাচ মাত্র তিনটি অনুমোদিত স্টেডিয়ামে আয়োজন করতে হয়েছে। এমনকি জাতীয় দলকেও বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ‘হোম ম্যাচ’ মরক্কোতে খেলতে হয়েছে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের হতাশা
২০২৬ বিশ্বকাপের এশিয়ান বাছাইপর্বে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান দুই দলই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছে। ছয় ম্যাচে কোনো জয়ই পায়নি তারা।
এছাড়া ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রশাসনিক সংকটের কারণে পাকিস্তানকে তিনবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করেছিল ফিফা।
বিশ্লেষকদের মতে, জনসংখ্যা বা ফুটবলের জনপ্রিয়তা নয়; দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শক্তিশালী ফুটবল কাঠামো, অবকাঠামো, বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত পরিচালনাই বিশ্বকাপে পৌঁছানোর মূল চাবিকাঠি। আর এসব ক্ষেত্রেই এখনও অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



