ঢাকা-১৭ আসনের প্রথম নির্বাচনী সমাবেশে বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে এলাকার সমস্যা জেনে সেগুলো সমাধানের ওয়াদা করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) রাজধানীর ভাষানটেকে আয়োজিত এক নির্বাচনি জনসভায় জনসাধারণের সঙ্গে আলাপচারিতায় মুগ্ধ হন এলাকাবাসী।
এদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বক্তব্য শুরুর আগেই তিনি মঞ্চের ডান দিকে এগিয়ে গিয়ে বলেন, ‘এখানে কোনো মা-বোন আছেন যিনি গার্মেন্টসে কাজ করেন? শুনেছি এই এলাকায় অনেক গার্মেন্টসকর্মী রয়েছে। এমন একজন মা বা বোন মঞ্চে আসেন যিনি এই এলাকার ভোটার; তবে আমার দলীয় কোনো কর্মী নয়। একদম সাধারণ মানুষ।’
এরপর তিনি মঞ্চের বাম দিকে এগিয়ে গিয়ে বলেন, ‘একজন ভাই আসুন। যে শ্রমিক হতে পারে, রিকশাচালক হতে পারে কিংবা দিনমজুর।’
এরপর তিনি একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে মঞ্চে যেতে বলেন।
মঞ্চের সামনে থেকে অনেকেই হাত তোলেন। তবে তারেক রহমান বারবার বলেন, ‘যে বা যারা আসবেন তারা অবশ্যই এই এলাকারই ভোটার হতে হবে এবং দলীয় কোনো কর্মী হতে পারবে না।’
এ সময় মঞ্চে ওঠেন মোহাম্মদ জুয়েল। যে নিজেকে পরিচয় দেন একজন ভ্যানচালক হিসেবে। জুয়েলের হাতে মাইক্রোফোন দিয়ে তারেক রহমান প্রশ্ন রাখেন, ‘আমি এই এলাকার ভোটার। বিএনপি প্রার্থী। এখন তো এসে শুধু বক্তব্য দিলে চলবে না। আমার কাছে কী চান, ইনশাআল্লাহ আমি যদি নির্বাচিত হই, বিএনপি সরকার গঠিত হয়, আপনি আমার কাছে কী চান? আপনার এলাকার মূল সমস্যা কী? এলাকায় কী সমস্যা, কী করতে হবে?’
উত্তরে জুয়েল বলেন, ‘আমি বেনারসি মাঠে থাকি, বস্তিতে। ৩০ বছর ধরে এই এলাকায় থাকি। এখানে অনেক খেটে খাওয়া মানুষ আছে। আমাদের মূল চাওয়া আপনারা সরকার গঠন করতে পারলে বস্তিবাসীর পুনর্বাসন করে দিতে হবে। এটা হলো মূল চাওয়া।’
তারেক রহমান উপস্থিত জনসাধারণের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘জুয়েলের এই মূল চাওয়ার সঙ্গে আপনারা কারা কারা একমত তারা হাত তোলেন তো, আপনারা কি একমত?’
সবাই হাত তুলে সমস্বরে বলেন একমত।
জুয়েলের কাছে জানতে চান, একটা সমস্যা গেলো? আরেকটা?
জুয়েল বলেন, ‘এখানে গরিব মানুষ আছে, খেটে খাওয়া মানুষ আছে, তাদের সহযোগিতা করতে হবে।’
তারেক রহমান তার কাঁধে হাত রেখে বলেন, ‘আপনি বলেন, ভয় পেয়েন না। কেউ কিছু বলবে না।’
আশ্বস্ত হয়ে জুয়েল বলেন, ‘এলাকার ভেতরের রাস্তাগুলো ভাঙাচুরা। সেগুলো ঠিক করলে ভালো হয়। তবে মূল চাওয়া পুনর্বাসন, বস্তিবাসীর পুনর্বাসন।’
জুয়েলের পর তারেক রহমান মঞ্চে ডেকে কথা বলেন এশিয়া প্যাসিফিকের ছাত্রী হেনা আক্তারের সঙ্গে। তিনি ওই এলাকার ভোটার, থাকেন পুরান কচুক্ষেত এরিয়ায়। তারেক রহমান হেনা আক্তারের কাছে জানতে চান ভাষানটেক এলাকার সমস্যা কী?
