দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শেষের দিকে তখন (১৯৪৫) ঐতিহাসিক এক বৈঠকে বসেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ও সৌদি আরবের বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ। তেলের ওপর সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ঠেকাতে তারা পারস্পরিক সহযোগিতার অঙ্গীকার করেন।

এর প্রায় তিন বছর পর ১৯৪৮ সালে শুরু হয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। একদিকে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম, অন্যদিকে আরব জাতীয়তাবাদের উত্থানের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ওপর নজর দেয়। কিন্তু ১৯৭৩ সালে ফের আরব-ইসরায়েল সংঘাত (ইয়োম কিপুর) বাধে। তেল আবিবকে সমর্থনের অভিযোগে উপসাগরীয় দেশগুলো তখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তেল অবরোধ আরোপ করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ‘শাটল ডিপ্লোমেসি’র আশ্রয় নেন।
এখানেই শেষ নয়। ১৯৯০-৯১ সালে ফের যুদ্ধের দামামা বাজে উপসাগরীয় অঞ্চলে। ইরাক কর্তৃক কুয়েতে আগ্রাসনের সেই সংঘাত পরিচিত উপসাগরীয় যুদ্ধ নামে। মূলত এ যুদ্ধের সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরব দেশগুলোর বন্ধুত্ব গাঢ় হয়। ইরাকের হামলার ভয়ে সৌদি আরব প্রথম দেশ হিসেবে নিজ ভূখণ্ডে মার্কিন সেনা মোতায়েনের অনুমতি দেয়। আর কুয়েতকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ত্রাতা হিসেবে হাজির হয়ে কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইনকে সঙ্গে নিয়ে জোট গঠন করে ওয়াশিংটন। সেই সুসম্পর্কের ধারাবাহিকতার সুফল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভোগ করেছে আরব দেশগুলো।
এই দীর্ঘ সময়ে নিরাপত্তা নিয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত থেকে দুবাইকে স্থিতিশীলতার বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। এই সুনামই ছিল দেশটির অর্থনৈতিক কৌশলের প্রধান ভিত্তি। কিন্তু স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গিয়ে একটি বড় নিরাপত্তা ঝুঁকিকে তারা কতটা গুরুত্ব দিয়েছে, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে। ঝুঁকিটি হলো– ইরানের প্রতিবেশী হয়েও যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি করতে দেওয়া।
চলমান সংঘাতে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সম্ভবত আমিরাতই ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের বড় ভুক্তভোগী। সরকারি বিবৃতির তথ্য অনুযায়ী, পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যের দেশটি লক্ষ্য করে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ১ হাজার ৪৭৫ ড্রোন ও ২৬২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯০টি ড্রোন ও ২১টি ক্ষেপণাস্ত্র স্থল ও জলভাগে আঘাত হেনেছে।
গত ১৩ দিনে কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইনও মুহুর্মুহু ড্রোন হামলা সামাল দিয়েছে। যা দুবাই, দোহার মতো উন্নত শহরকে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকিতে ফেলেছে। আকাশপথে বিধিনিষেধ ও আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে এই অঞ্চলকেন্দ্রিক অনেক বিমান সংস্থা ফ্লাইটের রুট পরিবর্তন করেছে বা উড়োজাহাজ মাটিতে নামিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখন পারস্য উপকূলে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন, যা এই দেশগুলোর গত ২০ বছরের অর্থনৈতিক মডেলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
আলজাজিরার সাংবাদিক আলি হাসেম বলছেন, দশকের পর দশক উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানকে প্রতিরোধে ভূমিকা রেখেছে। সঙ্গে ওয়াশিংটনের মিত্রদেরও সুরক্ষা দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ নতুন এক প্রশ্ন সামনে এনেছে– সুরক্ষার জন্য স্থাপন করা ঘাঁটিগুলোই কি নিরাপত্তা সমস্যার অংশ হয়ে উঠছে?
