রাজধানীতে এআইভিত্তিক ট্রাফিক নজরদারি চালুর সুযোগ নিয়ে নতুন প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে সাইবার চক্র। বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের নামে ভুয়া মামলা ও জরিমানার এসএমএস পাঠিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যাংক কার্ডের তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এমনকি যাদের কোনো গাড়ি বা মোটরসাইকেল নেই, তাদের কাছেও পাঠানো হচ্ছে ‘স্পিডিং ফাইন’ সংক্রান্ত বার্তা। এ ঘটনায় সতর্কবার্তা দিয়েছে বিআরটিএ ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
মিরপুরের বাসিন্দা মাহফুজ পলাশ। গত দুইদিন আগে তার ফোনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষর নামে একটি বার্তা আসে। সেখানে বলা হয়, তার গাড়িটি নির্ধারিত গতিসীমা লঙ্ঘন করা তাকে বিআরটিএ’র পক্ষ থেকে জরিমানা করা হয়েছে। এই জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করা হলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সেই ম্যাসেজটিতে জানানো হয়।
মাহফুজ পলাশ বলেন, আমি দীর্ঘদিন ঢাকা শহরে নিজেই গাড়ি চালাই। ট্রাফিক আইন সম্পর্কে আমার যথেষ্ট ধারণা রয়েছে। আমার কাছে এরকম ম্যাসেজ আসার কোন কারণ নাই, সেটি আমি নিশ্চিত। বিষয়টিকে আমার সন্দেহজনক মনে হচ্ছে।
পলাশ বলছিলেন, তার কাছে যেই ম্যাসেজটি এসেছে সোমবার রাতে সেটি তার পরিচিত আরও কয়েকজনের কাছে দুয়েক দিন আগেই ঠিক একই ধরনের ম্যাসেজ এসেছে। তাদের কেউ কেউ বিষয়টিকে সত্যি ভেবে প্রতারিতও হয়েছেন।
শুধু গাড়ির মালিক নন, এমনও কেউ কেউ জানিয়েছেন যে, তাদের কোনো গাড়ি, মোটরসাইকেল বা কোনো ধরনের যানবাহন না থাকার পরও এই ধরনের ম্যাসেজ আসছে।
গত কয়েকদিনে অনেকের কাছেই এই ধরনের ম্যাসেজ আসার পর এ নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং বিআরটিএ’র পক্ষ থেকে আলাদা বিবৃতি দিয়ে সতর্ক বার্তাও পাঠানো হয়েছে।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার আনিসুর রহমান বলেছেন, এই ধরনের ম্যাসেজ পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তাদের কাছে গত কয়েকদিনে বেশ কিছু অভিযোগ এসেছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব লিংক আসলে ‘ফিশিং সাইট’। ব্যবহারকারীরা সেখানে নাম, গাড়ির তথ্য ও ডেবিট/ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দিলে প্রতারকরা তা হাতিয়ে নিচ্ছে।
মাহফুজ পলাশের মতো গণমাধ্যমকর্মী ফৌজিয়া সুলতানার কাছেও এমন একটি ম্যাসেজ এসেছে। যদিও মিজ সুলতানার নিজের কোন গাড়ি নেই। ম্যাসেজের শুরুতেই লেখা হয়েছে ‘বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ট্রাফিক জরিমানার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বিজ্ঞপ্তি’। এরপরই এতে লেখা ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের একটি নম্বর ও তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে বিস্তারিত লেখায় বলা হয়েছে- ‘আপনার ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের রেকর্ডটি জাতীয় ড্রাইভিং লাইসেন্স ও যানবাহন নিবন্ধন পরিষেবাতে জমা দেওয়া হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় অনুস্মারক পাঠানোর পরেও আমরা আপনার অর্থ পরিশোধ বা আপিল না পাওয়ায়, আপনাকে এতদ্বারা জানানো হচ্ছে যে, সড়ক ট্রাফিক আইনের সর্বশেষ সংস্করণ অনুযায়ী, বকেয়া পরিশোধের ফলে নিম্নলিখিত পরিণতি হতে পারে: ‘জরিমানা বৃদ্ধি: সড়ক ট্রাফিক আইনের ৫২ নং ধারার ৩ নং উপধারা অনুযায়ী, বকেয়া পরিশোধের ফলে জরিমানা ২০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে’।
এরপরেই বলা হয়েছে- তারা বকেয়া পরিশোধে সময়কাল ৩০ দিনের বেশি হলে মামলাটি নিম্ন আদালতে স্থানান্তর করবে। তখন আদালত আইন অনুযায়ী আইন প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা (জরিমানা বা যানবাহন বাজেয়াপ্তকরণ) গ্রহণ করবে।
এই ম্যাসেজটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে ভিডিও সার্ভিলেন্স ক্যামেরার নম্বরও ব্যবহার করা হচ্ছে। সেই সাথে ওয়েবসাইটের একটি অ্যাড্রেসও দেওয়া হচ্ছে যেটি দেখতে অনেকটা সরকারি ওয়েবসাইটের মতোই।
রাসেল আহমেদ নামে একজন ব্যাংকে চাকরিজীবী জানাচ্ছিলেন, এমন একটি ম্যাসেজ পেয়ে তিনি সেটিকে সত্যি মনে করে ম্যাসেজে দেওয়া লিংকে প্রবেশ করেছিলেন। পরে সেখানে গাড়ির নম্বর দেওয়ার পর তাকে বলা হয় তার জরিমানার পরিমাণ হয়েছে তিন হাজার টাকা। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করলে দেওয়া হবে ৫০ শতাংশ ডিসকাউন্ট। অর্থাৎ সেক্ষেত্রে দিতে হবে ১৫০০ টাকা।
বার্তাগুলোতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ভুয়া তথ্য, মামলার নম্বর, জরিমানার পরিমাণ এবং আদালতে পাঠানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে সরকারি ওয়েবসাইটের মতো দেখতে ভুয়া লিংক, যেখানে ঢুকে অনেকেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
এ ধরনের ম্যাসেজ আসলে কী করবেন?
