কয়েকদিন আগেও রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের ব্যস্ত সড়কের পাশের ফুটপাতই ছিল তার ঠিকানা। দিনের পর দিন রোদ, বৃষ্টি আর ধুলাবালির মধ্যে পড়ে থাকতেন।

ফুটপাত থেকে আইসিইউ

Advertisement

এলোমেলো জট বাঁধা চুল, ময়লা-ছেঁড়া কাপড় আর অপুষ্টিতে কঙ্কালসার হয়ে যাওয়া শরীর দেখলে মনে হতো, পৃথিবীর সব অবহেলা যেন এসে জমেছে এই এক নারীর জীবনে।

পাশ দিয়ে হেঁটে যেত হাজারো মানুষ।

কেউ কৌতূহলী চোখে তাকাত, কেউ মুখ ফিরিয়ে নিত, কেউবা তাকে পাগলি বলে এড়িয়ে যেত। কেউ জানত না তার ঠিকানা, পরিবার কিংবা অতীতের গল্প।

একসময় হয়ত তারও ছিল একটি ঘর, ছিল প্রিয় মানুষ, ছিল স্বপ্নও। কিন্তু সেসব হারিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন শহরের ব্যস্ত ফুটপাতে পড়ে থাকা একজন পরিচয়হীন নারী।
তবুও তার একটি নাম ছিল– দুলালী।

আজ সেই দুলালী আর ফুটপাতে নেই। তিনি লড়ছেন মৃত্যুর সঙ্গে। রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন।

দুলালী কেন চিকিৎসা পাচ্ছে না?
দুলালীর গল্প সামনে নিয়ে আসেন মানসিক স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী মুছা করিম রিপন। তার কাছে দুলালী কোনো পরিচয়হীন ভবঘুরে নারী ছিলেন না, ছিলেন চিকিৎসাবঞ্চিত একজন মানুষ, যার বেঁচে থাকার অধিকার আছে।

রিপন জানান, প্রথমে মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি দুলালীর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। নিজে গিয়ে খাবার দিতেন। সবসময় সম্ভব না হলেও স্থানীয় বিসমিল্লাহ হোটেলের কর্মচারী মোহাম্মদ আবু ইউসুফের মাধ্যমে প্রতিদিন তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করতেন। ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন, দুলালী শুধু মানসিক ভারসাম্যহীন নন, শারীরিকভাবেও মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

এরপর শুরু হয় চিকিৎসার জন্য তার দীর্ঘ দৌড়ঝাঁপ। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে অন্তত আটটি হাসপাতালে যোগাযোগ করেন রিপন। কিন্তু কোথাও দুলালীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেননি। কোনো হাসপাতালে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) চাওয়া হয়েছে, কোথাও চাওয়া হয়েছে আইনি অভিভাবকের উপস্থিতি। কেউ কেউ রোগীকে ভর্তি করাতে অনাগ্রহও দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

রিপনের প্রশ্ন ছিল, একজন মানুষ যদি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকেন, তাহলে তিনি এনআইডি বা অভিভাবক কোথা থেকে আনবেন?

এই মানসিক স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী বলেন, এনআইডি নেই বলে একজন মানুষ চিকিৎসা না পেয়ে রাস্তায় ধুঁকে ধুঁকে মরবে, এটা আমি মেনে নিতে পারিনি।

বারবার ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নজরে আনার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

ঈদের আগের দিন বুধবার (২৭ মে) রাজধানীর গুলশান অ্যাভিনিউয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে একাই দাঁড়িয়ে যান মুছা করিম রিপন। তার হাতে ছিল একটি প্ল্যাকার্ড। সেখানে ইংরেজিতে লেখা ছিল ‘No Health Without Mental Health।’ আর বাংলায় লেখা ছিল ‘দুলালীকে বাঁচাতে চাই। দুলালী কেন চিকিৎসা পাচ্ছে না, প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাব চাই।’

কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, কোনো সংগঠনের ব্যানার নয়, সঙ্গে ছিল না কোনো মিছিল বা সমাবেশ। একজন নাগরিক, একজন মানসিক স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী হিসেবে একজন অসহায় মানুষের জন্য তিনি সেখানে দাঁড়িয়েছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে দেওয়া স্মারকলিপিতে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানতে চান, একজন মানসিক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়? সংবিধানে জীবন ও মৌলিক প্রয়োজনের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও কেন একজন মানসিক ভারসাম্যহীন নারী চিকিৎসাবঞ্চিত থাকবেন?