বিপদে পাশে নেই বন্ধু
নিরাপত্তা সমস্যা-সংক্রান্ত প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হবে ২০২০ সালে। সে বছর একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ইরাকে অবস্থানরত ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কমান্ডার কাশেম সোলাইমানিকে হত্যার নির্দেশ দেন। ট্রাম্পের ওই সিদ্ধান্তই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার একাধিক সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে।
সোলাইমানি হত্যাকাণ্ডের পর ইরানের নেতারা আরও বেশি সতর্ক হয়ে ওঠেন। তারা আটলান্টিকের ওপারের যুক্তরাষ্ট্রের বদলে পারস্য উপসাগর তীরের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর পরিকল্পনা শুরু করেন। নিজেরা আহত হলে মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমণের পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন খোদ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর আলি খামেনির সে পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস (এফটি)।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের পরপরই খামেনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা পরিকল্পনাটির বিস্তারিত সাজাতে শুরু করেন। এর মধ্যে ছিল জ্বালানি স্থাপনায় হামলা এবং এমন সব স্থানে আঘাত হানা, যাতে অঞ্চলজুড়ে উড়োজাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
চলমান সংঘাতে মার্কিন ঘাঁটিসহ বেশ কিছু জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যুক্তরাষ্ট্র তার বন্ধুদের পাশে দাঁড়াতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেয়নি। বরং জ্বালানি সংকটের কারণে নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঝুঁকি (মধ্যবর্তী নির্বাচন) এড়াতে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে চাইছে।
বন্ধুর কপালে চিন্তালোকের ছায়া
যুদ্ধের ১৩ দিনে যা যা ঘটল তাতে দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কপালে এখন চিন্তালোকের ছায়া খেলা করছে। সম্ভবত দীর্ঘস্থায়ী হতে যাওয়া এই খেলার পরিণতি যে ব্যয়বহুল হতে যাচ্ছে, সে ইঙ্গিত মিলেছে। তেল শোধনাগারগুলোর খবর তো এতদিনে অনেকেরই জানা। মরূদ্যানের দেশগুলোকে এখন সুপেয় পানির ভাণ্ডার নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা আনাদোলুর খবর বলছে, সম্প্রতি ইরানের কেষম দ্বীপে একটি পানি শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে তেহরানও যদি উপসাগরীয় অঞ্চলের পানি শোধনাগারগুলোতে হামলা করে তাহলে বড় বিপাকে পড়তে হবে সৌদি আরব, কুয়েত ও আমিরাতকে। এরই মধ্যে বাহরাইনের শোধনাগারে ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।
পানি ঘিরে ইরান ইতোমধ্যে তাদের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপটি নিয়েছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্য অঞ্চলের দেশগুলোকেও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পরোক্ষ ভুক্তভোগী বানিয়েছে। কাতারের মতো কয়েকটি মার্কিন মিত্র দেশ তাদের তেল শোধনাগারের কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে। খনিগুলোও বন্ধের কথা ভাবছে। এতদিন কূটনীতিতে দরকষাকষির ক্ষেত্রে আরব দেশগুলোর বড় হাতিয়ার ছিল তেল ও এলএনজির মতো জ্বালানি শক্তি। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে ইরান দেখিয়ে দিল– মার্কিন মিত্রদের তালার চাবি মূলত তেহরানের হাতে।
বিসর্জনের ব্যথা?
তুরস্কের আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বেতুল দোয়ান আক্কাস বলছেন, ‘এমন পরিস্থিতি উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর জন্য গুরুতর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ আনাদোলুর এক নিবন্ধে এই অধ্যাপক আরও লিখেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ধারাবাহিক হামলার ঝুঁকি এবং শিয়া ভূ-রাজনীতির বাস্তবতাকে গুরুত্ব না দিয়েই তেহরানে ওয়াশিংটনের সামরিক অভিযান আঞ্চলিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর শেষটা কেমন হবে, এখনও অজানা।
সংসদে জাতীয় সংগীত ইস্যুতে বিতর্ক, যে ব্যাখ্যা দিলেন হান্নান মাসউদ
তবে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। সঙ্গে সবচেয়ে আশঙ্কার বার্তাও দিয়েছেন– ‘ইরানের শত্রুদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।’ জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ১৩ দিনেই বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল দশা। প্রণালি আরও কয়েক দিন বন্ধ থাকলে এবং সত্যি সত্যি ঘাঁটি সরানো হলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাওয়া আরব দেশগুলোর ভবিষ্যৎ কেমন হবে?
সূত্র: সমকাল
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


