বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘কোনো কোনো মহল নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র করছে। এ ব্যাপারে জনগণকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।’ গতকাল বিকালে ঢাকা-টাঙ্গাইল-উত্তরবঙ্গ মহাসড়কের ঘারিন্দা বাইপাসে জেলা বিএনপির নির্বাচনি সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
জেলা বিএনপি সভাপতি হাসানুজ্জামিল শাহীনের সভাপতিত্বে ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক সাবুর পরিচালনায় দলের কেন্দ্রীয় নেতা সাইয়েদুল আলম বাবুল, বেনজীর আহমেদ টিটু, সাঈদ সোহরাব, শামসুজ্জামান সুরজসহ টাঙ্গাইলের আট আসনে বিএনপির প্রার্থীরা বক্তব্য দেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘আপনাদের সবার কাছে আমার আহ্বান থাকবে-এখনো কোনো কোনো মহল চেষ্টা করছে কীভাবে ভোট বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করা যায়! তাদের লোকজন মা-বোনদের কাছে গিয়ে এনআইডি ও বিকাশ নম্বর নেওয়ার চেষ্টা করছে। আপনারা মুরুব্বিদের সতর্ক করবেন যারা ভোটের আগে এসব অনৈতিক কাজ করতে পারে, তারা যদি সুযোগ পায় দেশ বিক্রি করে দেবে, এ বিষয়ে তাঁদের সতর্ক করতে হবে।’ তারেক রহমান বলেন, ‘আগামী দিন হচ্ছে দেশ গড়ার। আগামী দিন হচ্ছে মানুষের ভাগ্যবদলের।
আমরা যদি সবাই সতর্ক থাকি তাহলে আমাদের এই অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না, ইনশাল্লাহ।’ সমাবেশে টাঙ্গাইলের বিএনপি প্রার্থী স্বপন ফকির, আবদুস সালাম পিন্টু, ওবায়দুল হক নাসির, লুৎফুর রহমান মতিন, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, রবিউল আলম লাবলু, আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী ও আহমেদ আজম খানকে পরিচয় করে দিয়ে তারেক রহমান তাঁদের বিজয়ী করার আহ্বান জানান। ভোটের দিন সকাল সকাল কেন্দ্রে যাওয়া এবং কেন্দ্র পাহারা দেওয়ার কথা উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে আগের দিন থেকে। যাতে অন্য কেউ আপনার ভোট দিয়ে না আসতে পারে।
এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কেন্দ্রে আপনাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে-সঠিক লোকটা ভোট দিচ্ছে নাকি অন্য এলাকা থেকে এসে আপনাদের নাম দিয়ে কেউ ভোট দিচ্ছে।’ টাঙ্গাইলের জনগণের বিভিন্ন দাবিদাওয়া প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাদের প্রার্থীরা আপনাদের সামনে তাঁদের নিজ নিজ এলাকার বিভিন্ন দাবি উপস্থাপন করেছেন। ১২ তারিখে আপনারা ধানের শীষ নির্বাচিত করলে পরদিন থেকেই পর্যায়ক্রমে সেই উন্নয়নমূলক কাজগুলো আমরা শুরু করব।’ তারেক রহমান বলেন, ‘টাঙ্গাইলে বিভিন্ন রং ও ডিজাইনের শাড়ি আছে।
এ শাড়ি নিয়ে আমরা যদি পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করি, তাহলে বাংলাদেশের গার্মেন্টের পোশাক যেভাবে বিদেশে পাওয়া যায়, এ শাড়িও আমরা একইভাবে বিদেশে রপ্তানি করতে পারব।’ তিনি আরও বলেন, ‘টাঙ্গাইল থেকে নামাজ পড়ার টুপি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যায়। আমরা যদি উদ্যোগ গ্রহণ করি, এ টুপি তৈরিতে আরও বহুসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। টাঙ্গাইলকে পরিকল্পিতভাবে আমরা পর্যায়ক্রমে শিল্পশহরে পরিণত করতে পারব।’ পাশাপাশি টাঙ্গাইলে যমুনা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণ, মিলকারখানা স্থাপন, আনারসকে প্রক্রিয়াজাত করে জুস তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা ও পাটশিল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রে পরিকল্পনার কথাও বলেন তারেক রহমান।