তিনি আরও উল্লেখ করেন, মানসিক স্বাস্থ্য আইন-২০১৮-এর বিধান অনুযায়ী বিশেষ পরিস্থিতিতে অনিচ্ছুক মানসিক রোগীকে ভর্তি করানোর ক্ষেত্রে সবসময় এনআইডি বা অভিভাবক বাধ্যতামূলক নয়। তবু বাস্তবে কেন পরিচয়হীন রোগীরা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, সেই প্রশ্নও তোলেন রিপন।

মুছা করিম রিপনের একক অবস্থানের খবর প্রথম প্রকাশ করে । এরপর বিষয়টি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন গণমাধ্যমও দুলালীর গল্প তুলে ধরে।

একজন পরিচয়হীন মানসিক ভারসাম্যহীন নারীর চিকিৎসার দাবি মুহূর্তেই একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নে পরিণত হয়– পরিচয়পত্র, অভিভাবক বা অর্থ না থাকলে একজন মানুষ কি চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার হারিয়ে ফেলেন?

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ফুটপাতে পড়ে থাকা এক নারী– দুলালী।

অবশেষে হাসপাতালে ভর্তি
প্রতিবাদের দুই দিনের মাথায় পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দারের হস্তক্ষেপে ঈদের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার (২৯ মে) দুলালীকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সরকারিভাবে তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়।

শনিবার (৩০ মে) দুপুরে জিয়াউদ্দিন হায়দার নিজে হাসপাতালে গিয়ে দুলালীর খোঁজ নেন। তার সঙ্গে ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস মেলায় অনেকের মনেই আশা জাগে– হয়ত এবার নতুন জীবন ফিরে পাবেন দুলালী। কিন্তু বাস্তবতা আরও ভয়াবহ।

পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে ভয়াবহ শারীরিক অবস্থা
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ভর্তির পর দুলালীর শারীরিক অবস্থা মূল্যায়নে কয়েকটি জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর চিকিৎসকরা দেখতে পান, মানসিক সমস্যার পাশাপাশি তিনি গুরুতর শারীরিক জটিলতায়ও ভুগছেন।

রাত ১০টার দিকে ইনস্টিটিউটের পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার মানসিক স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী মুছা করিম রিপনের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, দীর্ঘদিন রাস্তায় অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকার কারণে দুলালীর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে।

চিকিৎসা প্রতিবেদনে দেখা যায়, দুলালীর রক্তচাপ নেমে এসেছে মাত্র ৫০/৩০-এ, যা স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে কম। তার রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ মাত্র ৬ গ্রাম, যা তীব্র রক্তস্বল্পতার ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া প্লাটিলেটের সংখ্যা নেমে এসেছে ২৫ হাজারে, যেখানে একজন সুস্থ মানুষের স্বাভাবিক মাত্রা দেড় থেকে চার লাখের মধ্যে থাকে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার গ্লাসগো কোমা স্কেল (জিসিএস) স্কোর ছিল ৮, যেখানে একজন স্বাভাবিক ও সচেতন মানুষের স্কোর থাকে ১৫। একইসঙ্গে তার শরীরে অক্সিজেনের মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে কম পাওয়া যায়। তাছাড়া তার ফুসফুসও স্বাভাবিকভাবে কাজ করছিল না।

পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে চিকিৎসকরা ধারণা করেন, দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অপুষ্টির পাশাপাশি তার শরীরে মারাত্মক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার বলেন, দুলালীর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। তার শরীরে গুরুতর সংক্রমণের লক্ষণ পাওয়া গেছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় তাকে দ্রুত আইসিইউতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

আইসিইউর চিকিৎসকরা জানান, দুলালীর শরীরে তীব্র সংক্রমণ থেকে সেপসিস হয়েছে। পরে তা ডিসেমিনেটেড ইনট্রাভাসকুলার কোয়াগুলেশনে (ডিআইসি) রূপ নিয়েছে। এটি এমন একটি জটিল অবস্থা, যেখানে শরীরের রক্ত জমাট বাঁধার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে এবং একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যেতে পারে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সাধারণত খুবই কম।

মুছা করিম রিপন বলেন, যদি কয়েক মাস আগে চিকিৎসা পেতেন, যদি ফুটপাতে পড়ে থাকতে না হতো, যদি পরিচয়পত্র বা অভিভাবকের অভাবে হাসপাতালের দরজা বন্ধ না হতো– তাহলে কি আজ তাকে লাইফ সাপোর্টে থাকতে হতো?

তিনি আরও বলেন, পরিচয়হীন হলেও দুলালী একজন মানুষ। আর মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার তারও আছে।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করা কর্মীরা বলছেন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, পরিচয়হীন বা গৃহহীন মানুষের জন্য চিকিৎসা পাওয়ার পথ এখনও অত্যন্ত কঠিন। তাদের অনেকে চিকিৎসার আগেই হারিয়ে যান, অনেকে মারা যান সড়কেই।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.