জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ৯৯ ভোট পেয়ে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান

Advertisement

মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ভোটে ড. খলিলুর রহমান ৯৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী পেয়েছে ৯১ ভোট। এই বিজয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতি জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবের সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটিয়েছে।

এই সাফল্য বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদে নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা নয়; বরং এটি বহুপাক্ষিক কূটনীতি, শান্তি, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দেশের সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এই গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক অর্জনের পেছনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সীমিত সময়ে বাংলাদেশের সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং প্রার্থী ড. খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা—এই তিনটি বিষয় মূল ভূমিকা পালন করেছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় নির্বাচনের জন্য মাত্র তিন মাসের মতো সময় অবশিষ্ট ছিল। সেই সীমিত সময়ের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রার্থিতা নিয়ে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়ে বিজয়ের ব্যাপারে প্রায় নিশ্চিত আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদে বাংলাদেশের নির্বাচনের বিষয়টি স্মরণ করেন। সেই সময় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্বে সীমিত সময়ে পরিচালিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশ তৎকালীন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী জাপানকে পরাজিত করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল। এই নির্বাচনেও বাংলাদেশ সাফল্য অর্জন করতে পারবে বলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তখনই দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।

এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সময়ের সীমাবদ্ধতা। মাত্র তিন মাস সময় হাতে পেয়ে বাংলাদেশকে এমন এক বৈশ্বিক কূটনৈতিক প্রচারণা পরিচালনা করতে হয়েছে, যা সাধারণত কয়েক বছরব্যাপী প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক যোগাযোগের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশ কার্যত মাত্র তিন মাসের প্রচারণার মধ্যেই পাঁচ বছরের সমপরিমাণ কূটনৈতিক তৎপরতা সম্পন্ন করেছে।

বাংলাদেশ ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউএনজিএ সভাপতি পদে নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণা করলেও ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে দেশের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এরপর থেকেই পূর্ণমাত্রার কূটনৈতিক প্রচারণা শুরু হয়। দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির সুযোগ না থাকায় এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ এবং বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক ফোরামে অত্যন্ত সক্রিয় ও কৌশলগত প্রচারণা চালিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনে সফল হয়েছে।

অপরদিকে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাস ২০১৬ সালেই তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করে এবং গত এক দশক ধরে ধারাবাহিক প্রচারণা চালিয়েছে। বিশেষ করে গত এক বছরে দেশটি অত্যন্ত বিস্তৃত ও সুসংগঠিত কূটনৈতিক প্রচারণা পরিচালনা করেছে।

জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থন অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে এত অল্প সময়ে সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচারণা পরিচালনা নিঃসন্দেহে খুবই কঠিন ও কৌশলগতভাবে চ্যালেঞ্জিং ছিল। এই প্রচারণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। পাশাপাশি নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনসমূহ সমর্থন আদায়ে সমন্বিত ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।

বাংলাদেশের প্রার্থীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা এ বিজয়ে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল জাতিসংঘের সদর দপ্তরে গত ১৩ মে অনুষ্ঠিত ড. খলিলুর রহমানের ইন্টারঅ্যাকটিভ ডায়ালগ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি আনালেনা বায়েরবকের সভাপতিত্বে প্রায় আড়াই ঘণ্টাব্যাপী ওই সংলাপে বাংলাদেশের প্রার্থী ড. খলিলুর রহমান তাঁর ভিশন স্টেটমেন্ট উপস্থাপন করেন এবং নির্বাচিত হলে সাধারণ পরিষদ পরিচালনায় তাঁর অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। কূটনৈতিক মহলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সংলাপ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এই সংলাপের পর কার্যত বাংলাদেশের পক্ষে প্রায় ৩০টি দেশ তাদের সমর্থন ব্যক্ত করে এবং স্পষ্টত বাংলাদেশ বিজয়ের পথে সুনিশ্চিতভাবে এগিয়ে যায়।

বাংলাদেশের প্রচারণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে কার্যকর বহুপাক্ষিকতা, জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, উন্নয়নশীল দেশসমূহের স্বার্থ সংরক্ষণ, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বাস্তবায়ন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদান এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়গুলো। বাংলাদেশের প্রচারণা ছিল বিষয়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমশ বাড়ছে, সেখানে বাংলাদেশ সংলাপ, সহযোগিতা এবং ঐকমত্যভিত্তিক কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছে।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

বাংলাদেশ সরকার এই ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের জন্য জাতিসংঘের সদস্য দেশসমূহের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে এবং জাতিসংঘের মূলনীতি ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.