জবাবে হেনা বলেন, ‘আমাদের এদিকে বস্তি এরিয়া বেশি। আমাদের ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের এরিয়াটা খুব সুন্দর, গোছানো পরিবেশ। এদিকের পরিবেশটা যদি একটু সুন্দর হতো। তাহলে পুরো জোনটা একই রকম দেখা যেত। সুন্দর দেখা যেত…যেন ক্যান্টনমেন্ট এরিয়া, কচুক্ষেত এরিয়া, ভাষানটেক এরিয়া…১৭ আসনের অন্তর্ভুক্ত আছে..দেখতেও ভালো লাগবে।’
উপস্থিতির দিকে তাকিয়ে তারেক রহমান জিজ্ঞেস করেন, ‘এই যে আমাদের এই বোন যে কথা বললো, তার সঙ্গে কী আপনারা একমত?’
উপস্থিত জনতা হাত নেড়ে বলেন, একমত।
মঞ্চে আসেন ৯৫ ওয়ার্ডের ভোটার লিলি বেগম। পেশায় গার্মেন্টসকর্মী।
তখন তারেক রহমান বলেন, ‘এই এলাকার সমস্যাটা কী। কি করতে হবে। আমি ইনশাআল্লাহ আপনাদের ভোটে জিতলে মূল কাজটা কি করতে হবে?’
লিলি বলেন, ‘আমরা বস্তিবাসী। আমাদের কিছুই নেই। আপনি বলছেন ফ্যামিলি কার্ড দেবেন। আমরা ফ্যামিলি কার্ড চাই।’
তারেক রহমান এ সময় একটি ফ্যামিলি কার্ড দেখিয়ে বলেন, ‘এই যে ফ্যামিলি কার্ড। উনার মতো প্রত্যেক মা-বোন এমন একটি ফ্যামিলি কার্ড পাবে, বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে।’
লিলি বলেন, ‘আমরা এটাই চাই। আমাদের দেশবাড়ি নেই। নদীতে সব চলে গেছে। আমরা চাঁদপুর ছিলাম।’
জুয়েলের মতো তিনিও বস্তিবাসীর পুনর্বাসন চান। তিনি বলেন, ‘আপনাকে যদি ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করতে পারি। তাহলে আমাদের পুনর্বাসন দেবেন। জয়যুক্ত ইনশাআল্লাহ করবে। আল্লাহর রহমতে ধানের শীষ পাস করবে।’
তারেক রহমান জানতে চান, আর কী বিষয়?
লিলি বলেন, ‘আমার ছেলেই মাস্টার্স পাস করছে। আমাদের অনেক জায়গা থেকে চাকরি দেওয়ার কথা বলছে। আমরা গিয়েছিলাম, হয়নি। আমাদের অনেক যুবক আছে, যারা লেখাপড়া করে ঘুরছে। চাকরি নাই। আপনার কাছে আমাদের অনুরোধ। আপনি সবাইকে চাকরি দেবেন যারা শিক্ষিত।’
‘এই বোন তাহলে একটা কথা বলেছেন। এক নম্বর পুনর্বাসন, দুই যুবসমাজের কর্মসংস্থান, চাকরির প্রয়োজন। এই সমস্যা শুধু ভাষানটেক না, এই সমস্যা সারা বাংলাদেশে আছে।’ বলেন তারেক রহমান।
গৃহিণী শান্তা চান ফ্যামিলি কার্ড।
‘ফ্যামিলি কার্ড পেলে আপনার মতো একজন নারীর কী সুবিধা হবে বলে আপনি মনে করেন? বাংলাদেশে প্রায় চার কোটি পরিবার আছে। আমরা চেষ্টা করবো সবাইকে ফ্যামিলি কার্ড দিতে। এই কার্ডের মাধ্যমে যার সংসার আছে তাকে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা দেব অথবা সমপরিমাণ প্রয়োজনীয় যে খাদ্য সামগ্রী আছে তা দেব। যদি এ রকম একটা কার্ড পান, কী সুবিধা আপনার হবে বলেন? মাত্র তো আড়াই হাজার টাকা…।’
শান্তা বলেন, ‘অনেক সুবিধাই হবে। এই টাকার মধ্যেই আমরা চাল কিনতে পারব, ডাল কিনতে পারব, অনেক কিছু কিনতে পারব।’
