নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর: গাজীপুরে এক অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রীকে গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। একই দিনে একই থানায় দায়ের হওয়া দুই মামলায় বয়স সংক্রান্ত স্পষ্ট ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি উপেক্ষা করে ছাত্রীকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজ করেছেন আদালত।

ভুক্তভোগী তাহরিমা জান্নাত সুরভীর আইনজীবী ও গাজীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান কামাল অভিযোগ করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় সুরভীর মায়ের করা মামলায় তাঁর বয়স ১৭ বছর উল্লেখ করা হলেও একই তারিখে সাংবাদিক নাইমুর রহমান দুর্জয়ের দায়ের করা মামলায় বয়স দেখানো হয়েছে ২১ বছর। উভয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে কালিয়াকৈর থানার উপপরিদর্শক ওমর ফারুককে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
আইনজীবীর দাবি, একই ব্যক্তির তদন্তাধীন দুই মামলায় বয়সের এমন অসামঞ্জস্য থাকা সত্ত্বেও তদন্ত কর্মকর্তা বিষয়টি উপেক্ষা করেন। এমনকি প্রায় এক মাস পর সুরভী যে অপ্রাপ্তবয়স্ক—এ তথ্য জানা থাকার পরও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় দুর্জয়ের করা মামলায়। বিপরীতে, সুরভীর মায়ের দায়ের করা মামলায় কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মোস্তাফিজুর রহমান কামাল আরও বলেন, গভীর রাতে বাড়ি থেকে অভিযান চালিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক সুরভীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আদালতে উপস্থাপনের সময় তাঁর প্রকৃত বয়স গোপন রাখা হয়। রিমান্ড আবেদনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বয়স ২১ বছর উল্লেখ করা হয়েছে, যা আইন ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে আদালত তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজ করেছেন বলে জানান তিনি। তাঁর আশা, আদালতের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে।
সুরভীর মায়ের করা মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত জুলাই–আগস্টের ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির এই ছাত্রী। সেই সূত্রেই তাঁর পরিচয় হয় সাংবাদিক নাইমুর রহমান দুর্জয়ের সঙ্গে। অভিযোগে বলা হয়, পরিচয়ের পর থেকে দুর্জয় বিভিন্ন সময় হোয়াটসঅ্যাপে কুপ্রস্তাব ও কক্সবাজার ভ্রমণের প্রলোভন দিতে থাকেন। ছাত্রীটি অসম্মতি জানালে তিনি ক্ষমা চান।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ১৮ নভেম্বর সকালে দুর্জয় ইন্টারভিউ নেওয়ার কথা বলে ছাত্রীকে ঢাকার বিমানবন্দর এলাকায় ডেকে নেন। পরে মোটরসাইকেলে তুলে গাজীপুরের চান্দরা এলাকায় নেওয়ার কথা বললেও তিনি কৌশলে সফিপুর বাজারসংলগ্ন একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে ছাত্রীকে শ্লীলতাহানি ও যৌন নিপীড়নের শিকার করা হয় বলে অভিযোগ।
পরিস্থিতি বুঝে ছাত্রীটি পানি কেনার অজুহাতে সেখান থেকে সরে গিয়ে কলেজের বড় ভাইদের বিষয়টি জানান। পরে তাঁরা এসে ছাত্রীকে উদ্ধার করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এ সময় দুর্জয় নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চান এবং কুপ্রস্তাবমূলক অডিও ক্লিপ মুছে ফেলার জন্য কান্নাকাটি ও আত্মহত্যার হুমকি দেন।
পরদিন সফিপুরের একটি রেস্টুরেন্টে মানসিক চাপ ও হুমকির মাধ্যমে কিছু অডিও ক্লিপ জোরপূর্বক মুছে ফেলা হয় বলেও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
সুরভীর মা ছামিতুন আক্তার বলেন, মেয়েটি ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। সামাজিক ও পারিবারিক কারণে থানায় যেতে কিছুটা দেরি হলেও তিনি ন্যায়বিচার চান।
নাইমুর রহমান দুর্জয় কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার বৈষর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম সাজ্জাদ হোসাইন। বর্তমানে তিনি ঢাকার সবুজবাগ এলাকায় বসবাস করেন।
এরই মধ্যে গত ২৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে টঙ্গীর নিজ বাসা থেকে যৌথ বাহিনী সুরভীকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
সোমবার তাঁকে গাজীপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এ হাজির করে পুলিশ পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে বিচারক সৈয়দ ফজলুল মাহাদী দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদনের শুনানি শেষে রিমান্ড বাতিল করে জামিন মঞ্জুর করা হয়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে গাজীপুর জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান সুরভী।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন জানান, একই দিনে বিপরীতমুখী দুটি মামলা দায়েরের বিষয়টি তিনি সেদিনই অবগত হয়েছেন।
তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতের শোকজের বিষয়ে তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে জবাব দেবেন, এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