বিআরটিএর নাম ব্যবহার করে যেই ম্যাসেজগুলোতে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে পাঠানো হচ্ছে সেখানে কোন নাম ব্যবহার করা হচ্ছে না। ম্যাসেজগুলো পাঠানো হচ্ছে +৬৩ কোডযুক্ত বিভিন্ন নম্বর থেকে। তথ্য বলছে, +৬৩ একটি আন্তর্জাতিক কোড, যা ফিলিপাইনের কান্ট্রিকোড।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুয়া মামলা ও জরিমানার তথ্য পাঠানোর মেসেজের সঙ্গে যে ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া হয়েছে, তার সাথে বিআরটিএ এর মিল পাওয়া যায়নি। কারণ, বিআরটিএ বা সরকারি যেকোনো ওয়েবসাইটের শেষে .gov.bd এমন লেখা থাকে। কিন্তু এসব মেসেজে তা ছিল না।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মি. মঈনুদ্দীন বলেন, এসএমএস এ দেওয়া লিংকে ক্লিক করলে সেখানে ওই ব্যক্তির নাম, তথ্য ও ডেবিট/ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দিতে হচ্ছে। ‘এই চক্রটি কার্ডের নম্বরের পাশাপাশি কার্ডের পেছনে থাকা সিভিভি নম্বরও নিয়ে নেয়। কোন গ্রাহক যদি কার্ডের সিভিভি নম্বর তাদেরকে সরবারহ করে থাকে, তখন কোন ধরনের পণ্য কেনাকাটায় পাসওয়ার্ড প্রয়োজন হয় না’, যোগ করেন তিনি।
অধ্যাপক বিএম মঈনুল হোসেন বলেন, ‘এই চক্র প্রথমে ম্যাসেজ দিয়ে যে কারো মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করবে। এ ধরনের ম্যাসেজ পেয়ে অনেকে উদগ্রীব হয়ে লিংকে ঢুকে পড়েন। পরবর্তীকালে অনেকেই ক্লিক করে প্রতারণার শিকার হয়ে থাকেন’। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলছিলেন, প্রতারক চক্র ধরুন এক হাজার মানুষের কাছে এমন লিংক পাঠালো, সেখান থেকে ১০ জনও যদি লিংকে ক্লিক করে তথ্য দেয় তাহলেও প্রতারক চক্র সফল।
এই দুই প্রযুক্তিবিদই বলেন, কোন অপরিচিত নম্বর থেকে যদি এই ধরনের কোন ম্যাসেজ আসে তাহলে সেগুলোতে কোনভাবেই ক্লিক করা যাবে না। ক্লিক করলে ‘ফিশিং অ্যাটাকের’ শিকার হতে হবে।
বিআরটিএ ও পুলিশের সতর্ক বার্তা
গত তিন চারদিনে অনেকের কাছে এই ধরনের এসএমএস আসতে শুরু করে। এবং যাদের গাড়িই নেই এমন ব্যক্তিদের কাছেও এই ম্যাসেজ আসছিলো। এমন পরিস্থিতিতে সোমবার বিআরটিএ এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে জনসাধারণকে সতর্ক করে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে।
বিআরটিএ জানিয়েছে, ‘একটি অসাধু চক্র বিভিন্ন মোবাইল নম্বর থেকে স্পিডিং ফাইন বকেয়া রয়েছে, দ্রুত পরিশোধ করুন বা আপনার বকেয়া জরিমানা আছে এ ধরনের বার্তা পাঠাচ্ছে। এসব বার্তার সঙ্গে বিভিন্ন ভুয়া ওয়েবসাইটের লিংকও দেওয়া হচ্ছে, যা বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল (বিএসপি)-এর আদলে তৈরি করা হয়েছে। এসব ভুয়া ওয়েবসাইট বা পোর্টালের সঙ্গে অফিসিয়াল বিএসপি ওয়েবসাইটের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো সম্পূর্ণ প্রতারণামূলক কার্যক্রম’। এই বার্তায় ‘সাধারণ মানুষকে এ ধরনের বার্তার লিংকে ক্লিক না করা, ব্যক্তিগত তথ্য বা আর্থিক লেনদেন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, ডিএমপির পক্ষ থেকে এই ধরনের ম্যাসেজকে ভুয়া আখ্যা দিয়ে এই ধরনের কোনো এসএমএসের সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই’।
এতে ডিএমপি জানায়, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী কোনো যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হলে, সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত একটি চিঠি চালক বা মালিকের নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া, বিশেষ প্রয়োজনে ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে শুধুমাত্র ০১৩২০-০৪২২০৭ এবং ০১৩২০-০৪২২২৭ নম্বর থেকে এসএমএস পাঠানো হতে পারে’।
ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের ডিসি এনএম নাসিরুদ্দিন বলেন, ‘গত কয়েকদিনে আমরা এমন অভিযোগের কথা শুনে আসছি। যদি কেউ এ ধরনের ম্যাসেজে প্রতারিত হয়ে থাকেন তাদের উচিত পুলিশের কাছে সহযোগিতা চাওয়া’।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
পুলিশ বলছে, ম্যাসেজটি বিআরটিএর নাম ব্যবহার করেছে। তবে বিআরটিএ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি পুলিশকে। যে কারণে পুলিশও উদ্যোগী হয়ে কোন আইনি পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