মা-বোনেরা কি উনার সঙ্গে একমত? প্রশ্ন রেখে তারেক রহমান বলেন, ‘একমত যদি হোন, আর আপনারা যারা পুরুষ ভাইয়েরা আছেন। আপনারা যদি চান আপনার মা বা স্ত্রী কিংবা বোন যে সংসার করছে তার হাতে এমন একটি ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছাক।’
‘আমরা ফ্যামিলি কার্ড দিই এটা যদি চান তাইলেতো দুটো কাজ করতে হবে। এক-এখানে বিএনপি প্রার্থীকে জয়যুক্ত করতে হবে। দুই-আপনাদের যারা আত্মীয়-স্বজন-বন্ধুবান্ধব আছে তাদের বলতে হবে সারা বাংলাদেশে ধানের শীষকে জয়যুক্ত করতে। তাহলেই সারা বাংলাদেশে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া সম্ভব হবে।’
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আজকে এতটুকু আপনাদের বলতে চাই, আমি যেহেতু আপনাদের প্রার্থী। আমি এই এলাকায় ছোট থেকে বড় হয়েছি। বহু মানুষ এই এলাকায় ছোট থেকে বড় হয়েছে, ২০/২৫/৩০ বছর ধরে বসবাস করছেন। এই এলাকায় গত ৫০ বছর ধরে বড় হয়েছি, যদিও মধ্যখানে অনেকটা সময় বাইরে থাকতে হয়েছে তবুও। আমি আপনাদেরই একজন। আজকে যখন আমি এই এলাকার প্রার্থী হয়েছি, আপনাদের এতটুকু বলতে পারি যে ইনশাআল্লাহ আল্লাহর রহমতে আগামী নির্বাচনে আমি জয়ী হলে এবং ধানের শীষ সরকার গঠন করলে…আজকে এখানে যে কজন মানুষ আপনাদের সবার পক্ষ থেকে যে সমস্যার কথা বলে গেছে, পুনর্বাসন মূল সমস্যা…তাছাড়াও যত সমস্যার কথা বলে গেছে, ইনশাল্লাহ আমরা সে সমস্যার সমাধান করবো এই এলাকার মানুষের জন্য। আপনাদের এলাকাবাসী হিসেবে, এই এলাকার সন্তান হিসেবে এই ওয়াদা আমি করে গেলাম।’
এক নারী ভোটার তারেক রহমানের কাছে অভিযোগ করে বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা সাচ্চু তাদের অনেক জায়গা দখল করে নিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, তারেক রহমান নির্বাচিত হলে যেন সেই জায়গা তাদের ফেরত দেওয়া হয়।
এ সময় আরেকজন ব্যক্তি বলেন, ‘ভাইয়া, আপনার গাছের অনেক পেয়ারা চুরি করে খেয়েছি। ক্ষমা করে দেবেন।’
জবাবে তারেক রহমান ওই ব্যক্তিকে প্রশ্ন করেন, তার বাড়িতে জায়গা আছে কি না। তিনি বলেন, জায়গা আছে। তখন তারেক রহমান বলেন, ‘ওখানে পেয়ারা গাছ লাগাবেন, আর আমাকে দুইটি পেয়ারা দিয়ে যাবেন।’
জনসভায় আরও একটি ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা যায়। খালেদা জিয়ার মতো সাজপোশাক পরা এক শিশুকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন তারেক রহমান।
আরও পড়ুনঃ
জনসভায় উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম, ফরহাদ হালিম ডোনার, নাজিম উদ্দিন আলম, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক, সদস্যসচিব মোস্তফা জামান, ভাষানটেক থানা বিএনপির আহ্বায়ক কাদের মাহমুদ, জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না এবং জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহম্মেদসহ দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতারা।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