এদিকে বিকালে সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্প পার্কে জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘আপনাদের অনেকে এসে বিভ্রান্তি করার চেষ্টা চালাবে। দেখামাত্র তাদের বলবেন, তোমরা “গুপ্ত”। যারা বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়াবে তাদের একটাই পরিচয়, তারা গুপ্ত। কারণ তাদের বিগত ১৬ বছর আমরা দেখি নাই। যারা ৫ আগস্ট পালিয়ে গেছে, তাদের সঙ্গে তলে তলে মিশে ছিল।’ তারেক রহমান বলেন, ‘সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় বহু কাজ করার আছে। যে কাজগুলো করলে এলাকার উন্নয়ন হবে, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে সেগুলো করতে হবে। আমরা সরকারে গেলে সেগুলো করব ইনশাল্লাহ।’ তিনি বলেন, ‘আন্দোলন, সংগ্রাম করে বিএনপিসহ সাধারণ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছে। এখন আমাদের দেশ গঠন করতে হবে।’ বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘সিরাজগঞ্জ-পাবনায় যেমন কৃষি আছে, তেমন ছোট ছোট মিলকারখানা আছে। আমাদের এ মুহূর্তে কৃষিকে টেনে ওঠাতে হবে, কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হবে; তেমনি লাখ লাখ যুবকের কর্মসংস্থান গড়তে হবে। নতুন নতুন শিল্প পার্ক স্থাপনের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। উত্তরাঞ্চলে কৃষিজীবী মানুষ বেশি। তাই পঞ্চগড় থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত কৃষিনির্ভর শিল্প গড়ে তুলতে চাই, যাতে এ এলাকার যুবক ও তরুণ ভাইবোনদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যদি তাঁতের কথা বলি, লুঙ্গির কথা বলি তবে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সিরাজগঞ্জ-পাবনার কথা। এ এলাকার মানুষ তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত। তাঁতশিল্প নিয়ে যদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারি, তবেই এ শিল্পের উৎপাদিত পণ্য বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হব।’
তারেক রহমান বলেন, ‘কৃষক সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। তাদের কারণেই দেশের মানুষ দুই বেলা খেতে পারে। তাই কৃষকের পাশে আমরা দাঁড়াতে চাই। আমরা প্রয়োজনীয় সার, কীটনাশক ও বীজ কৃষকের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চাই। যেখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী থাকবে না। এজন্য কৃষক কার্ড দেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘যেসব তরুণ ও যুবক আইটি সেক্টরে কাজ করে তাদের বিশেষভাবে ট্রেনিং করাব। একই সঙ্গে যারা বিদেশে যায় তাদের ট্রেনিং থাকে না। তাই সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় ট্রেনিংয়ের জন্য ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে; যাতে তারা বিদেশে গিয়ে ভালো বেতনে চাকরি করতে পারেন।’ বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘বাংলাদেশে যেমন ডাক্তার দরকার, ইঞ্জিনিয়ার দরকার ঠিক তেমনি আমাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে থেকে ক্রীড়াবিদও তৈরি করতে চাই। তাই যেই ছেলেমেয়ে খেলায় ভালো, তাদের খুঁজে এনে সেই খেলায় ট্রেনিং দেব। যাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনতে পারে। আমরা মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মের যারা গুরু তাদের সরকারের পক্ষ থেকে মাসিক সম্মানি ভাতার ব্যবস্থা করতে চাই। ১২ তারিখে ধানের শীষ জয়ী হলে ১৩ তারিখ থেকে কাজগুলো বাস্তবায়ন করব। এ ছাড়াও সিরাজগঞ্জ এবং পাবনার আঞ্চলিক সড়ক, স্কুলে-কলেজে শিক্ষকসংকট, হাসপাতালে চিকিৎসক, ওষুধ নার্স নেই। এগুলো সমাধান করব।’ তারেক রহমান বলেন, দেশের মানুষ জানতে চায়, মানুষ দেখতে চায় যে কোন রাজনৈতিক দল কি পরিকল্পনা নিয়েছে দেশ এবং জনগণের জন্য। যাতে জনগণ এবং দেশ ভবিষ্যতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। বিএনপি পরিকল্পনা দিয়েছে। এই মুহূর্তে বিএনপি একমাত্র রাজনৈতিক দল যেই দলের অভিজ্ঞতা আছে কীভাবে দেশকে সুন্দরভাবে সামনের দিকে পরিচালিত করতে হয়? বিএনপি ছাড়া এ মুহূর্তে বাংলাদেশকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে এমন রাজনৈতিক দল নেই। মানুষ তার ওপর ভরসা করে, যার অভিজ্ঞতা আছে। মানুষ তার ওপর ভরসা করে যার ওপর ভরসা করা যেতে পারে। মানুষ তার ওপর ভরসা করে যে মানুষকে বিপদের সময় ফেলে রেখে চলে যায়নি। এসব গুণ একমাত্র বিএনপির ভিতরেই আছে। কাজেই আজ যদি বাংলাদেশকে গড়তে হয়, ২০ কোটি মানুষকে নিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হয়, তাহলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বক্তব্য শেষে সিরাজগঞ্জ-১ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী সেলিম রেজা, সিরাজগঞ্জ-২ আসনের ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের এম. আকবর আলী, সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের আমিরুল ইসলাম খান আলীম, সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের ডা. এম এ মুহিত এবং পাবনা-১ আসনের ভিপি শামসুর রহমান, পাবনা-২ আসনে একে এম সেলিম রেজা হাবিব, পাবনা-৩ আসনের হাসান জাফির তুহিন, পাবনা-৪ আসনের হাবিবুর রহমান হাবিব, পাবনা- ৫ আসনের অ্যাডভোকেট শামসুল রহমান শিমুল বিশ্বাসকে পরিচয় করিয়ে দেন। জেলা বিএনপির সভাপতি রোমানা মাহমুদের সভাপতিত্বে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। সভা পরিচালনা করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু। নির্বাচনি সভায় তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচনি সভায় বিএনপির লাখো নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ অংশ নেয় । এর আগে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ যাওয়ার পথে বেলা দেড়টার দিকে শেরপুর শহরের ধুনট মোড়ে পথসভায় তারেক রহমান বলেন, ‘বহু বছর পর আবারও আপনাদের মাঝে ফিরে এসেছি। মহান আল্লাহর কাছে এজন্য হাজার-লাখো কোটি শুকরিয়া। বিগত প্রতিটি নির্বাচনে ধুনট এবং শেরপুরবাসী বিএনপিকে ধানের শীষকে বিজয়ী করেছে। এজন্য বিএনপি চেষ্টা করেছে ধুনট এবং শেরপুরবাসীর সার্বিক উন্নয়নসাধনের জন্য। আমরা সেই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে চাই। সবার কাছে এলাকার সন্তান হিসেবে আমার বিনীত অনুরোধ থাকবে, এবারও বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী গোলাম মো. সিরাজকে আপনারা বিজয়ী করবেন।’ এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টায় বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনে পথসভায় বক্তব্য প্রদানকালে তারেক রহমান বলেন, ‘আমি আগে যখন আসতাম তখন এলাকা ঘুরে আপনাদের সঙ্গে কথা বলতাম। কাজ দেখতাম। আপনাদের এই এলাকার উন্নয়নসহ মানুষের দুঃখকষ্ট দেখভালের জন্য আমি বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী মোরশেদ মিলটনকে দায়িত্ব দিয়ে গেলাম।
তাঁর মাধ্যমে গাবতলী ও শাজাহানপুরের মানুষের যাবতীয় কাজ করব ইনশাল্লাহ।’ এর আগে বেলা ১১টায় বগুড়ার নাজ গার্ডেনে নিজের নির্বাচনি এলাকা বগুড়া-৬ (সদর) আসনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন। সভায় বক্তব্যকালে তারেক রহমান বলেন, ‘বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি। এর দায়িত্ব আপনাদের ওপর দিলাম। বগুড়ার জনগণকে আপনারা দেখে রাখবেন। অতীতে নানা সময়ে আপনাদের কাছে এসেছি। এবার প্রথম বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হয়েছি। বগুড়ার সাতটি আসনেই আমাদের কর্মীদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছাতে হবে। শুধু ভোট চাইলেই হবে না। আগের চেয়ে আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে।’
বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশার সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভা সঞ্চালনা করেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সহিদ-উন-নবী সালাম ও কে এম খায়রুল বাশার। আরও বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট এ কে এম মাহবুবুর রহমান, হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ভিপি সাইফুল ইসলাম, জয়নাল আবেদীন চাঁন, আলী আজগর তালুকদার হেনা, বগুড়া শহর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট হামিদুল হক চৌধুরী হিরু, সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি, বগুড়া সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাফতুন আহমেদ খান রুবেল প্রমুখ।
সূত্র:বাংলাদেশ প্রতিদিন
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


