দূরত্ব ঘুচিয়ে এবার বাণিজ্যে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে তুরস্ক। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশও। দুই পক্ষের আগ্রহে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্পর্কের রসায়ন। আর এ ঘনিষ্ঠতা এখন মোড় নিচ্ছে দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তির দিকে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তুরস্কের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার। চুক্তির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করতে দেশটিকে অফার লেটার পাঠানোর বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সূত্র জানান, তুরস্কের সঙ্গে এফটিএ করার বিষয়ে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি সভা হয়েছে। ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, এফটিএর জন্য আলোচনা শুরু করতে কূটনৈতিক মাধ্যমে তুর্কি প্রশাসনের কাছে অফার লেটার পাঠাবে সরকার।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য না। সে কারণে দেশটিতে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধাও পায় না বাংলাদেশ। দেশটিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ছাড়াও ওষুধ, শুকনা খাবার, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া, প্লাস্টিক, সিরামিকের চাহিদা রয়েছে। তবে উচ্চ শুল্কের কারণে আশানুরূপ পণ্য রপ্তানি হচ্ছে না। ২০১০ সালে তুরস্ক তার বস্ত্র খাতের সুরক্ষার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত ১৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও তা এক দশক ধরে ১ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। মুক্তবাণিজ্য চুক্তি হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া মোড ফোরের আওতায় জনশক্তি রপ্তানিরও সম্ভাবনা রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সে কারণে অন্যান্য দেশের পাশাপাশি তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার দিকে এগোচ্ছে নির্বাচিত সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ছিল অম্লমধুর।
এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে একপর্যায়ে ঢাকা থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের ঘটনাও ঘটে। পরে ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা হলে বাংলাদেশ দ্রুততম সময়ে সেই প্রচেষ্টার নিন্দা জানিয়ে তুরস্ককে সমর্থন জানায়। এরপর দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হলেও ভিতরে ভিতরে একটা দূরত্ব থেকেই গেছে। সেই দূরত্বের কারণেই ২০১৭ সালে দেশটির সঙ্গে এফটিএ করার বিষয়ে আলোচনা শুরু হলেও বেশি দূর এগোয়নি। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেই দূরত্ব ঘোচাতে তুরস্কের দিক থেকেই সম্পর্কোন্নয়নের বার্তা আসে। দীর্ঘ ছয় বছর পর পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক বা ফরেন অফিস কনসালটেশন (এফওসি) হয়েছে গত বছর। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অন্তত ডজনখানেক সফর বিনিময় হয়েছে ঢাকা ও আঙ্কারার মধ্যে। যেখানে গুরুত্ব পেয়েছে রাজনৈতিক পরিসরে সম্পর্ক জোরদার, ব্যবসাবাণিজ্য বৃদ্ধি থেকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে অংশীদারিতে রূপ দেওয়ার মতো বিষয়গুলো। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহায়তা ছাড়াও আলোচনা হয়েছে বাংলাদেশের সমরাস্ত্র কারখানার সক্ষমতা বাড়ানোসহ নানান ইস্যুতে। বিএনপি সরকার সেই সম্পর্ক বাণিজ্যিক রূপ দিতে যাচ্ছে।
সিদ্ধান্ত হয়েছে বাংলাদেশ ও তুরস্কের এফটিএ সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব তপনকান্তি ঘোষ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘২০১৭ সালে যখন তুরস্ককে এফটিএ করার প্রস্তাব দেওয়া হলো, তখন তারা আমাদের জানাল, এ বিষয়ে ইইউর অনুমোদন লাগবে। দেশটি ইইউর সদস্য না হলেও ইউরোপের কাস্টমস ইউনিয়নের সদস্য। সে কারণে তুরস্ক কর্তৃক কোনো দেশকে শুল্কসুবিধা দিতে গেলে ইইউ কাস্টমসের অনুমোদন লাগে। এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন যেহেতু সরকার ইইউর সঙ্গে এফটিএ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে কারণে একই সঙ্গে তুরস্কের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে পারে। ইইউর পাশাপাশি তুরস্কের সঙ্গে এফটিএ হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার আরও সম্প্রসারিত হবে।’
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


